পেশাজীবী সংগঠন ও রাজনীতি

রাজধানীতে গত বুধবার অনুষ্ঠিত এক গোল টেবিল বৈঠকে বক্তারা দেশের পেশাজীবী সংগঠনগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক অনুগত্য বা দলবাজির চিত্র তুলিয়া ধরিয়া তাহাদের এহেন মানসিকতার সমালোচনা করিয়াছেন। তাহাদের ভাষায়, পেশাজীবী সংগঠনসমূহের মাঝে দলীয় ‘লেজুড়বৃত্তি’ ঐ সব সংগঠনের স্বাতন্ত্র্য ক্ষুণ্ন করিতেছে। এই সভার উদ্যোক্তারা সন্দেহাতীতভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সময়োচিত বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ করিয়া দিয়াছেন। দেশের বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা দেশের প্রধান দুইটি দলের কোন না কোনটির প্রতি আনুগত্য এখন সর্বজনবিদিত সত্য। ইহাতে আপাতদৃষ্টিতে রাজনৈতিকভাবে ফায়দা লুটিবার মনোভাবই প্রকটভাবে ফুটিয়া ওঠে বৈকি? কিন্তু একই সঙ্গে এই সত্যকেও নিশ্চয়ই অস্বীকার করা যাইবে না যে, দেশে বৈষম্য, অব্যবস্থা, রেষারেষি থাকিলে কিংবা নিয়মনীতির বালাই না থাকিলে পেশাজীবী সংগঠনগুলির মধ্যকার এই রাজনৈতিক দলবাজির মনোবৃত্তি বজায় থাকাটাই স্বাভাবিক। কোন পেশাজীবী যখন কোন রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়াইয়া পড়েন তখন যে তাহার পক্ষে পেশার প্রতি সুবিচার করাটা খুবই কঠিন হইয়া পড়ে ইহাও মিথ্যা নহে। পেশাজীবীর রাজনীতি করিবার অধিকার নিশ্চয়ই আছে কিন্তু সে ক্ষেত্রে উহা যেন গণকল্যাণমুখী রাজনীতি হয়, নিছক দলবাজি নহে। আর তাহা হইলেই সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী তাহার পেশা নির্দেশিত দায়-দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে পরাঙ্মুখ থাকিবেন না। কিন্তু শুধু যদি দলীয় আনুগত্য কিংবা দল হইতে ব্যক্তিগত স্বার্থ বা সুবিধা আদায়ই তাহার লক্ষ্য হইয়া থাকে তাহা হইলে ঐ পেশাও গণমানুষের চোখে প্রশ্নবিদ্ধ হইয়া পড়ে। চিকিত্সা, সাংবাদিকতা, প্রকৌশল, বিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব, আইন, এই সকল পেশার মূল লক্ষ্য সমাজ ও জনসেবা। সুতরাং ইহাও এক প্রকার কল্যাণধর্মী কাজ বিধায় রাজনীতির সহিত খানিক সংশ্রব এ ক্ষেত্রে থাকাটা অন্যায় নহে। কিন্তু জনকল্যাণকে গৌণ করিয়া ব্যক্তিগত স্বার্থোদ্ধার যদি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হয় তবেই বিপদ। রাষ্ট্রের উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রকে গতিশীল রাখিতে রাজনীতির কোন বিকল্প নাই। রাজনীতিই দেশ ও সমাজকে সবল রাখে এবং রাষ্ট্রের জন্য দিক-নির্দেশনা করে। প্রকৃত প্রস্তাবে দেশের উন্নয়নের লক্ষ্যকে সামনে রাখিয়াই অধিকাংশ পেশাজীবীকে তাহার পেশাগত দায়িত্ব পালন করিতে হয়। ব্যক্তিগতভাবে অর্থাগম বা নানান সুবিধা সেই পেশার কল্যাণে অর্জন করা সম্ভব বটে কিন্তু উহা যেন স্বার্থমগ্নতার নামান্তর না হয় সে দিকে দৃষ্টি রাখাটাই এ ক্ষেত্রে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। পেশাজীবীরা যদি হালুয়া-রুটির বখরা আদায়ের দিকে অধিক মনোনিবেশ করেন তাহা হইলে জনসাধারণ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হইতে বাধ্য তেমনি আবার ঐ পেশার ক্ষেত্রে বিশৃংখলা সৃষ্টি হওয়াটাই অবশ্যম্ভাবী। পেশাজীবীরা দলীয় আনুগত্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবী আদায় করিয়া নিতে পারেন আর তেমন ক্ষেত্রে যোগ্য ব্যক্তির স্থলে ঐ অনুগত ব্যক্তিই সে পদে নিয়োগ পাইলে কাজে শৃংখলাহীনতা ও গতিহীনতা দেখা দেয়। এ সবই নিরেট সত্য কথা। কিন্তু ইহা অপেক্ষাও কঠিন ও বাস্তব সত্য এই যে, সমাজে নিয়ম-শৃংখলার ব্যত্যয় ঘটাইয়া কর্তাব্যক্তিরা যখন যোগ্যতার স্থলে আনুগত্যকেই সঠিক প্রয়োজনীয় বলিয়া জ্ঞান করেন এবং সেই মোতাবেক পেশাজীবীদের মধ্য হইতে নিজস্ব চেলাচামুন্ডা সৃষ্টি করেন তখন যে বৈষম্যপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি হয় তাহাতে পেশাজীবীদের মাঝে আনুগত্যের প্রতিযোগিতায় শামিল হওয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় খোলা থাকে কি? মোদ্দাকথা, সমাজে বৈষম্য বজায় রাখিয়া পেশাজীবীদের নিকট হইতে কেবল পেশাদায়িত্ব আশা করাটা বাতুলতা মাত্র।