রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানার উদ্বৃত্ত জমি

পত্রিকান্তরে প্রকাশ, রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার উদ্বৃত্ত জমি পুনরায় চিহ্নিত করা হইতেছে। এই উপলক্ষে একটি উপ-কমিটি গঠন করা হইয়াছে বলিয়া জানা যায়। ইতোপূর্বে প্রাইভেটাইজেশন কমিশন নিজস্ব উদ্যোগে ৩৯টি সরকারি শিল্প-কারখানায় জরিপ চালাইয়া ১ হাজার ২৮৮ একর উদ্বৃত্ত জমি শনাক্ত করে। তবে শিল্প-বাণিজ্য ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ হইতে জানানো হইয়াছে যে, তাহাদের কোন কারখানাতেই উদ্বৃত্ত জমি নাই। এই বিষয়টি লইয়া বেসরকারিকরণ কার্যক্রম আগাইয়া নেওয়ার উদ্দেশ্যে গঠিত কমিটি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সহিত বৈঠকও করিয়াছেন। কিন্তু ঐ বৈঠকে প্রাইভেটাইজেশন কমিশন কর্তৃক চিহ্নিত উদ্বৃত্ত জমির ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আপত্তি উত্থাপন করেন। ফলে ঐ কমিশনের জরিপের আর কোন কার্যকারিতা এখন থাকিতেছে না। দেড় বত্সরকাল কমিশন এই ব্যাপারে কাজ করিতেছে; কিন্তু নানান ওজর-আপত্তি ও বাধার মুখে তাহারা অদ্যাবধি কোন জমি ইজারা দিতে পারে নাই। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বিরোধী মনোভাব ও অসহযোগিতার দরুন বাস্তবে প্রাইভেটাইজেশন কমিশন ব্যর্থ হইয়া গিয়াছে। আর সেই কারণেই এখন নূতন করিয়া কমিটি গঠনের প্রয়োজন দেখা দিয়াছে এবং সেই মোতাবেক একটি কমিটি ইতোমধ্যে গঠিত হইয়াছে। এক্ষণে এই কমিটি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানায় উদ্বৃত্ত জমি পুনরায় চিহ্নিত করিবে। একটি অতি প্রয়োজনীয় বিষয়কে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ঘূর্ণাবর্তে নিক্ষিপ্ত করিয়া কে বা কাহারা স্বার্থসিদ্ধি করিতে চাহে উহা ভাবিয়া দেখা এবং চিহ্নিত করা দরকার। রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানার উদ্বৃত্ত জমি ইজারা দিতে আপত্তিটি আসলে কোথায়? এইরূপে ঐ জমি ফেলিয়া রাখার অর্থ দাঁড়ায় উহা বেহাত হওয়া। অর্থাত্ ঐ জমি ইজারা না দেওয়ায় বা কোন প্রকার কাজে ব্যবহার না করায় বাস্তবে এক ধরনের কায়েমি স্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টাই দৃশ্যমান হইয়া উঠে। উদ্বৃত্ত জমি ফেলিয়া রাখার পর মোক্ষম সময়ে অসাধু উপায়ে উহা জবরদখলের দুরভিসন্ধি থাকাটা অসম্ভব নহে। এই সকল উদ্বৃত্ত জমি ইজারাদানে আপত্তি তুলিবার অর্থটি আসলে কি দাঁড়ায়, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কি কখনও উহা ভাবিয়া দেখিয়াছেন? সোজা-সাপ্টাভাবে বলিতে গেলে এইক্ষেত্রে এই কথাই বলা সঙ্গত যে, এই আপত্তির পশ্চাতে কোন স্বার্থবোধের তাড়না আছে। নচেত্ উদ্বৃত্ত জমি ইজারাদান বা ব্যবহারের ব্যবস্থা না করিয়া উহা ধরিয়া রাখার উদ্দেশ্য কি? সরকারি জমি এইভাবে ফেলিয়া রাখার অর্থই দাঁড়ায় উহা বেদখলের ব্যাপারে প্ররোচনা দেওয়া। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ব্যক্তিবর্গ জটিলতা সৃষ্টির মাধ্যমে ঐ জমি নিজেরা বা অন্যদেরকে আত্মসাতের সুযোগ করিয়া দেয় কিনা উহাও খতাইয়া দেখা দরকার নিশ্চয়ই। মোদ্দাকথা, ইহার একটি বিধিসম্মত বন্দোবস্ত দরকার। জমি ফেলিয়া রাখিলে মতলববাজ ছাড়া অন্য কাহারও কোনই লাভ নাই। এই সকল জমির সদ্ব্যবহার করাটাই জরুরি আর ইহাতে দেশের লাভ বৈ ক্ষতি নাই! সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যদি সামন্ত যুগের জমিদারদের ন্যায় আচরণ করাকেই জনসেবা বা দেশসেবা ঠাওরাইয়া থাকেন তাহা হইলে তো তাহারা সন্দেহাতীতভাবে বিভ্রমের মধ্যে রহিয়াছেন। তাহাদের ক্ষমতা জনস্বার্থে প্রয়োগ করার মধ্যেই তাহাদের দেশপ্রেমের পরিচয় এবং ইহাতে দেশের কল্যাণও নিহিত। সুতরাং, উদ্বৃত্ত জমিগুলিকে কিভাবে কাজে লাগানো যায় সেই ভাবনাই হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট মহলের প্রাথমিক দায়িত্ব। অযথা জটিলতা সৃষ্টি করিয়া কিংবা প্রতিবন্ধকতা রচনা করিয়া মহতী কোন কর্মোদ্যোগ বাস্তবায়ন করা যায় না। আমাদের দেশে বিপুল সংখ্যক মানুষ বেকার। ঐসব পতিত জমি শিল্পায়ন বা কৃষি কাজে কিংবা অন্য কোন প্রকার উপযুক্ত কাজে ব্যবহারের বন্দোবস্ত দিলে বহু বেকারের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হইবে। তাহাছাড়া উত্পাদিত পণ্য দেশীয় বাজারে ও বিদেশের বাজারে বিক্রয়ের ব্যবস্থা হইলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে উহা ইতিবাচক ভূমিকা রাখিবে। এমতাবস্থায় রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানায় উদ্বৃত্ত জমিগুলিকে উপযুক্তভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার দিকেই সংশ্লিষ্ট মহলের শুভ দৃষ্টি কাম্য। ভুলিলে চলিবে না যে, সকলে মিলিয়া সকলের তরে স্বার্থ বলিদানের শিক্ষা আমাদের সংস্কৃতির এক সুমহান ঐতিহ্য। অতএব, উহা রক্ষার দায়িত্ব যাহাদের উপর ন্যস্ত তাহারা যেন নিছক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থে উহাকে জলাঞ্জলি না দেন!