[ রা জ নী তি ]
গণতন্ত্রের বিশ্বজিত্ শ্মশানে
কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান
প্রকাশ : ১১ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৫৮
সারাদেশে অবরোধ, আগের দিন থেকেই শুনশান নীরবতা, চারদিকে ভয়। গণতন্ত্রের উনুনের উত্তপ্ত আগুনের ভয়। এই ভয় সবাইকেই পেয়ে বসেছে। বিশ্বজিত্ ভয় পায়নি। সে ভীত নয়। সে নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছে। সাধারণ একজন দর্জি। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের আগুনের উত্তাপ সে বুঝতে পারেনি। আজও তার বের হতে হবে। বের হলেন কিন্তু লাশ হলেন। এটি স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, এটি রাজপথের মৃত্যু। বিশ্বজিত্ রাজপথে জীবন দেয়নি। গণতন্ত্রের প্রহরীরা গণতন্ত্র রক্ষার জন্য একজন দর্জির জীবন কেড়ে নিয়েছে। বিশ্বজিত গণতন্ত্র রক্ষার জন্য, দর্জিদের অধিকারের জন্য, দেশের নাগরিক হিসেবে দারিদ্র্যতা মোচনের জন্য, বাবার চিকিত্সা করতে টাকার জন্য সে রাজপথে আসেনি। বিশ্বজিত রাজপথে এসেছিল তার রুটি-রুজির ব্যবস্থা করতে। বিশ্বজিেক আর রাজপথে আসতে হবে না। গণতন্ত্রের যমদূতেরা তার খোঁজ পেয়েছে। ছাত্র নামের যমদূতদের হাতে চাপাতি, রড। বিশ্বজিত্ রক্তাক্ত। সারা শরীর বেয়ে রক্ত ঝরছে। গায়ের শার্টটি রক্তে লাল হয়ে গেছে। এ তো গণতন্ত্রের রক্তের হুলিখেলা। এই হুলিখেলায় বিশ্বজিত্ লাশ। বিশ্বজিত্ আর রাজপথে বেরুবে না। নিশ্চুপ। নিস্তব্ধ। নিথর। সে বেঁচে গেছে বাংলাদেশের ভয়ঙ্কর গণতন্ত্রের হাত থেকে। বিশ্বজিত্ শ্মশানে। তার বাবা কাঁদছে। মা বিশ্বজিেক খোঁজছে। বিশ্বজিতের লাশে গণতন্ত্রের গন্ধ শুকছে তার মা। এই তো সেদিন কত আমেজ করে কত আনন্দ করে বিশ্বজিতের মা-বাবা গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে ভোট দিতে গেলেন। এ তো সেদিন। এ তো তাদের স্বপ্নের চার বছর হয়ে গেলো। স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেলে। ভোটের বিনিময়ে বিশ্বজিতের মা ছেলের লাশ পেল। তিনি হয়তো শপথ নিবেন। আবারো এই গণতন্ত্রকে রক্ষার শপথ। যে গণতন্ত্রে তার সন্তান কোনো অপরাধ না করেই রক্তাক্ত হয়। বিশ্বজিতের বাবা আবার ভোট দিতে যাবেন এই গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে। যে গণতন্ত্র বিনামূল্যে তার চিকিত্সার ব্যবস্থা না করেই তার ছেলেকে লাশ বানিয়ে ফেরত দিয়েছে। বিশ্বজিত্ বাবাকে কথা দিয়েছিল সে তাকে ঢাকায় নিয়ে চিকিত্সা করাবে। বৃদ্ধ বাবাকে সুস্থ করে তুলবে। এখন সেই বৃদ্ধ বাবা সেই সন্তানের লাশ নিয়ে শ্মশানে গেছেন। বিশ্বজিতের দেহ পুড়ছে। গ্রামের মানুষ সে পোড়া দেখছেন আর