ফিলিপাইনসের সপ্তম প্রেসিডেন্ট র্যামন ম্যাগসেসে তার রাষ্ট্রসেবার জন্য বিশ্বনেতায় পরিণত হয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট র্যামন ১৯৫৭ সালের ১৭ মার্চ একটি রহস্যঘেরা বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন। তার বিশ্বব্যাপী মহান অবদানের বিবেচনায় ১৯৫৭ সালের এপ্রিলে নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত রকফেলার ব্রাদার্স ট্রাস্ট ফান্ড রূপে একটা ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করে একটা বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করে। নিউ ইয়র্ক নগরীতে এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ফিলিপাইনস সরকারের সহযোগিতায়, যা 'নোবেল প্রাইজ অব এশিয়া' হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। রাষ্ট্রীয় সার্ভিসে সুবিশাল অবদান রাখা, পাবলিক সার্ভিস, কমিউনিটি লিডারশিপ, সাংবাদিকতা, সাহিত্য, এবং সৃজনশীল কমিউনিকেশন আর্টস এবং শান্তি ও আন্তর্জাতিক ইমার্জেন্ট লিডারশিপ ও আন্তর্জাতিক অবদান ইত্যাদি ক্ষেত্রে অবদানে বিশ্বব্যাপী বরেণ্য ব্যক্তিদের প্রতি বছর পুরস্কৃত করার একটা মহতী উদ্যোগ পরিচালিত হয়ে আসছে সেই সময় থেকে। ফিলিপাইনসের রাজধানীর ম্যানিলা নগরীতে র্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন (র্যামন ম্যাগসেসে সেন্টার) প্রতিষ্ঠা করেছে ।
ছয় দশক ধরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট অবদানের স্বীকৃতি রূপে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ৩৫৩ জন ব্যক্তিত্বকে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। প্রথম অ্যাওয়ার্ডটি চালু করা হয়েছিল ১৯৫৮ সালে। ৩১ আগস্ট রাষ্ট্রনায়ক র্যামন ম্যাগসেসের জন্মবার্ষিকীতে এটি চালু হয়েছিল । র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কারটি বিশ্বব্যাপী একটি সম্মানজনক পুরস্কার, বিশেষত এই কারণে যে তিনি নিয়ে বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন এক নেতা ছিলেন । অতি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসেছিলেন। বাবা ছিলেন একজন কর্মকার । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ফিলিপিনস আর্মির ৩১ পদাতিক বাহিনীতে যোগদান করেন। কিন্তু ১৯৪২ সালে দেশটির বাতার অঞ্চল যখন জাপানিরা দখল করে নেয়, তখন অতি কষ্টে কাকতালীয়ভাবে অন্তত চার বার জাপানি সেনাদের ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যান । এরপর লুজন গেরিলা ফোর্সে যোগদান করেন এবং ক্যাপ্টেন পদে কমিশন লাভ করেন। যুদ্ধের পর তিনি তার সহযোদ্ধা গেরিলাদের অনুরোধে লিবারেল পার্টি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ফিলিপিনস হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ নির্বাচিত হন। ম্যাগসেসের নামে প্রবর্তিত পুরস্কার বাংলাদেশের প্রফেসর আবদুল্লাহ আবু সাঈদ (বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠাতা কিংবদন্তিতুল্য পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব), সাংবাদিক-সম্পাদক মতিউর রহমান (সম্পাদক / দৈনিক প্রথম আলো), অ্যানজেলা গোমেজ ও তাহেরুন্নেসা আবদুল্লাহ (দুই বারে দুই এনজিও ব্যক্তিত্ব হিসেবে), পরিবেশবিদ সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রমুখ সম্মানিত হয়েছেন । ভারতে ও এশিয়ার অন্যান্য দেশের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি এই অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছেন ।
