সাম্প্রতিক সাংঘর্ষিক রাজনীতি, জনজীবনে দুর্গতি ও ভীতি
প্রকাশ : ১৪ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৩৯
ডিসেম্বর মাসে এতোগুলো হরতাল, অবরোধ, ভাঙচুর, পোড়াপুড়ি, জীবনহানি ও দুর্ভোগ ঘটবে তা আগে ভাবা যায়নি। তবে ২৯ নভেম্বর ১৮ দলীয় জোটের ঢাকা সমাবেশ থেকে ৯ ডিসেম্বর দেশব্যাপী রাজপথ ও সড়কপথ অবরোধের ঘোষণা আসার পর ধারণা করা হয়েছিল যে ঐ দিন সহিংস কিছু না কিছু ঘটনা ঘটতে পারে, তা থেকে দেশের রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু তার আগেই ৩ ডিসেম্বর জামায়াত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আটককৃত নেতাদের মুক্তির দাবিতে সমাবেশ করতে না পারার কারণে পরদিন ৪ তারিখ দেশব্যাপী হরতাল আহবান করে বসে। বিএনপি উক্ত হরতালকে নৈতিকভাবে সমর্থন প্রদান করে। ৪ তারিখের হরতালটি ছিল অনির্ধারিত। তাতে যথেষ্ট পরিমাণ সহিংস ঘটনা ঘটেছে, জামায়াত শিবিরের কর্মীরা একদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর হামলা করেছে, অন্যদিকে ব্যাপক গাড়ি ও যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেয় ও ভাঙচুর করে। সব মিলিয়ে ৪ ডিসেম্বরই বোঝা গেল যে, ডিসেম্বর মাসটি দেশে বেশ উত্তপ্তই কাটবে। কেননা, জামায়াত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায়ের চাইতেও তাদের নেতৃবৃন্দের মুক্তির বিষয়টিকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে জোটের সভা, সমাবেশ বা তাদের দলীয় তত্পরতা সমান্তরালভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। ৯ ডিসেম্বর রাজপথ-জনপথ ও সড়কপথ অবরোধের কর্মসূচিতে বিএনপি’র নেতাকর্মীদের সক্রিয় অবস্থান এবং জামায়াত-শিবিরের অবস্থান বেশ লক্ষ্য করা গেছে। উভয় দলের নেতাকর্মীরা যে কোনো মূল্যে দেশে রাজপথ ও সড়কপথ অবরোধ করে রাখার জন্যে রাস্তায় নামে। আগের দিন থেকেই এ উপলক্ষে গাড়ি ভাঙচুর, আগুন লাগিয়ে ভীতিকর তথা ত্রাস সৃষ্টির অবস্থা তৈরি করে। পরদিন রাস্তায় এর উগ্র প্রমাণও তারা রাখে। দেশে অসংখ্য যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেয়া, ভাঙচুর করা ইত্যাদি জোর জবরদস্তির ঘটনা সেদিন তারা ঘটায়। এমন কি একজন জার্মান অতিথির গাড়ি ভাঙচুর থেকেও রেহাই পায়নি। অপরদিকে ঐ দিন পুরান ঢাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বিশ্বজিত্ ঘোষ নামক একজন নিরীহ তরুণকে অবরোধে অংশগ্রহণকারী সন্দেহে নির্মমভাবে পিটিয়ে এবং ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেছে যা ছিল অকল্পনীয় ব্যাপার। পুরো বিষয়টি সকল মহলকে বেশ হতবাক ও ভীত সন্ত্রস্ত করেছে। এ ঘটনাকে পুঁজি করে ১৮ দল ১১ ডিসেম্বরও হরতালের ডাক দেয়। তাতেও শতাধিক যানবাহনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ঘটে, বেশ কিছু দোকানপাটও ভাঙচুর করা হয়। ১৮ দলীয় নেতৃবৃন্দ বেশ উত্সাহী হয়ে কঠোর আন্দোলনের কথাই ভাবছিল। সেই পরিস্থিতিতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামকে