মহান স্বাধীনতা লাভের পর ৫৫ বৎসর অতিক্রান্ত হইয়াছে; কিন্তু দুঃখজনক হইলেও সত্য যে, এত বৎসর পরও দেশের বিশেষত দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য প্রত্যাশিত উন্নয়ন এখনো অধরা। বরিশাল বিভাগ সামগ্রিকভাবে জাতীয় উন্নতি ও প্রগতির মূলধারা হইতে অনেকাংশে আজও বিচ্ছিন্ন ও উপেক্ষিত। তবে জাতীয় সংসদে আজ বিকালে যে নূতন অর্থবৎসরের বাজেট উপস্থাপিত হইতে যাইতেছে, তাহাকে কেন্দ্র করিয়া সমগ্র বরিশালবাসীর মনে এক নূতন আশার সঞ্চার হইয়াছে। এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে দীর্ঘকাল ধরিয়া যে চারটি মৌলিক দাবি উত্থাপিত হইয়া আসিতেছে, এই বারের বাজেটে তাহার সপক্ষে বিশেষ বরাদ্দের সংস্থান রাখা একান্ত আবশ্যক বলিয়া আমরা মনে করি।
উক্ত দাবিসমূহের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী হইল ফরিদপুরের ভাঙ্গা হইতে বরিশাল হইয়া কুয়াকাটা পর্যন্ত বিস্তৃত মহাসড়কটিকে গুরুত্ব প্রদানপূর্বক ছয় লেনে উন্নীতকরণ। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের অবসান ঘটিলেও, অনুন্নত ও অপ্রশস্ত সড়কের কারণে তাহার প্রকৃত সুফল হইতে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ বঞ্চিত। রাজধানী হইতে ভাঙ্গা পর্যন্ত দৃষ্টিনন্দন এক্সপ্রেসওয়ে নির্মিত হইলেও পরবর্তী অংশটি মাত্র ২৪ ফিট প্রশস্ততায় রহিয়া গিয়াছে। ইহাতে ১০টি জেলার যানবাহন চলাচলের সময় যানজটসহ নানা সমস্যা দেখা দিতেছে। পদ্মা সেতু নির্মিত হইবার পর স্বাভাবিকভাবে এই সড়কে যানবাহনের চাপ বাড়িয়াছে; কিন্তু এই পথ সংকীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বলিয়া ঢাকা হইতে বরিশালে পৌঁছাইতে বর্তমানে চার হইতে পাঁচ ঘণ্টা সময় নষ্ট হইতেছে, অথচ ছয় লেন সম্পন্ন হইলে মাত্র দুই ঘণ্টায় এই পথ অতিক্রম করা সম্ভব। উল্লেখ্য, ফরিদপুরের ভাঙ্গা হইতে মাদারীপুর ও বরিশাল হইয়া পটুয়াখালীর কুয়াকাটা পর্যন্ত এই মহাসড়কটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২০৫ কিলোমিটার; কিন্তু জমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতায় প্রকল্পের মূল নির্মাণকাজ এখনও ধীরগতিতে চলমান। ২০১৮ সালে এই সড়ক সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য বিশেষ বরাদ্দ প্রদান করা হয়; কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ভূমি অধিগ্রহণে মন্থর গতি এবং বলিতে গেলে প্রশাসনিক অনীহার কারণে বিগত আট বৎসরেও সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় নাই। ইহা অত্যন্ত দুঃখজনক। মহাসড়কটি ছয় লেনে রূপান্তরিত না হইবার কারণে বড় বড় শিল্পপতি এই অঞ্চলে কারখানা স্থাপনে বিমুখ রহিয়াছেন। অথচ সরকারের সদিচ্ছা এবং সঠিক তদারকি থাকিলে আগামী দুই হইতে তিন বৎসরের মধ্যে এই মহাসড়কের কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব।
অর্থনৈতিক গুরুত্বের বিচারে এই মহাসড়কটি অপরিসীম তাৎপর্য বহন করে। পায়রা সমুদ্রবন্দর এবং কুয়াকাটা পর্যটনকেন্দ্রের সংযোগ রক্ষাকারী একমাত্র পথ এই মহাসড়ক। তাই মহাসড়কটি প্রশস্ত হইলে বরিশাল অঞ্চলে শিল্পোন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হইবে, কৃষিপণ্য দ্রুত রাজধানীতে পৌছাইবে, দেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য বৃদ্ধি পাইবে এবং কুয়াকাটার আন্তর্জাতিক পর্যটন সম্ভাবনা পূর্ণতা লাভ করিবে। মহাসড়কের পাশাপাশি অন্য তিনটি দাবিও এই অঞ্চলের অস্তিত্বের সহিত জড়িত। প্রথমত, বিশ্বমানের পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটার সৈকত ভাঙন রোধে ৮০০ কোটি টাকার প্রকল্প দীর্ঘ দিন যাবৎ পরিকল্পনার অভাব ও আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচে আটকাইয়া রহিয়াছে; ইহার দ্রুত অনুমোদন ও মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন চাই। দ্বিতীয়ত, ভোলার বিপুল গ্যাসক্ষেত্র ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে মূল ভূখণ্ডের সহিত যুক্ত করিতে ‘ভোলা-বরিশাল সেতু’ নির্মাণ এখন সময়ের দাবি, যাহার অভাবে সন্ধ্যা নামিলেই ভোলা জেলা দেশ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়ে। তৃতীয়ত, বিভাগীয় সদর বরিশালে একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল নাই। শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজটি রেফারেল হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ। ফলে হার্ট অ্যাটাক বা ব্রেইন হেমারেজের মতো জটিল রোগে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঢাকার পথে যাত্রা করিতে হয়। তাই সেইখানে অবিলম্বে একটি আন্তর্জাতিক মানের বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা দরকার।
অতএব, আজিকার বাজেটে উল্লিখিত প্রকল্পগুলির জন্য থোক বরাদ্দ নিশ্চিত করা হইবে বলিয়া আমরা আশা করি। বিশেষ করিয়া ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা দূর করিতে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করা আবশ্যক। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক উদ্যোগই পারে দক্ষিণাঞ্চলের এই ন্যায্য দাবিগুলি পূরণ করিয়া দেশের সামগ্রিক জিডিপিতে এক নতুন গতি সঞ্চার করিতে।