১. র্যামন ম্যাগসেসে ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমি, সাহসী ও বিনয়ী। নিজ দেশের প্রতি তার ছিল অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং আস্থা । তিনি বলেছিলেন, “I believe that the President should set the example of a big heart, an honest mind, sound instincts, the virtue of healthy impatience and an abiding love for the common man. ' খুব ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যাবে, শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে র্যামন ম্যাগসেসের অদ্ভুত রকমের চারিত্রিক মিল রয়েছে। আর সে কারণেই এমন ভাবনা যে, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নামেও এমন একটি আন্তর্জাতিক মানের অ্যাওয়ার্ড প্রবর্তন করা যায় কি না । বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দুনিয়া জোড়া সুনাম অর্জন করে গেছেন। কেবল বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়াই নয়, তার আমলে (১৯৭৫-১৯৮১ মে/৩০) আন্তর্জাতিক কূটনীতি-রাজনীতির ক্ষেত্রে নিজেকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা এই যে, র্যামন ম্যাগসেসে যেমন রহস্যময় প্লেন ক্রাশে নিহত হন, জিয়াউর রহমানও ষড়যন্ত্রকারীদের সম্মিলিত চক্রান্তে নিষ্ঠুরভাবে নিহত হয়েছিলেন মাত্র ৪৫ বছর বয়সে। রাষ্ট্রনায়ক জিয়া ১৯৮০ সালে শুরু হওয়া ইরান-ইরাক যুদ্ধ-বন্ধে তৎপর হয়ে উঠেছিলেন। তিনিই এই দক্ষিণ-এশীয় অঞ্চলে বিশাল যৌথ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অবদান রাখার লক্ষ্যে দক্ষিণ- এশীয় আঞ্চলিক সহযোগতা সংস্থা (সার্ক) গড়ে তোলার প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন। তার সব কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি সার্ক ও বিশ্বনেতারা পরে দিয়েছিলেন অকাতরে। তার হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্বের অন্যতম সেরা জানাজা অনুষ্ঠানটি ছিল। কারণ জিয়া ছিলেন দেশে ও আন্তর্জাতিক মহলে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। ম্যাগসেসেও নিহত হওয়ার সময় ছিলেন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে।
সে কারণেই বলছি, শহিদ জিয়ার নামে বাংলাদেশের একটি আন্তর্জাতিক অ্যাওয়ার্ড প্রবর্তন বাঞ্ছনীয় এবং যৌক্তিক। এই পুরস্কারটি বছরে রাষ্ট্রনায়ক বা বিখ্যাত লড়াকু রাজনীতিবিদ এবং সমাজের জন্য বিশেষ অবদান রাখা ব্যক্তিদের দেওয়া যেতে পারে। কয়েকটি ক্যাটাগরি রাখা যেতে পারে। পুরস্কারের একটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অর্থমূল্য হবে। উল্লেখ করা যেতে পারে, প্রতি বছর র্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড বেশ কয়েকটি দেওয়া হয় এবং তার প্রতিটির অর্থমূল্য বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬০ বা ৭০ লাখ টাকার সমান । যেহেতু সারা বিশ্ব থেকে মানে প্রায় ২৫০ রাষ্ট্র, ও অঞ্চল (কাছাকাছি সংখ্যক ) থেকে প্রতিযোগিতার জন্য এই সংখ্যক ব্যক্তিত্বকে যাচাই-বাছাই তালিকায় আনা হবে। আর বাছাই ও মনোনয়ন চূড়ান্ত করবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন একটি বড় আকারের ট্রাস্ট-বডি (যার সদস্যসংখ্যা হবে কমবেশি ১৫ জন এবং তারা বিশ্বব্যাপী স্বনামখ্যাত পণ্ডিত, বুদ্ধিজীবী, লেখক, সাংবাদিক, রাজনীতিক প্রমুখ ব্যক্তিত্ব)। প্রতি বছর ট্রাস্টের চল্লিশ শতাংশ সদস্যকে অদল-বদল করা যেতে পারে। আর প্রতি বছর জিয়াউর রহমানের জন্মবার্ষিকীতে ঢাকায় অ্যাওয়ার্ড প্রদান অনুষ্ঠানে অন্তত বিশ্বসেরা ৩০০ ব্যক্তিত্বকে আমন্ত্রণ জানিয়ে আনা যেতে পারে অংশগ্রহণের জন্য ।
এই অ্যাওয়ার্ডের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে শহিদ জিয়াউর রহমানের কথা মাথায় রেখে। ১৯৯৫ সাল থেকে ভারত গান্ধী আন্তর্জাতিক প্রিস প্রাইজ দিতে শুরু করেছে। মহাত্মা গান্ধীর নামানুসারে প্রবর্তিত ঐ পুরস্কার দল-মত- ধর্ম-বর্ণ-দেশ-জাতিনির্বিশেষে দেওয়া হয়ে থাকে । জুরি বোর্ডে থাকেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলীয় নেতা, ভারতের প্রধান বিচারপতি এবং লোকসভার স্পিকার। এছাড়াও দুজন প্রথিতযশা ব্যক্তিকে বোর্ডে তিন বছরের জন্য মনোনীত করা হয়। ১৯৯৮ সাল থেকে পাকিস্তানের জিন্নাহ সোসাইটি জিন্নাহ অ্যাওয়ার্ড চারু করেছে। তবে সেটাকে আন্তর্জাতিক বলা যায় না। এটি মূলত পাকিস্তান ও এর জনগণের প্রতি বিশেষ অবদানের জন্য দেওয়া হয়। সবচেয়ে বড় কথা যে নামে পুরস্কার প্রবর্থন করা হয়, সেই নামটির একটি বিশেষ ভার থাকতে হয়। সেই বিচারে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে যথোপযুক্ত এতে কোনো সন্দেহ নেই ।
লেখক : সংসদ সদস্য, বিএনপির যুগ্মমহাসচিব ও সাবেক ডাকসু সাধারণ সম্পাদক

