মানবসভ্যতার জন্মই প্রকৃতির আঁতুড়ঘরে। সভ্যতার অগ্রগতিতে সেই আঁতুড়ঘরই ক্রমশ বিপন্ন হয়ে পড়ছে। বিপন্নের উপলব্ধি কিন্তু আজকের নয়। এক শতাব্দী আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায় ধরা পড়েছিল প্রকৃতি ধ্বংসের সেই উদ্বেগ। তপোবন প্রবন্ধে লিখেছিলেন, 'মানুষকে বেষ্টন করে এই যে জগৎপ্রকৃতি আছে, এ যে অত্যন্ত অন্তরঙ্গভাবে মানুষের সকল চিন্তা, সকল কাজের সঙ্গে জড়িত হয়ে আছে। মানুষের লোকালয় যদি কেবলই একান্ত মানবময় হয়ে ওঠে, এর ফাঁকে ফাঁকে যদি প্রকৃতি কোনোমতে প্রবেশাধিকার না পায় তাহলে আমাদের চিন্তা ও কর্ম কলুষিত ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে নিজের অতলস্পর্শ আবর্জনার মধ্যে আত্মহত্যা করে মরে।' প্রকৃতির প্রতি অনুরাগে তো বটেই, সেই সঙ্গে আসন্ন দিনের উদ্বেগ থেকেও কলম ধরেছেন তিনি ।
গ্লোবান ওয়ার্মিং হিমবাহের গলন, আন্টার্কটিকায় সতর্কবার্তা, ভূমিকম্প, ভূমিধস, আবহাওয়ার মারাত্মক খামখেয়ালি মনোভাব- সতর্কবার্তা একাধিকভাবে এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং যুদ্ধ— সব মিলিয়ে পৃথিবী এক গভীর সংকটের মুখে। এই চিন্তার মধ্যেই প্রশ্ন উঠছে ২০৫০ সালের পৃথিবী কেমন হবে? এখনো কি সময় আছে পরিস্থিতি বদলানোর? পৃথিবী কেবল মানুষের নয়, কোটি কোটি প্রাণী, উদ্ভিদ ও বাস্তুতন্ত্রেরও আবাসস্থল। কিন্তু ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, দূষণ এবং যুদ্ধ—সব মিলিয়ে পৃথিবী এক বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি। রাষ্ট্রপুঞ্জের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) সতর্ক করে বলছে, এখনই বড় পরিবর্তন না আনলে ২০৫০ সালের পৃথিবী আরো উষ্ণ, আরো দূষিত এবং আরো বসবাস অযোগ্য হয়ে উঠবে।
আজকের পৃথিবী এক অভূতপূর্ব পরিবেশগত সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং দূষণকে ‘ত্রিমুখী বৈশ্বিক সংকট' হিসেবে চিহ্নিত করেছে। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহার, অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়ন, দ্রুত নগরায়ণ, বনভূমি ধ্বংস এবং অতিভোগবাদী অর্থনৈতিক সংস্কৃতির কারণে পৃথিবীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলস্বরূপ বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়ছে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্র অভূতপূর্ব চাপের মুখে পড়ছে । সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ দাবানল, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা, খরা এবং শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের ঘটনা জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব প্রভাবকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন যে, বৈশ্বিক উষ্ণতা যদি শিল্পবিপ্লব- পূর্ব সময়ের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বৃদ্ধি পায়, তাহলে পৃথিবীর বহু বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি অপরিবর্তনীয় হয়ে যেতে পারে। এর ফলে খাদ্য উৎপাদন, পানিসম্পদ, জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশের জন্য এই সংকট আরো গভীর ও বহুমাত্রিক। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসারণে দেশের অবদান অত্যন্ত সামান্য হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে এখানেই । ভৌগোলিক অবস্থান, নদীবাহিত বদ্বীপ অঞ্চল, দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং উচ্চ জনঘনত্ব বাংলাদেশের ঝুঁকিকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তার, নদীভাঙন, বন্যা, জলাবদ্ধতা এবং ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগ দেশের অর্থনীতি
ও মানুষের জীবনযাত্রাকে ক্রমাগত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অত্যন্ত উদ্বেগজনক । সমুদ্রের লবণাক্ত পানি কৃষিজমিতে প্রবেশ করায় ফসল উৎপাদন কমে যাচ্ছে। সুপেয় পানির উৎস সংকুচিত হচ্ছে। উপকূলীয় নারীরা অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদ পানির জন্য কয়েক কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে বাধ্য হচ্ছেন। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষের জীবন, সম্পদ এবং অবকাঠামো বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ জীবিকা হারিয়ে শহরমুখী হচ্ছে, যা জলবায়ুজনিত অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির একটি বড় কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে । জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সমাজের সব স্তরের মানুষের ওপর সমানভাবে পড়ে না। দরিদ্র, প্রান্তিক এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় । একজন কৃষক যখন বন্যা বা খরার কারণে ফসল হারান, একজন জেলে যখন মাছের প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হওয়ায় জীবিকার সংকটে পড়েন, অথবা
একজন দিনমজুর যখন দুর্যোগের কারণে কাজ হারান, তখন জলবায়ু পরিবর্তন একটি পরিবেশগত সমস্যার গণ্ডি পেরিয়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নেয় ।
বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি দেশ । বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চল, সিলেটের চিরসবুজ অরণ্য, হাওর-বাঁওড় এবং বিস্তৃত নদী ব্যবস্থাপনা অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল। সুন্দরবন শুধু রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাস নয়; এটি উপকূলীয় অঞ্চলের কোটি মানুষের জন্য একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা বেষ্টনী। কিন্তু বন উজাড়, জলাভূমি ধ্বংস, দূষণ, অবৈধ দখল এবং বন্যপ্রাণী পাচারের কারণে দেশের জীববৈচিত্র্য ক্রমাগত হুমকির মুখে পড়ছে।
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বর্তমানে বিশ্ব জুড়ে যে ধারণাটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে তা হলো ‘প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান'। এই ধারণার মূল কথা হলো প্রকৃতির নিজস্ব শক্তি, প্রক্রিয়া এবং বাস্তুতান্ত্রিক সেবাকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশগত ও সামাজিক সমস্যার সমাধান করা। ম্যানগ্রোভ বন উপকূলকে ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতি থেকে রক্ষা করে, জলাভূমি অতিরিক্ত পানি ধারণ করে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করে এবং বনভূমি বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন শোষণ করে বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাতে সহায়তা করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। সুন্দরবনের সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ, উপকূলীয় বনায়ন, নদী ও জলাভূমি পুনরুদ্ধার, নগর সবুজায়ন এবং কৃষিতে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার দেশের জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে এসব উদ্যোগ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় অর্থনীতির উন্নয়নেও সহায়ক হবে। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের জলাভূমিগুলোর দ্রুত সংকোচন খাল, বিল, পুকুর এবং অন্যান্য জলাধার ভরাট করে আবাসন প্রকল্প ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের ফলে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে জলাবদ্ধতা, আকস্মিক বন্যা এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা বাড়ছে । একই সঙ্গে মাছ, পাখি, উভচর প্রাণী এবং জলজ উদ্ভিদের আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। জলাভূমি শুধু পানির আধার নয়; এগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, কার্বন সংরক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
পরিবেশ দূষণের বড় উৎস হলো প্লাস্টিক। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যাপক ব্যবহার নদী, খাল, সমুদ্র এবং নগর পরিবেশকে দূষিত করছে। প্লাস্টিক সহজে পচনশীল নয়; বরং দীর্ঘদিন পরিবেশে থেকে মাটি ও পানির গুণমান নষ্ট করে। সাম্প্রতিক গবেষণায় মানবদেহের রক্ত, ফুসফুস এবং এমনকি গর্ভস্থ শিশুর শরীরেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এটি শুধু পরিবেশ নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও একটি গুরুতর হুমকি । তাই প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, পুনর্ব্যবহার বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্প উপকরণের ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালার অভাব নেই । সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর অর্পণ করা হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, জীববৈচিত্র্য আইন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন এবং বিভিন্ন নীতিমালা পরিবেশ সুরক্ষার আইনি ভিত্তি প্রদান করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং তদারকির ঘাটতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক সংঘাতের প্রভাব। পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাত শুধু মানবিক বিপর্যয়ই তৈরি করছে না, বরং জ্বালানি সরবরাহ, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পরিবেশের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
২০৫০ সালে পৃথিবী কেমন রূপ ধারণ করবে, তার একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে জাতিসংঘের গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট আউটলুক রিপোর্টে। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন না হলে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন বার্ষিক ৭৫ বিলিয়ন টনে পৌঁছবে, যা বর্তমানের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। এর ফলে জলবায়ুতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হবে । তবে এখনো সময় ফুরিয়ে যায়নি। বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল বার্তাই হলো—পৃথিবী সংকেত পাঠাচ্ছে, এখন মানুষের উত্তর দেওয়ার পালা। গাছ লাগানো, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, জল ও প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণের মাধ্যমে পরিবর্তন সম্ভব। ছোট ছোট পদক্ষেপও বড় পরিবর্তনের ভিত্তি গড়ে দিতে পারে ।
লেখক : ফিকামলি তত্ত্বের জনক, বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক শিক্ষক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

