আশুলিয়া ট্র্যাজেডি :তদন্ত কমিটির রিপোর্ট

তৈরি পোশাক শিল্প তাজরিন ফ্যাশন্স লিমিটেডে অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক শ্রমিকের প্রাণহানির মাত্র পনের দিনের মাথায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি মালিকের অবহেলাকেই দায়ী করিয়া তাহার বিরুদ্ধে ফৌজদারী আদালতে মামলা দায়েরের সুপারিশ করিয়াছে। ঘটনাটিকে পূর্বপরিকল্পিত নাশকতা সাব্যস্ত করিয়া তাহার পিছনের চক্রকে শনাক্ত করিতে অধিকতর অনুসন্ধানেরও প্রস্তাব করিয়াছে। পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’ও অগ্নিকাণ্ডের পিছনে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের সুনাম নষ্ট করিবার চক্রান্ত বলিয়া মন্তব্য করিয়াছে। তদন্ত প্রতিবেদনটিতে পোশাক শিল্প কারখানাগুলির অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি অবতরণের সিঁড়ি ইত্যাদির ব্যবস্থা তদারকি করিতে স্বরাষ্ট্র ও শ্রম মন্ত্রণালয় এবং ফায়ার সার্ভিসের সদস্য লইয়া একটি কমিটি গঠনেরও সুপারিশ করা হইয়াছে। এদিকে, অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা রোধে পোশাক কারখানায় কাজের পরিবেশ উন্নত করিতে বিজিএমইএ সময় বাধিয়া দিয়াছে এবং মধ্য-পর্যায়ের শ্রমিকদের অগ্নিপ্রতিরোধে প্রশিক্ষণের আয়োজন করিতেছে। আমরা বলিব, নাশকতা বা ষড়যন্ত্র সমূলে উত্পাটন করিতে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। কারণ নাশকতা বা নিরাপত্তা ঝুঁকি হইতে শ্রমিকদের জীবন রক্ষায় ব্যর্থতার দায় পোশাক শিল্পের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, সরকার এবং বহুলাংশে বিদেশি ক্রেতা কোম্পানিগুলির উপরেও বর্তায়। এই শিল্প খাতে অগ্নিকাণ্ডে ২০০৫ সাল হইতে আজ পর্যন্ত অন্তত ৭০০ শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনা সামান্য উদ্বেগের বুঁদবুঁদ তুলিয়াই মিলাইয়া গিয়াছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০১১ সালের মানবাধিকার রিপোর্টে বলা হয়, ‘বাংলাদেশে শিল্প কারখানায় নিরাপত্তা পরিদর্শনে সারা দেশের জন্য নিয়োজিত আছেন মাত্র ৫০ জন। আর এইসব নিরাপত্তা পরিদর্শকের বিরুদ্ধে সীমাহীন দুর্নীতি, দায়িত্বে অবহেলা আর অযোগ্যতার অভিযোগও আছে। বলা যায়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি এবং কারখানাসমূহে যথাযথ প্রস্তুতি ও সতর্কতার অভাবে তাজরিন গার্মেন্টসের ভয়াবহতা রোধ করা যায় নাই। কারখানাটিতে কোনো ফায়ার এসকেপ না থাকায় শত শত শ্রমিক সিঁড়ি দিয়া বাহির হইবার চেষ্টা করে। কিন্তু মূল ফটক তালাবদ্ধ থাকায় তাহারা কারখানার ভিতরেই আটকাইয়া প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরিয়া আগুনে পুড়িয়া কয়লা হইয়া যায়। ফায়ার ব্রিগেড ১১১ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করিয়াছে বলিয়া দাবি করে, যাহার মধ্যে ৫৪ জনের লাশ শনাক্ত করাই সম্ভব হয় নাই। তাজরিন ফ্যাশন্স-এ আগুন নিভাইতে ১২ ঘণ্টার বেশি সময় লাগিল কেন এবং আগুন লাগিবার পরে সিঁড়ির গেট কেন লাগাইয়া দেওয়া হইল তাহাও অনুসন্ধানের বিষয়। অগ্নি-দুর্ঘটনা মোকাবিলায় তাজরিন ফ্যাশনের দক্ষতার প্রশংসা করিয়া ইতোপূর্বে বিজিএমইএ সার্টিফিকেটও দিয়াছে। এতবড় দুঘর্টনার পরে তত্ক্ষণাত্ ফার্স্ট এইড ক্লিনিক খুলিতে না পারা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যর্থতার চিত্রই তুলিয়া ধরে। বিশ্ববাজার ধরিয়া রাখা যেমন জরুরি, তেমনই প্রয়োজন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও নিরাপত্তা দান। এই ক্ষেত্রে শ্রমিক, তাহাদের ট্রেড ইউনিয়ন এবং কারখানা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত দায়িত্বশীল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়-দায়িত্বও নেহায়েত্ কম নহে। তাহাদের সচেতন হইতে হইবে, কর্তব্যকর্মে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হইবে। বাংলাদেশে এখন গার্মেন্টস কারখানার সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার, পোশাক রপ্তানি হইতে আয় প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলার, আর শ্রমিক কাজ করিতেছে ৩৬ লক্ষ, যাহার মধ্যে ৮০ ভাগই নারী। তাহাদের সংখ্যা বাড়িতেছে, আর তাহাদের শ্রম-ঘামের সলতেই জ্বালাইয়া রাখিয়াছে বাংলাদেশের মধ্যম আয়ের দেশ হইয়া উঠিবার স্বপ্ন।