রাজা ও প্রজার সমীকরণ

সভা-সমাবেশ করিতে বিরোধী দল পুলিশ প্রশাসনের অনুমতি চাহিয়াও পায় না। পক্ষান্তরে শাসক দলের কোনো অনুমতির প্রয়োজন হয় না। তাহারা কাহারও অনুমতি চাহেও না। গত চার বত্সরে বরিশালে ক্ষমতাসীন দলের শাখা-প্রশাখা কর্তৃক বিনা অনুমতিতে পৌনে দুইশত সমাবেশ হইয়াছে। বইয়ে লেখা আইন অনুযায়ী ওইসব সমাবেশ সিদ্ধ না হইলেও পুলিশ প্রটেকশনের কমতি হয় নাই কখনই। কিন্তু ক্ষমতার বাহিরে যাহারা, যাহারা শাসিতের দলভুক্ত, তাহাদের বেলায় বিনা অনুমতিতে সমাবেশ কিংবা অন্য কোনও কর্মসূচি পালন করা সোজা কথা নয়। করিতে গেলে প্রশাসনের মাথার উপর যেন আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়ে, তাহাদের ক্রোধের সীমা থাকে না। এই খবর বরিশালের। সম্প্রতি এইরূপ একটি রিপোর্ট ছাপা হইয়াছে পত্রিকান্তরে। কিন্তু ভাবিয়া বুঝিয়া উঠা কঠিন, ইহাতে পত্রিকার সংবাদ হইবার মত কী আছে! এইরকমই তো হইবার কথা, এইরূপই তো চলিয়া আসিতেছে যুগ যুগ ধরিয়া। এই যদি না হইবে, তাহা হইলে রাজা আর প্রজা কেন! শাসক আর শাসিতের ব্যবধানই বা বুঝিতে পারা যাইবে কেমন করিয়া! রসিক রাজা রাগিয়া মাগিয়া গোপালকে শুধাইয়াছিলেন, ওহে গোপাল তোমাতে আমাতে ব্যবধান কতদূর, জান কি তা! প্রত্যুত্তরে সপ্রতিভ গোপাল হাত দিয়া দূরত্ব মাপিয়া বলিয়া দিয়াছিল, এই তো মাত্র তিন হাত। রসজ্ঞ রাজন সহাস্যবদনে তাহাই মানিয়া লইয়াছিলেন। কিন্তু ইহা গল্প, বাস্তব নয়। প্রকৃতপক্ষে রাজা ও প্রজার মধ্যে দূরত্ব যোজন যোজন, উহা অনতিক্রম্য। ডেমোক্র্যাসির যুগে এহেন উপসংহার সুশীলগণের মনে মানিবে না। অস্বাভাবিক নয় যে, তাহারা বিরক্তিতে ভ্রূ কুঞ্চিত করিবেন। বলিবেন, এইখানে রাজা ও প্রজার কথা আসে কি করিয়া! রাজা-বাদশার দিন তো গত হইয়াছে বহুকাল! উহার চিহ্ন আছে কেবল যাদুঘরে আর বইয়ের পাতায়। আমরা বলি, বটে! সংসদীয় গণতন্ত্রের সূতিকাগার ব্রিটেনে ওয়েস্টমিন্সটার ডেমোক্র্যাসির মাথার মুকুট এখনও রাজতন্ত্র। নখ-দন্তহীন কিন্তু আভিজাত্যে সর্বসেরা। এই অবস্থাটিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের অনেকে প্রকাশ করেন এইভাবে, রাজা মৃত, কিন্তু মৃত্যুহীন। রাজা ও রাজতন্ত্র না থাকিলেও তৃতীয় বিশ্বের গণতন্ত্রের মধ্যেই বাঁচিয়া আছে রাজন্য। প্রজাতন্ত্রে প্রজা আছে, সে তো বলাই বাহুল্য। আর প্রজা যেখানে আছে সেখানে রাজা না থাকিয়াই পারে না। সখেদে কেহ কেহ ইহাকে সরিষার মধ্যেকার ভূতের সঙ্গে তুলনা করিতে পারেন। কিন্তু রাজকুলের এবং রাজানুকূল্যধন্যগণের দর্প চূর্ণ করিবার সাধ্য কার! রাজকুল এবং তাহাদের আশীর্বাদপুষ্টগণের ক্ষমতা, দর্প, আভিজাত্য ও অভিলাষ রক্ষায় আমলাগণ তো আছেনই। এ তো বিজ্ঞানের কথা! ইহসংসারে কোনো কিছুই নিঃশেষ হইয়া যায় না, রূপান্তর ঘটে মাত্র। রাজতন্ত্র গিয়াছে। প্রজাতন্ত্র হইয়াছে গণতন্ত্রের নানা দেশে। নওয়াব-জমিদার নাই। আমলা আছে। তাহারাই জমিদার। তাহারা রাজার দল বা কিংস পার্টির মর্যাদা, ক্ষমতা ও দর্প রক্ষা করিতে সতত সক্রিয়। অনুমতি চাহিয়া, আইন মান্য করিয়া রাজার লোকেরা প্রজার মত হীনবল হইয়া থাকিবে ইহা তো হইতে পারে না। আর সেইদিকে লক্ষ্য রাখা নব্য জমিদারগণের অতিঅবশ্য কর্তব্য বৈ কি! রাজা যাইবে, রাজা আসিবে। কিন্তু ঘাটে ঘাটে, প্রজাতন্ত্রের স্তরে স্তরে থাকিয়া যাইবে নবরূপে জমিদার, যাহারা রাজার গৌরব সদাসমুন্নত রাখিবে প্রজাদের ভূলুণ্ঠিত করিয়া হইলেও। অতঃপর আমরা স্মরণ করি মহামতি প্লেটোর সেই অমর বাণী; জগতের সকল রাজাই উঠিয়া আসিয়াছেন দাসদের মধ্য হইতে এবং সকল দাসই বহন করেন রাজন্যের উত্তরাধিকার।