নতুন মামলায় জড়িয়ে গ্রেফতার করা হয়। এর প্রতিবাদে ১৩ ডিসেম্বর দেশব্যাপী আধাবেলা হরতাল ডাকা হয়, জামায়াত নেতা ডা. শফিকুর রহমানকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে গোটা সিলেট অঞ্চলে পূর্ণদিবস হরতাল পালিত হয়েছে। ঐ দিনও দেশের সর্বত্র বিএনপি এবং জামায়াতের নেতাকর্মীরা মাঠে বেশ সক্রিয় ছিল। তবে হরতাল উপেক্ষা করেই বেশ কিছু যানবাহন রাস্তায় নেমেছিল, জনমনে তীব্র ভয়ও লক্ষ্য করা গেছে।
এ দিনের নতুন প্রবণতা বেশ আতঙ্কের বিষয় বলে মনে হচ্ছে। ঢাকার বেশ কিছু বিএনপির নেতাকর্মীর মিছিল থেকে ককটেল ও বোমা নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে, বেশ কিছু গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। দেশে ১৩ তারিখ পর্যন্ত তিনদিন হরতাল, একদিন অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সম্ভবত ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। কয়েকশ’ আহত হয়েছে, অনেকে গ্রেফতার হয়েছে, অসংখ্য গাড়ি, দোকানপাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, মানুষের কর্মস্থলে যাওয়া-আসা নিয়ে প্রচুর ভোগান্তির সৃষ্টি হয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্য বলতে গেলে বন্ধ ছিল, সাধারণ মানুষ অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ঠেলে গন্তব্যে গেছেন, চিকিত্সা লাভে অনেকে বঞ্চিত হয়েছে, সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকের গাড়ি ও যন্ত্রপাতি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অবরোধ ও হরতালের কর্মসূচিতে অংশ নেয়া কর্মীরা বেশ উগ্র ছিল, হরতাল প্রতিরোধে অংশ নেয়া ছাত্রলীগের কর্মীরাও ছিল বেপরোয়া, বিশ্বজিত্ হত্যাকারীদের গ্রেফতার নিয়ে নানা কথা ও বিভ্রান্তিতে মানুষের মধ্যে বেশ কিছু সন্দেহ তৈরি হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে এ ক’দিনের সাংঘর্ষিক কর্মসূচিতে রাজনৈতিকভাবে কার লাভ কী হলো সেই হিসাব নেয়ার বিষয়টি কেউ গুরুত্ব দিচ্ছে কিনা জানি না, তবে জনগণ এ সব কর্মসূচির ফলে নানা ভোগান্তি, নিরাপত্তাহীনতা, আতঙ্ক ও ভীতিতে পড়েছে। মানুষ শঙ্কিত দেশের ভবিষ্যত্ রাজনীতি নিয়ে, নেতাকর্মীদের বেপরোয়া আচরণে, কূটযুক্তি শুনে আরও ক্ষুব্ধ।
ফিরে আসি মূল প্রসঙ্গে এই হরতাল ও অবরোধ ডেকে বিএনপি এবং জামায়াতের রাজনৈতিক লাভ কতোটুকু হয়েছে। সরকারেরও লাভ-ক্ষতি কিছু হয়েছে কিনা। এ প্রসঙ্গে বলা যায় যে, জামায়াত একটি প্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনীর দল সেটি তারা একদিনের কার্যক্রমে প্রদর্শন করেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর ফলে জামায়াতের রাজনৈতিক চরিত্র আরো বেশি উন্মোচিত হয়েছে। হরতাল, জামায়াত শিবিরের কর্মীরা মার্কিন দূতাবাসের গাড়ি ভাঙচুর করার দায় স্বীকার করেছে এটি অভূতপূর্ব নজির, এর জন্যে তারা দুঃখ প্রকাশসহ ক্ষতিপূরণ দেয়ারও প্রস্তাব