নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড
প্রকাশ : ১১ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৩১
নাম তাহার বিশ্বজিত্ দাস। ২৫ বত্সরের একজন টগবগে যুবক। এই জীবনে তাহার কত আশা ছিল, স্বপ্ন ছিল। কিন্তু সর্বনাশা সংঘাতের রাজনীতি তাহার সবকিছুই কাড়িয়া নিয়াছে। পিতা আনন্দ দাস ও মা কল্পনা রাণী ঘোষ হারাইয়াছেন তাহাদের ছোট সন্তান ও আদরের ধনকে। আজ কয়েকদনি ধরিয়া পথে-ঘাটে, চায়ের দোকান ও আলোচনার টেবিলে তথা বাংলাদেশের সর্বত্র শোনা যাইতেছে একই নাম-বিশ্বজিত্ দাস। এমনকি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও উচ্চারিত হইতেছে এই নাম। টিভিগুলি দেখাইতেছে তাহার ভিডিও ফুটেজ। সেই সঙ্গে আতঙ্কভরা ঘৃণা ও ধিক্কারে ভরিয়া যাইতেছে দর্শক ও পাঠকদের মন। আর বিশ্বজিতের ঢাকার আবাসস্থল লক্ষ্মীবাজার ও জন্মভূমি শরীয়তপুরের মশুরা গ্রামে চলিতেছে শোকের মাতম ও আহাজারি।
কী অপরাধ ছিল বিশ্বজিতের? তাহার কোন রাজনৈতিক দলের সহিত সম্পৃক্ততা ছিল না। একজন খেটেখাওয়া মানুষ ও সাধারণ দর্জি বিশ্বজিত্। এই পেশাগত পরিচয়টাই ছিল তাহার কাছে মুখ্য। সবার কাছে ভদ্র ও নম্র প্রকৃতির ছেলে বলিয়া যাহার আলাদা একটি পরিচিতি ছিল। কিন্তু গত রবিবার ১৮ দলীয় জোটের ডাকা অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে লক্ষ্মীবাজারস্থ বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের সংঘর্ষের মাঝে পড়িয়া যান নিরীহ পথচারি বিশ্বজিত্। ঐ সময় তাহার সম্মুখেই ঘটে বোমা বিস্ফোরণ। তিনি প্রাণে বাঁচিতে দৌড়াইয়া পার্শ্ববর্তী একটি দোতলা ভবনে অবস্থিত ডেন্টাল ক্লিনিকে আশ্রয় নেন। কিন্তু ছাত্রদলের কর্মী ভাবিয়া ছাত্রলীগ তাহাকে ধাওয়া করে এবং সেই ক্লিনিক হইতে ধরিয়া আনিয়া চাপাতি দিয়া কুপাইয়া ও রড দিয়া পিটাইয়া মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রকাশ্য রাজপথে হত্যা করে। নিজের ধর্ম ও পেশার পরিচয় দিয়া প্রাণরক্ষার জন্য অনেক আকুতি-মিনতি করিলেও পাষণ্ড ও দুর্বৃত্তদের হূদয় তাহাতে বিন্দুমাত্র গলে নাই। বরং হত্যাকাণ্ডকে তাহারা রীতিমত উত্সব হিসাবে গ্রহণ করে। সন্ত্রাসীদের ভয়ের কারণে তাহাকে রক্ষার কথা হয়তো উপস্থিত কোন হূদয়বান মানুষও ভাবিতে পারেন নাই। কিন্তু মাত্র ১০-১৫ গজ দূরে অন্তত ৩০ পুলিশ সদস্য ছিলেন এবং তাহারা কী করিতেছিলেন? এমন একটি নির্মম ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধে তাহারা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হন। ইহা তাহাদের চরম দায়িত্বহীনতারই বহিঃপ্রকাশ।
যাহারা প্রকাশ্য দিবালোকে বিশ্বজিত্ দাসকে নিষ্ঠুর সীমারের ন্যায় হত্যা করিয়াছে, তাহাদের লাইভ অ্যাকশন দেশের সবগুলি টিভি-চ্যানেলে প্রচারিত হইয়াছে এবং সবগুলি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছে সেই হূদয়স্পর্শী দৃশ্যের ছবি। ইতোমধ্যে গণমাধ্যমের কল্যাণে তাহাদের নাম-পরিচয়-ঠিকানাও জানা গিয়াছে। কিন্তু দুঃখজনক হইল, তাহার পরও প্রশাসন দুর্বৃত্তদের পাকড়াও করিতে গড়িমসি করিতেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই ঘটনায় আটজন গ্রেফতারের কথা বলিলেও খোদ পুলিশ বাহিনী তাহা অস্বীকার করার ঘটনাও ঘটিয়াছে। ইহাছাড়া সরকারের দায়িত্বশীল একজন প্রতিমন্ত্রী বলিয়াছেন ইহা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এই লুকোচুরি মোটেও প্রত্যাশিত নহে। উল্লেখ্য, ‘কসাইদের’ কোপ খাইতে চান না বলিয়া বিশ্বজিতের বাবা কোন মামলা করেন নাই। পুলিশ নিজেই বাদি হইয়া একটি মামলা করিয়াছে। দেশের পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে পৌঁছাইয়াছে, ইহাতেই সম্যক উপলব্ধি করা যায়।
প্রকাশ্য রাজপথে রাজনৈতিক কর্মসূচি চলাকালে পিটাইয়া হত্যার দৃষ্টান্ত আমাদের ইহাই প্রথম নহে। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টন মোড়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে পিটাইয়া হত্যার স্মৃতি আমরা আজও ভুলিতে পারি নাই। এই হত্যাকাণ্ডের হাত ধরিয়া আসে ওয়ান ইলেভেন। সুতরাং বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডের পর দেশের সর্বসাধারণের মধ্যে নানামাত্রিক আলোচনা ও বিশ্লেষণ চলিতেছে। ইতোমধ্যে ছাত্রলীগ বিশ্বজিত্ হত্যার সহিত জড়িত নয় বলিয়া বিবৃতি দিয়াছে। তৃতীয় বিশ্বে এ ধরনের লোমহর্ষক ঘটনা অহরহই ঘটিতেছে। ইহা জানিয়াও আমরা আশা রাখি, এই ঘটনার চাক্ষুষ ও অকাট্য প্রমাণ যখন আমাদের হাতে আছে, তখন এই হত্যাকাণ্ডের সমুচিত্ বিচার হইবে। গতকাল আদালত ২৪ ঘন্টার মধ্যে আসামীদের গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়াছেন। এই নির্দেশ যথাযথ পালন করা হইবে বলিয়া সকলে প্রত্যাশা করেন।