ইতিহাসের পাতায় নারী নেত্রী রোকেয়া
প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৫০
বাঙালি নারী মুক্তি আন্দোলনের নেত্রী মহীয়সী রোকেয়া তাঁর আহ্বানের অমর বাণীর জন্য সার্বজনীন হয়ে আছেন। নারীকে তিনি অন্ধকার থেকে আলোয় এনেছেন, নারীকে তিনি অবরোধ থেকে উন্মুক্ততায় দাঁড় করিয়েছেন, নারীকে তিনি নিরক্ষরতা থেকে মেধাসম্পন্ন করেছেন, নারীকে তিনি অসহায় থেকে অর্থ-সম্পদে স্বাবলম্বী করেছেন, নারীকে তিনি ব্যক্তিত্বের দূরদর্শিতা ও দক্ষতায় উপযুক্ত করেছেন। আজকের দিনে এটাকেই আমরা বলে থাকি নারীর ক্ষমতায়ন। আর এ কারণেই ইতিহাসের পাতায় রোকেয়া নারী নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
একশ’ বছর পূর্বে রোকেয়া এই নারীর ক্ষমতায়ন সম্পর্কে চিরন্তন সত্য কথাটি উচ্চারণ করেছিলেন, “পুরুষের সমকক্ষতা লাভের জন্য আমাদিগকে যাহা করিতে হয়, তাহাই করিব। যদি এখন স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জন করিলে স্বাধীনতা লাভ হয়, তবে তাহাই করিব। আবশ্যক হইলে আমরা লেডী কেরানী হইতে আরম্ভ করিয়া লেডী ম্যাজিস্ট্রেট, লেডী ব্যারিস্টার, লেডী জজ- সবই হইব! পঞ্চশ বত্সর পরে লেডী Viceroy হইয়া এদেশের সমস্ত নারীকে “রাণী’ করিয়া ফেলিব!! উপার্জন করিব না কেন? আমাদের কি হাত নাই, না পা নাই, না বুদ্ধি নাই? কি নাই? যে পরিশ্রম আমরা “স্বামী”র গৃহকার্যে ব্যয় করি, সেই পরিশ্রম দ্বারা কি স্বাধীন ব্যবসায় করিতে পারিব না?” (স্ত্রী জাতির অবনতি)।
রোকেয়ার প্রথম গ্রন্থ ‘মতিচূর (প্রথম খণ্ড)’ ১৫ই ডিসেম্বর ১৯০৪ সালে প্রকাশিত হয়। রোকেয়া ১৯০২ সাল থেকে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করে সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র বাইশ বছর। এ প্রবন্ধটি তাঁর দ্বিতীয় লেখা। রোকেয়ার মেধাসম্পন্ন চিন্তা-ভাবনা এখানে আমাদের গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন নারীর হাতেই সম্ভব নারীর প্রতিষ্ঠা, নারীর ক্ষমতায়ন। তিনি নারীকে অবরোধ থেকে টেনে খোলা আকাশের নিচে দাঁড় করিয়ে দেখাতে চেয়েছেন পুরুষের সমকক্ষতা লাভের জন্য নারীকে কি কি করতে হবে। গৃহকর্মে নারী যে পরিশ্রম করে, সেই পরিশ্রমকেও তিনি মূল্যায়ন করেছেন যে সেটা নারী স্বাধীন ব্যবসায় নিয়োজিত করতে পারে। গৃহকর্মে নারীর শ্রমকে পুরুষ তার দায়িত্ব মনে করে। কিন্তু সে শ্রম যে অর্থপূর্ণ সেটা কেউ বুঝতে চায় না। নারীর জন্মই যেন গৃহকর্ম সাধন করতে। এটা পুরুষ শাসিত সমাজ কর্তৃক প্রচলিত। গৃহকর্ম যে অর্থ উপার্জনের উপায়ও হতে পারে সেটা কেউ ভাবতে চায় না।
রোকেয়া আরও একটি অমূল্য সত্য উচ্চারণ করেছেন, “তোমাদের কন্যাগুলিকে সুশিক্ষিতা করিয়া কার্যক্ষেত্রে ছাড়িয়া দাও, নিজের অন্ন বস্ত্র উপার্জন করুক।” (স্ত্রী জাতির অবনতি) নারীর ক্ষমতায়নে এটা যে কত বড় সত্য কথা সেটা আজ একশ’ বছর পরে এসে চারপাশে তাকালে আমরা উপলব্ধি করতে পরি।
‘পদ্মরাগ’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯২৪ সালে। প্রকাশক রোকেয়া নিজেই ছিলেন। উপন্যাসটির আঠাশটি পরিচ্ছদ। এটি পড়লেই বোঝা যায় রোকেয়া অনেক চিন্তাভাবনা করে এ লেখাটি তৈরি করেছেন। এসময় তিনি তাঁর সাখাওয়াত্ স্কুলে ব্যস্ত ছিলেন। স্কুলের নানা সমস্যা ছাড়াও, নিয়মিত লেখালেখি, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় নানা কাজে সম্পৃক্ত থেকেও তিনি এই উপন্যাসটি শেষ করেন। এই উপন্যাসটি চিন্তা-চেতনা-মননের একটি সমৃদ্ধ ফসল। রোকেয়ার মানবিক দিকটি এখানে প্রচণ্ডভাবে প্রকাশিত। বিশেষ করে অসামপ্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি এবং শুদ্ধ বাঙালির চারিত্রিক দৃঢ়তায় তিনি যে কতখানি শক্তিশালী ছিলেন- এ উপন্যাসটি পাঠ করলে আমরা বুঝতে পারি। ১৯২৪ সালে প্রকাশিত হলেও ভূমিকায় রোকেয়া বলেছেন, ‘প্রায় ২২ বত্সর পূর্বের এই উপন্যাসখানি লিখিত হইয়াছিল।” অর্থাত্ ১৯০২ সালে এটি রচিত হয়, এরপর তিনি এটি পুনর্লিপি করেন দীর্ঘ সময় ধরে ‘অনেক স্থল পরিবর্তিত, পরিবর্ধিত ও পরিবর্জিত হইয়াছে।”
গ্রন্থের নায়িকা সিদ্দিকাকে রোকেয়ার মানসকন্যা ধরা হয়। তার মধ্য দিয়ে রোকেয়া তার আদর্শ কন্যাকে অঙ্কিত করেছেন এবং তার চিন্তা-ভাবনা ও কথাবার্তায় রোকেয়ার মানস চেতনা প্রকাশ পেয়েছে।
রোকেয়ার সময়ে ভারতের কিছু কিছু স্থানে নারীদের শিক্ষার্জনে এগিয়ে আসতে দেখি। এশিয়ার কিছু দেশেও নারীকে শিক্ষার্জন করতে দেখি। কিন্তু নারীর সমানাধিকারের দাবি প্রথম রোকেয়া তুলেছিলেন। পুরুষের সমকক্ষতা লাভের জন্য নারীকে তার ন্যায্য অধিকার এবং সুযোগ-সুবিধা দেবার দাবি প্রথম রোকেয়াই করেছিলেন। তিনি জানতেন রাষ্ট্র-সমাজ ও পরিবার নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে পারে। তিনি সমাজকে সচেতন হতে বলেছেন এবং রাষ্ট্রকে নারীর নাগরিক অধিকার প্রদানের পাশাপাশি তার দায়িত্ব পালনে বাধ্য থাকতে বলেছেন। রোকেয়ার লেখা ‘সুলতানার স্বপ্ন’ পাঠ করলে আমরা তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনার দূরদর্শিতার পরিচয় পাই।
পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থায় নারীমুক্তি সম্ভব নয় বলেই তিনি নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে চেয়েছেন। তাঁর নারী মুক্তির প্রধান শর্ত ছিল শিক্ষা ও কর্মসংস্থান। আজকের যে বিপুলসংখ্যক নারীকে আমরা সামান্য শিক্ষার্জন করেও কেরানী ও পিয়নের চাকরি, গার্মেন্টস ও অন্যান্য কারখানায় কাজ করতে দেখি, কুটির শিল্প কাজকর্মে দেখি, দোকান চালাতে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে সেটাও তো অনেক বড় প্রাপ্তি। রোকেয়া তো এইসব অসহায় ও দরিদ্র মেয়েদের নিজের পায়ে দৃঢ় হয়ে দাঁড়াতে বলেছেন যাতে নির্যাতন-বঞ্চনা-বৈষম্য-অবিচার-অন্যায়কে জয় করে তারা আপন ভাগ্য গড়ে তুলতে পারে।
লেখক :সাংবাদিক