দিয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে দেশে বড় ধরনের সমালোচনার মুখে পড়েছে জামায়াত। কেননা, জামায়াতের নেতাকর্মীরা হরতাল ও অবরোধকালে দেশের সাধারণ মানুষের যানবাহন পুড়িয়েছে, ভাঙচুর করেছে। সেই সব মালিকের কাছে ক্ষমা চেয়ে তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার উদ্যোগ নিলে রাজনীতিতে জামায়াত প্রশংসা হয়তো পেতো। কিন্তু যেহেতু তারা মার্কিন দূতাবাসের গাড়ি ভাঙচুরের ক্ষেত্রে এ ধরনের স্বচ্ছতার পরিচয় দিয়েছে তাই জামায়াতের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সেটিই ঘটেছে। গত কয়েক দিনের ১৮ দলীয় কর্মসূচিতে জামায়াত মাঠে বেশ উজ্জীবিতভাবে ছিল। তবে আটককৃতদের মুক্তির দাবিতে গোটা দলকে যুক্ত করে যে আন্দোলন তারা করছে তাতে গোটা দলের রাজনৈতিক অবস্থানই বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এর ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে জামায়াতের রাজনীতি কতোটা ইতিবাচকভাবে যাবে, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে।
অন্যদিকে বিএনপি গত কয়েকদিনের কর্মসূচিতে তাদের দলীয় কর্মীদের মাঠে নামাতে পেরেছে এটি দল হিসেবে তাদের বড় সাফল্য এবং সান্ত্বনাও হতে পারে। গত প্রায় চার বছর বিএনপি শত চেষ্টা করেও নেতাকর্মীদের মাঠে তেমন নামাতে পারেনি। তবে অবরোধ ও হরতাল কর্মসূচিতে বিএনপির নেতাকর্মীদের উন্মত্ততা, উগ্রতা, গাড়ি ভাঙচুর, আগুন জ্বালানোর ঘটনা, ককটেল ও বোমা বিস্ফোরণের দৃশ্যাবলি মানুষকে বিএনপি সম্পর্কে বেশ শঙ্কিত করেছে। এ ধরনের স্থানীয় নেতাকর্মীদের দিয়ে জোর জবরদস্তির হরতাল ও অবরোধ করা গেলেও মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করা বেশ কঠিন বলেই মনে হয়। অধিকন্তু মানবতা বিরোধী বিচারের বিষয়টি নিয়ে বিএনপির নেতৃবৃন্দের কথাবার্তা, আইনজীবীদের অবস্থান সবই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিটি গত কয়েকদিনের কর্মসূচিতে পিছিয়ে পড়েছে। বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে এক ধরনের চরম মানসিকতা বিরাজ করছে যে, তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে হরতাল ও অবরোধে যানবাহনের ওপর, সাধারণ মানুষের রুটি রুজির কর্মসংস্থানের ওপর। ফলে মানুষ এখন বলতে পারছে না বিএনপির দাবি আদায়, নাকি তাদের শক্তি প্রদর্শনের মহড়া ঘটিয়েছে গত কয়েকদিনের কর্মসূচিতে। সেই শক্তি প্রদর্শনের বিষয়টি জনগণ কতোটা ভালোভাবে নিয়েছে তা বলা মুশকিল। তবে হরতাল বা অবরোধের কোনো কর্মসূচিতেই দলীয় নেতাকর্মীদের বাইরে সাধারণ কোনো মানুষকে রাস্তায় আলিঙ্গন করতে পারেনি বিএনপি, নামাতেও পারেনি। অতীতে আওয়ামী লীগ যে সব জাতীয় ইস্যুতে হরতাল ও আন্দোলন করেছে তাতে জোর জবরদস্তি ছিল সত্য, তবে এক সময় জনসম্পৃক্ততা ঘটানোর কৌশল কার্যকর ছিল। যেমন ১৯৯৫-৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলন, কিংবা ২০০৬ সালের নির্বাচন কমিশন ও ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিরোধী আন্দোলন বিভিন্ন দল মত ও জনগণকে সম্পৃক্ত করা গেছে। কিন্তু বিএনপি বা ১৮ দলীয় জোট সেই কাজটি গত কয়েকদিনের আন্দোলনে করতে পারেনি, নীরব সমর্থন কতোটা আদায় করতে পেরেছে তা অনুমান করে বলা ঠিক নয়। তবে মানুষ এ ধরনের কর্মসূচিকে মোটেও সমর্থন করে না এটি বেশ স্পষ্টভাবেই বলা যায়।