কাঁদছেন। কিন্তু বিশ্বজিতের বাবা শ্মশান থেকে গণতন্ত্র পোড়ার গন্ধ পাচ্ছেন। অগ্নিদগ্ধ বিশ্বজিত্ বিনয়ের সাথে বাবাকে বলছে-বাবা! আমি লাশ নই। আমি বাংলাদেশের গণতন্ত্র। এই লাশে তুমি গণতন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছো। শুকে দেখ। গণতন্ত্রের গন্ধ। গণতন্ত্র পোড়ার গন্ধ। বাবা আমি অত পড়ালেখা শিখিনি। তাই বাংলাদেশের এই ভয়ঙ্কর গণতন্ত্রের গন্ধ অনুভব করতে পারিনি। যারা বেশি লেখাপড়া করেছে, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে তারা বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে বুঝতে পেরেছে। তাই এই গণতন্ত্রকে রক্ষার জন্য বাবা তারা আমায় কুপিয়েছে। বাবা তোমরা ভোট দিতে যেও।
আবার ২০১৪ সালকে মনে করো। সেদিন তুমি আর মা মিলে রিকশায় করে গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে যেও। হয়তো বাবা তোমাদের সেই ভোটের বিনিময়ে নতুন সরকার আসবে, আসবে নতুন কোনো লাশের সংবাদ। নতুন কোনো ছাত্র সংগঠনের ছেলেরা নতুন কোনো বাবাকে অন্য কোনো বিশ্বজিতের লাশ উপহার দিবে। বাবা আমরা গণতন্ত্রে ভোট দেই একদিন। আর গণতন্ত্রের প্রহরীরা আমাদেরকে খুন করে প্রতিদিন। বাবা চোখের জল মোছে ফেলো। এটাতো আমাদের ভাগ্য। ১৬ ডিসেম্বরের মাত্র পাঁচ দিন আগে তুমি বিশ্বজিতের লাশ পেয়েছ। ছোট বোনটিকে কাঁদতে বারণ কর। ওকে বোঝাও এটা গণতন্ত্রের শ্মশান। এই শ্মশানে হিন্দু মুসলমান ভাই ভাই। আমার আদরের বোনটিকে বলো আগামী নির্বাচনে যেন আর কারো নামে শ্লোগান না দেয়। বাবা আমি নূর হোসেনকে দেখতে পাচ্ছি। সে বিকৃত করেছে সেই শ্লোগানটি। নৈরাজ্যের গণতন্ত্র নিপাত যাক, মানুষ মুক্তি পাক। যে গণতন্ত্রে বাবাকে চিকিত্সা করাতে পারে না, যে গণতন্ত্রে বোনের স্বপ্ন পূরণ করতে পারে না, যে গণতন্ত্রে আমি রাস্তায় বেরোতে পারি না, বাবা তোমরা সেই গণতন্ত্রের জন্য ভোট দাও। বাবা আমি পুনর্জন্মে ফিরে আসব। অন্য কোনো দেশে। যে দেশের গণতন্ত্রের প্রহরীরা এভাবে কাউকে খুন করবে না। রোহিঙ্গাদের নিয়ে লিখেছি, রামু নিয়ে লিখেছি। পোশাক শ্রমিকদের পোড়া গন্ধ নিয়ে লিখেছি। কত পোড়ার খবর লিখব। এখন লিখতে হলো বিশ্বজিতের পোড়ার খবর। রোহিঙ্গারা সাগরে কেঁদেছে। বৌদ্ধরা রামুতে কেঁদেছে। দরিদ্র নারীরা নিশ্চিন্তপুরে কেঁদেছে। অতঃপর কেঁদেছে বিশ্বজিতের বাবা-মা। এখন সারা দেশ কাঁদে। বিশ্বজিতদের জন্য। পোশাক শ্রমিকদের জন্য। বাংলাদেশের গণতন্ত্রে মানুষের কান্না থামে না। সেই ঔপনিবেশিক শাসন থেকে শুরু করেছি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই। অথচ এখনো শাসনের মধ্যে ঔপনিবেশিক অত্যাচারের গন্ধ। এ কী বিজয়! এ কী স্বাধীনতা!
