বিশ্বকাপ ফুটবল: বিশ্বের মানবিক মহামিলন

আপডেট : ১২ জুন ২০২৬, ০৬:০০

মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন ঘটনা খুব বেশি নাই-যাহা ভাষা, ধর্ম, জাতি, বর্ণ, মতাদর্শ ও ভূরাজনীতির বিভাজন অতিক্রম করিয়া একযোগে কোটি কোটি মানুষকে একই আবেগে একত্রিত করিতে পারে। ফিফা বিশ্বকাপ সেই বিরল ঘটনাগুলির মধ্যে অন্যতম। গতকাল রাত্রি হইতে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মাটিতে আরম্ভ হইয়াছে ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ-যাহাকে অনেকে যথার্থই 'পৃথিবীর সর্ববৃহৎ প্রদর্শনী' বলিয়া অভিহিত করেন। এইবারের আসর ইতিহাসের বৃহত্তম-প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশ অংশগ্রহণ করিবে এবং মোট ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হইবে।

ফুটবলের এই মহোৎসব কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নহে-ইহা মানবসমাজের এক বিস্ময়কর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঘটনা। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশে ফুটবল খেলা হয়। ফিফার সদস্যসংখ্যা ২১১-যাহা জাতিসংঘের সদস্যসংখ্যারও অধিক। এবারের বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে ২০৬টি দেশ অংশগ্রহণ করিয়াছে। এমন সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা অন্য কোনো খেলার ভাগ্যে জোটে নাই। বিশ্বকাপের ইতিহাসও কম গৌরবময় নহে। ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়। সেই হইতে প্রতি চার বৎসর অন্তর এই প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হইতেছে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার কারণে ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় নাই। ইহা আমাদের স্মরণ করাইয়া দেয়, যুদ্ধ মানবজাতির কত আনন্দ, কত উৎসব, কত সম্ভাবনা গ্রাস করিয়া লয়। কিন্তু যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়াও বিশ্বকাপ পুনরায় ফিরিয়া আসিয়াছে মানুষের মিলনের প্রতীক হইয়া। বিশ্বকাপ কেন বিশ্বের সর্ববৃহৎ ক্রীড়া আয়োজন, তাহার উত্তর সংখ্যাতেই লুক্কায়িত। একটি বিশ্বকাপের ফাইনাল একশত কোটিরও অধিক মানুষ প্রত্যক্ষ করেন। অর্থনৈতিক দিক দিয়াও ইহা এক মহাশক্তি। আয়োজক দেশগুলির অবকাঠামো, সম্প্রচারস্বত্ব, পৃষ্ঠপোষকতা এবং পর্যটন খাতকে কেন্দ্র করিয়া বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কর্মক্স সৃষ্টি হয়।

কিন্তু বিশ্বকাপের প্রকৃত শক্তি অর্থে নহে, আবেগে। বাংলাদেশ তাহার এক বিশেষ উদাহরণ। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের জাতীয় দল কখনো বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলিতে পারে নাই, অদূর ভবিষ্যতে খেলিবার সম্ভাবনাও খুব ক্ষীণ। তথাপি বিশ্বকাপ আসিলেই বাংলাদেশ যেন এক অভিনব উৎসবের দেশে পরিণত হয়। এককালে আবাহনী-মোহামেডান-ব্রাদার্স ইউনিয়নকে কেন্দ্র করিয়া যেইরূপ উন্মাদনা দেখা যাইত, আজ তাহা অনেকাংশে অতীত। কিন্তু বিশ্বকাপ আসিলেই সেই সুপ্ত আবেগ পুনর্জাগরিত হয়। বিশেষত ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের আবেগ কখনো কখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, মনে হয় দক্ষিণ আমেরিকার দুই দেশ যেন এই ভূমিতেই অবস্থিত। পতাকা উড়ে, জার্সি বিক্রি হয়, রাত জাগিয়া খেলা দেখা হয়, বন্ধুদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক চলে। এমনকি বিশ্বকাপ চলাকালে দেশে চুরি-ডাকাতিও তুলনামূলক কমিয়া যায়। বলা যায়, বিশ্বকাপ মানুষের মনোযোগকে এক অভিন্ন আনন্দের কেন্দ্রে আবদ্ধ করিতে সক্ষম হয়।

যদিও বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং সীমান্তসংকট মানবসমাজকে ক্রমশ বিভক্ত করিতেছে। এমন এক সময়ে বিশ্বকাপের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়। কারণ ইহা দেখাইয়া দেয়, মানুষ এখনও একটি অভিন্ন গল্প ভাগ করিতে চাহে-এখনও লক্ষ লক্ষ মানুষ একটি গোলের আনন্দে একযোগে চিৎকার করিতে পারে, এখনও কোনো ক্ষুদ্র দেশের অপ্রত্যাশিত সাফল্যে সারা বিশ্ব বিস্মিত হইয়া হাততালি দেয়। নিশ্চয়ই বিশ্বকাপ বিতর্কমুক্ত নহে। বাণিজ্যিকীকরণ, রাজনীতি, আয়োজক নির্বাচন, টিকিটের মূল্য-বিভিন্ন প্রশ্ন উঠিয়াছে এবং উঠিবেও। কিন্তু সমস্ত বিতর্কের ঊর্ধ্বে একটি সত্য অটুট রহিয়াছে: বিশ্বকাপ এখনও মানবজাতির অন্যতম বৃহৎ মিলনমেলা।

গত রাত্রি হইতে আবারও শুরু হইল সেই যাত্রা। কোটি কোটি মানুষ একখানি বলের গতিপথ অনুসরণ করিবে। কেউ ব্রাজিলের জন্য প্রার্থনা করিবে, কেউ আর্জেন্টিনার জন্য, কেউ বা অন্য কোনো দেশের জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হউক যেই, প্রকৃত জয় হইবে মানবিক সংযোগের। কারণ বিভক্ত পৃথিবীতে এখনও এমন কিছু মুহূর্ত প্রয়োজন, যখন মানুষ নিজেকে কেবল কোনো দেশের নাগরিক বলিয়া নহে, বরং এক বৃহত্তর মানবসমাজের অংশ বলিয়া অনুভব করিতে পারে। বিশ্বকাপ সেই বিরল অনুভূতিরই নাম।

ইত্তেফাক/এএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন