[ সা ম্প্র তি ক ]
দেশের সুনাম রক্ষায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
প্রকাশ : ১২ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:১৪
স্বাধীনতার ৪১ বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে অনেক অর্জন বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, সন্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে দেশবাসীকে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে, মানবিক সম্পদ সৃষ্টিতে, মহিলাদের ক্ষমতায়নে, দারিদ্র্য বিমোচনে, জীবন যাত্রার আধুনিকায়নে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উত্কর্ষ সাধন অন্যতম অগ্রগতির নির্দেশিকা হিসাবে প্রশংসিত হয়েছে বিশ্বের দরবারে। বিশ্বের পঞ্চম উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসাবে বাংলাদেশ অনেক দেশের বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। তবে দেশের বিভিন্ন স্তরের জনগণের প্রত্যাশা ছিলো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বিজয়ী এই স্বাধীন জাতির পক্ষে একটি উন্নত জাতি হিসাবে প্রতিভাত হওয়া এই স্বল্প সময়ের মধ্যে মোটেই অসম্ভব ছিলো না। প্রত্যাশা পূরণ হয়নি এখনো। এ কথা সত্য যে অনেক ক্ষেত্রে সকল আশা বাস্তবতায় রূপলাভ করতে পারে না নানাবিধ কারণে, যার মধ্যে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাব ও নেতৃত্বের সঙ্কট, সুশাসনের অভাব, অভ্যন্তরীণ সম্পদের অসম বণ্ঠন, উন্নয়ন পরিকল্পনায় দুর্বলতা ও বাস্তবায়নে দুর্বৃত্তায়ন হচ্ছে অন্যতম। শত প্রতিবন্ধকতার মাঝেও সাফল্যের তালিকা অনেক দীর্ঘ। তবে যে বিষয়টি সাম্প্রতিককালে বিশ্ববাসীকে চমক দিতে পেরেছে তা হচ্ছে বৈদেশিক বাণিজ্যে, বিশেষ করে রপ্তানি বাণিজ্যে অভাবনীয় অগ্রগতি। এক্ষেত্রে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পণ্যের তুলনায় অপ্রচলিত পণ্য রপ্তানিতে উত্কর্ষ সাধিত হয়েছে ব্যাপকভাবে। যারমধ্যে তৈরি পোশাক শিল্প এবং ওষুধ শিল্পের প্রসার ও রপ্তানি বাণিজ্যে উদ্যোক্তাদের পরাকাষ্ঠা সত্যিই প্রশংসনীয় । তৈরি পোশাক শিল্পে বাংলাদেশ বর্তমান বিশ্বে অত্যন্ত শক্তিধর একটি দেশ। রপ্তানি বাণিজ্যে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় শক্তি হিসাবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গণচীনের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। প্রায় ৫ হাজার একশ’ পঞ্চাশটি তৈরি পোশাক কারখানা আছে যারা নিরবচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন দেশের ক্রেতাদের চাহিদার জোগান দিচ্ছে। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারী ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এর তথ্য অনুসারে প্রায় ৩৫ লক্ষ শ্রমিক এ কাজে নিয়োজিত আছে। অনেকে মনে করেন এ সংখ্যা প্রায় ৫০ লক্ষ, যার মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ মহিলা শ্রমিক। বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের প্রায় ৭৬ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে। উত্তর আমেরিকা, ইউরোপসহ প্রায় ৩০টি দেশের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক একচ্ছত্র আধিপত্য বিরাজ করে আছে।
বিশ্বের প্রধান প্রধান তৈরি পোশাক সরবরাহকারী ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান যেমন: ওয়ালমার্ট, এডিডাস, মার্কস এন্ড স্পেন্সর, গ্যাপ, কেলভিন ক্লিন, এইচ এন্ড এম, জারা ইত্যাদি বিশ্বব্যাপী খুচরা বিক্রেতা বৃহত্ পুঁজির ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানসমূহ বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানী করে থাকে। অনেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন বায়িং হাউসের মাধ্যমে পোশাক প্রস্তুতকারীদের সাথে যোগাযোগ করে ক্রয় আদেশ দেয় আবার অনেকে নিজেরাই অফিস খুলে বসেছে ঢাকায় কারণ, বেশিরভাগ কারখানা প্রায় ৭৫% ঢাকার আসেপাশে অবস্থান করছে।
একটি হিসাবে দেখা যায় যে ২০১১ সালে এ খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন হয়েছে প্রায় ইউ এস ডলার ২২.৯২ বিলিয়ন, যা হচ্ছে তার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪৩ শতাংশ বেশি। এর মূল কারণ হচ্ছে ইউরেপিয়ান ইউনিয়ন জি এস পি অনুসারে রুলস এব অরিজিন সহজ করেছে এবং ভারত, গণচীন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং মালয়েশিয়া ট্রেড প্রেফারেন্স বা বাণিজ্যে সুবিধাভোগী দেশ হিসাবে বাংলাদেশকে চিহ্নিত করেছে। অনেকের ধারণা আগামী ২০২১ সালে তৈরি পোশাক খাত থেকে বাংলাদেশের বৈদেশিক আয় প্রায় ৪২.০০ বিলিয়ন আমেরিকান ডলার হতে পারে। রাশিয়া, ইউক্রেনসহ বিশ্বের নতুন নতুন দেশে বাংলাদেশের শিল্প উদ্যোক্তারা বাজারজাত করার সুযোগ লাভে সফল হয়েছে। এক অফুরন্ত সম্ভাবনার দুয়ার খুঁজে পেতে সরকারি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয় হয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা একাজে উদ্যোক্তারা সাফল্যের স্বাক্ষর রাখবে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে মাত্র কয়েকদিন আগে ২৪ নভেম্বর, ২০১২ ঢাকার অদূরে আশুলিয়ায় নিশ্চিন্তপুরে অবস্থিত তাজরিন ফ্যাশান লিঃ এর অগ্নিকাণ্ড হয়েছে এবং জীবন্ত দগ্ধ হয়েছে প্রায় ১১৩ জন কর্মী। এ জাতীয় দুর্ঘটনা জাতির বিবেককে দারুণভাবে নাড়া দিয়েছে। সরকার একদিন রাষ্ট্রীয় শোক দিবস পালন করেছে। প্রধানমন্ত্রী নিহত পরিবারদেরকে অনুদান দিয়েছেন। বিজিএমইএ সাহায্যের হাত প্রসারিত করেছে। তবে তাদের ভাষায় এর মধ্যে দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারীদের কালো হাত থাকতে পারে। শোনা যায়, আগুনের পর প্রতিষ্ঠানের মালিককে খুঁজে পাওয়া যায়নি। শ্রমিকেরা রাস্তাঘাট বন্ধ করে সহিংস বিক্ষোভ করেছে। সমগ্র দেশে তৈরি পোশাক শিল্পে একটি অশুভ প্রতিক্রিয়া দেশের জনগণ ও সরকার লক্ষ্য করেছে। এ জাতীয় দুর্ঘটনা নানাভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবেশিত হয়েছে, যা বাংলাদেশের সুনামকে বিনষ্ট করতে অনেক ভূমিকা রেখেছে। অথচ এ জাতীয় অপবাদ বা সুনাম বিনষ্ট হওয়ার কোন সঙ্গত কারণ নেই। এ জাতীয় সঙ্কট থেকে উত্তরণে প্রয়োজন হচ্ছে সমন্বিত উদ্যোগ, সরকার ও উদ্যোক্তা এবং বিনিয়োগকারীদের সদিচ্ছা। এই বিশাল সম্ভবনাময় তৈরি পোশাক শিল্পের সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য, শ্রমিক মালিক ও নিয়ন্ত্রণকারী সরকারি কর্তৃপক্ষের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির অবসানকল্পে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে পরিচ্ছন্নভাবে দায়-দায়িত্ব নির্ধারণের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি উত্তম নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজন আছে বলে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন।
সরকার বিভিন্ন খাতে নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন। কর্মকাণ্ডের সুষ্ঠু সমন্বয় এর স্বার্থে সরকার বিভিন্ন খাতের জন্য নীতিমালা ও কৌশলপত্র প্রণয়ন করছেন, প্রচলিত আইনের সংশোধন করছেন। এ ক্ষেত্রেও একটি কৌশলপত্র বা নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজন আছে বলে অনেকেই মনে করেন। প্রয়োজনে বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ-এর সাথে আলোচনা করে একটি উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন কমিশন গঠন করা যেতে পারে যারা এখাতকে আরো অধিক অর্থবহ করার পথে দিক-নির্দেশনা দিতে পারবে। বর্তমানে এ শিল্পের সাথে জড়িয়ে আছে সরকারের বিভিন্ন বিভাগ, দপ্তর ও কর্তৃপক্ষ। তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন, কখনো শিল্প মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিদ্যুত্ বিভাগ, জনশক্তি বিভাগ, শিল্প-কারখানা দপ্তর, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, বন্দর কর্তৃপক্ষ, আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রক, বিজিএমইএ, এমনি প্রায় ১৫টি দপ্তরের অনুমতি, সহযোগিতা নিতে হচ্ছে তাদেকে। দিনের পর দিন দুয়ারে দুয়ারে ধর্না দিতে হচ্ছে।
আগামী ২০২১ সালে এখাত কিভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অমূল্য অবদান রাখবে সে পথের দিক-নির্দেশনা দিতে হবে। সরকারি দপ্তরসমূহ বেসরকারি খাতকে সহযোগিতা করবে এবং তাদের চলার পথকে সুগম করতে পারে এমন একটি সমন্বিত পরিকল্পনা দেশের সুনাম রক্ষার স্বার্থে উদ্ভাবন করতে হবে। সকল রাজনৈতিক দলকে ঘোষণা করতে হবে তাদের মেনিফেস্টোতে, কিভাবে এ বিশাল অর্থকরী খাতকে তারা পথ দেখাবে, কিভাবে সরকার সহযোগিতা করবে এ শিল্পে নিয়োজিত উদ্যোক্তাদেরকে। ট্রেড ইউনিয়ন করার অনুমতি দেয়া হবে কিনা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্তের সময় এসেছে। তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদেরকে শুধু পুলিশ বাহিনীর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার দিনের অবসান হয়েছে, একথা মনে রাখতে হবে। দেশি-বিদেশি চক্র বাংলাদেশের শিল্পকে ক্ষতি করার চেষ্টা করছে এমন অভিমত প্রদান করে দায়-দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ আর নেই। সুনাম রক্ষার স্বার্থে এ জাতীয় অভিযোগ ও উত্থাপন করা সঠিক নয়।
স্বাধীনতার এই মাসে দেশবাসীর প্রত্যাশা হচ্ছে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে মধ্য আয়ের দেশ হিসাবে বাংলাদেশ নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবে। একটি দারিদ্র্যমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত দেশ হিসাবে বিশ্বের মাঝে প্রতিভাত হবে। স্বাধীনতার চেতনা ও প্রত্যাশাকে ফলপ্রসূ করবে এবং শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দিবে না। এজন্য প্রয়োজন প্রশাসনিক উত্কর্ষ সাধন, দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস, জাতির বৃহত্তর কল্যাণে ব্যক্তিস্বার্থকে বিসর্জন দেয়ার মানসিকতা। রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদেরকে দেশের প্রয়োজনে আত্মত্যাগ করতে হবে। ক্ষমতায় টিকে থাকা বড় কথা নয়, জনকল্যাণে ও রাষ্ট্রীয় অগ্রগতিতে অবদান রাখাই হচ্ছে বড় প্রাপ্তি, ইতিহাসে স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকার অপূর্ব সুযোগ। ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনে দলীয় সংকীর্ণতাকে বিসর্জন দেয়ার বড় মনের মানসিকতা দেশের সুনাম রক্ষায় অভাবনীয় সুযোগ উন্মুক্ত করতে পারে। বিশ্বের দুয়ারে বাংলাদেশকে উন্নত জাতি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার অনেক সুযোগ উন্মুক্ত করাসহ সৃষ্টিশীল গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাপক পরিচিত লাভে সক্ষম হতে পারে। দেশের মধ্যে বিভিন্ন মত ও পথের অনুসারী থাকবে, সকলের প্রতি সমান মানসিকতা প্রদর্শনের অপর নাম জাতীয় নেতৃত্ব। এলক্ষ্যে অবদান রাখতে না পারলে স্বাধীনতার চেতনা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হতে পারে।
লেখক : সাবেক সচিব