গ্রিক সফিস্ট সক্রেটিসের সভার একটি গল্প মনে পড়লো। সক্রেটিসের সভায় আইন, ন্যায় ও সংখ্যাগুরুর শাসন নিয়ে বিতর্ক হচ্ছিল। আড়াই হাজার বছর আগের গল্প। সক্রেটিসের শিস্যদের এক পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রোটাগোরাস, অন্যপক্ষে থ্রেসিমেকাস। প্রোটাগোরাস শাসকদের আইন ও ন্যায়কে সমর্থন করছেন। অন্যদিকে থ্রেসিমেকাস তার বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। থ্রেসিমেকাস আইনকে শাসকদের স্বার্থ রক্ষার উপায় হিসেবে আখ্যায়িত করতে চান। ন্যায় তার কাছে শাসকের স্বার্থ রক্ষার চিত্র। নাগরিকরা যেন সেই চিত্রকেই কল্পনা করে সেই জন্যও শাসকগণ সামাজিকীকরণের ব্যবস্থা করেন। এভাবে আইন ও ন্যায় চূড়ান্তভাবে শাসকের শেখানো আইন ও ন্যায়ে পরিণত হয়। যার মধ্যে শুধু তার স্বার্থটাই থাকে। নৈরাজ্য সৃষ্টিতে সহায়তা করার অভিযোগে কোনো বড় দলের মহাসচিবকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার করা যায়; কিন্তু রাজপথে প্রত্যক্ষভাবে খুন করার অপরাধে শাসকদের সমর্থকদের গ্রেফতার করা যায় না। হায়রে আইন, হায়রে ন্যায়, চমত্কার গণতন্ত্র! এসব দীর্ঘশ্বাসের কারণ খুঁজতে হলে আড়াই হাজার বছর আগের সেই বিতর্কেই আবার যেতে হবে। আইন, ন্যায়, গণতন্ত্র—এসবই শাসকের জন্য। শাসিতের জন্য রাজপথের খুন।
রাত ১০-৩০ মিনিট। শ্মশান অন্ধকার হয়ে গেছে। বিশ্বজিতের বাবা তার আদরের ছোট ছেলেটি খুঁজছেন। শ্মশানে খুঁজছেন। বিশাল ছাই স্তূপ। উপরে ধোঁয়া। শ্মশানের আকাশ ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে। বিশ্বজিতের বাবা ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে দেখেন এই ধোঁয়া এতো বিস্তৃত যে, তা বাংলাদেশের সমস্ত আকাশ জুড়ে। ঢেকে দিয়েছে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের আকাশ। বাংলাদেশের গণতন্ত্র ধুয়াশায়, অন্ধকারে। বিশ্বজিত্ কি পুনর্জন্মে আবার আসবে এই জীবনানন্দের দেশে মানুষ হয়ে। না। বিশ্বজিত্ আসবে শঙ্খচিল হয়ে। তখন তাকে রাজপথে আর কেউ পাবে না। দর্জির কাজ আর তাকে করতে হবে না। অসুস্থ বাবাকে চিকিত্সা করার দায় নিতে হবে না। অবুঝ মাকে স্বপ্ন দেখাতে হবে না। আদরের বোনকে খেলনা কিনে দিতে হবে না। এসব স্বপ্ন পূরণের জন্য গণতন্ত্রের রাজপথে বেরুতে হবে না। বিশ্বজিেদর লাশের মিছিল আর শেষ হয় না। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে গণতন্ত্রের এ দেশে। বিশ্বজিতের বাবাকে বলতে চাই, বাবা, বিশ্বজিত্ পোড়েনি, পুড়েছে বাংলাদেশের গণতন্ত্র।
লেখক : শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Email: kazipoliticalscience@gmail.com