অন্যদিকে সরকার বিরোধী দলের কর্মসূচি মোকাবিলায় একদিকে হিমশিম খেয়েছে, অন্যদিকে ছাত্রলীগের রাস্তায় নামতে দিয়ে বিশ্বজিত্ দাসের মতো একজন সাধারণ মানুষের হত্যাকাণ্ডে ভীষণভাবে সমালোচনার মুখে পড়েছে। সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে কথা ও বাস্তবতায় যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে তা জনগণের কাছে স্পষ্ট হয়েছে। সরকার বিরোধী দলের আন্দোলনকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে মোকাবিলা করবে এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু মিডিয়ার সম্মুখে অতিমাত্রায় কথা বলা, নানা বিভ্রান্তির জন্ম দেয়া কোনোভাবেই সমর্থন যোগ্য নয়। বিশ্বজিতের মৃত্যু হত্যাকারীদের সময় মতো ধরার চাইতে নানা কথা বলা, সাফাই গাইতে চেষ্টা করা সুবিবেচিত হয়নি। ফলে সরকারের অনেক কিছুই ম্লান করে দিয়েছে।
সরকার সবক’টি বেশ দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারলেও অবরোধ, হরতাল মোকাবিলায় ছাত্রলীগের কিছু সংখ্যক নেতাকর্মীর অমানবিক ঘটনাটি দেশব্যাপী হূদয়বিদারক আবেগ সৃষ্টি করেছে। এতে সরকারের আন্তরিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ফলে জনমনে আতঙ্ক শুধু বিরোধী দলের দিক থেকেই নয়। সরকারি দলের সমর্থিত ছাত্রলীগের অতিউত্সাহী কিছু সংখ্যক কর্মী এবং নেতাদের বক্তৃতা বিবৃতিতেও সৃষ্টি হয়েছে, হতাশার জন্ম দিয়েছে। এটি সরকারের জন্যে মোটেও ভালো ফল বয়ে আনেনি। ফলে জনমনে নানা ক্ষোভ, হতাশা ও অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে যা দেশের রাজনীতিকে গণতান্ত্রিক ধারায় এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের হোঁচট খেয়েছে। এখন সম্মুখে বিজয় দিবস পরবর্তী দিনগুলোতে কী হয়, বিরোধী দলের আচরণ রাস্তায় কী রূপ ধারণ করে, সরকার কী করতে যাচ্ছে, বিএনপিকে কীভাবে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনবে তা দেখার বিষয়। ইতোমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগণ বাংলাদেশ সফর করে গেছেন, তারাও আলোচনায় বসার উপর তাগিদ দিয়েছেন, সাধারণ মানুষও মনে করছে কোনো ধরনের সংঘাত সংঘর্ষ বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজ জীবন এখন বহন করতে মোটেও প্রস্তুত নয়। সে ক্ষেত্রে বড় দুই দলের উচিত হবে চুক্তি ও বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে অগ্রসর হওয়া। তা হলেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না।
লেখক: অধ্যাপক, ইতিহাসবিদ ও
রাজনৈতিক বিশ্লেষক]