আলোকপাত
বিজয়ে-পার্বণে উত্সবে সবাইকে আমন্ত্রণ
প্রকাশ : ১৪ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৪৪
একটা নতুন কিছু করো, একটা নতুন কিছু ভাবো— গতানুগতিকতার এই জীবনে এ ধরনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন অনেকেই। প্রশ্ন হচ্ছে, নতুন কিছু ভাবলে বা করলেই কি তা কল্কে পায়, নাকি আমরা পুরনো নিয়েই থাকতে ভালোবাসি? নতুন কিছু করলে তা যদি সমাদৃত না হয়, তাহলে অন্যরা নতুন ভাবনায় অনুপ্রাণিত হবে কেন? প্রশ্ন উঠতে পারে, যা করা হলো, তাকে তো সত্যিকার অর্থেই নতুন হয়ে উঠতে হবে, নতুন কিছু করতে গিয়ে অনেকে উদ্ভট কিছু করে ফেলেন—সেক্ষেত্রে তো তা পৃষ্ঠপোষকতা পেতে পারে না। খুবই সত্য কথা। কিন্তু নতুন যদি সত্যি সত্যি নতুন হয়, তাহলে?
যা হোক, বিজয়ে-পার্বণে উত্সবের উদ্বোধন হয়েছে গত ৭ ডিসেম্বের। সেই অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের বছরটি স্মরণ করে ১৯৭১ জন শিশু লাল জামা পরিধান করে গাইলো জাতীয় সঙ্গীত। এদের মধ্যে ১৬ জনের (বিজয়ের দিন ১৬ ডিসেম্বর স্মরণে রেখে) হাতে বাংলাদেশের পতাকা তুলে দিলেন ১৬ জন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদ, মেজর জেনারেল আমিন আহমেদ চৌধুরী, স্কোয়াড্রন লিডার লিয়াকত আলী, মেজর জেনারেল সাঈদ আহমেদ, গোলাম মোস্তফা, লে. কর্নেল জাফর ইমাম, জহুরুল হক মুন্সী, শেখ আবদুল মান্নান, আবদুস সোবহান, মেজর তাহের আহমেদ, লে. কর্নেল মোদাচ্ছের হোসেন খান, মেজর মনজুর আহমেদ, মেজর আফতাব আহমেদ, রফিকুল ইসলাম প্রমুখ। একাত্তরে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণকারী এতজন মুক্তিযোদ্ধার একসঙ্গে একমঞ্চে ওঠার ঘটনা সম্ভবত এটাই প্রথম। এই যে মুক্তিযোদ্ধারা নতুন প্রজন্মের হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দিলেন তার মর্মকথাটা এই যে, আমরা তো মুক্তিযুদ্ধ করলাম, দেশকে স্বাধীন করলাম; এখন তোমরা এগিয়ে নিয়ে যাও দেশটাকে। এই বীরদের পরিচয় করিয়ে দিলেন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মেজর কামরুল হাসান ভুঁইয়া (অব.)। এরপর জ্বালানো হলো ৪১ ফুট (স্বাধীনতার ৪১ বছরকে মাথায় রেখে) দীর্ঘ টাওয়ারের বিজয়-দীপ। এ দীপ জ্বালালেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। সর্বশেষে আকাশে ওড়ানো হলো ১৬টি ফানুস। না, এখানেই শেষ নয়। বারী সিদ্দিকীর মোহনীয় বাঁশি শুনলেন দর্শক-শ্রোতা।
এ তো গেল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। মূল উত্সব অর্থাত্ ১৫, ১৬ ও ১৭ ডিসেম্বরেও থাকছে সারাদিনব্যাপী ব্যতিক্রমধর্মী সব ইভেন্ট। এর মধ্যে অন্যতম হলো প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির সাহস, বীরত্ব, আত্মত্যাগ ও গৌরবের কথা শোনাবেন একাত্তরে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণকারী কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। এছাড়াও বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরেছেন যারা, সেইসব কৃতী ব্যক্তিদেরও উপস্থিত করা হবে উত্সবে। আমরা চেয়েছি, বিজয় শব্দটিকে ব্যঞ্জনাময় করে তুলতে। বিজয় মানে শুধু স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয় নয়, এ বিজয় আমরা অর্জন করছি নানাভাবেই। সেইসব গৌরবময় কৃতিত্বের সঙ্গে নবপ্রজন্ম পরিচিত হতে পারলে তারা উত্সাহিত হবে বৈকি! আমাদের ধারণা, ১৫, ১৬ ও ১৭ ডিসেম্বরের বিজয়-পার্বণে উত্সবটি এক নতুন মাত্রিকতায়, এক নতুন অর্থবাচকতায় দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করতে সক্ষম হবে। তারা বিনোদিতও হবেন। কারণ বিনোদনমূলক অসংখ্য ইভেন্টে সাজানো হয়েছে এ উত্সব।
এখন বেদনার জায়গাটাতে আসি। এই যে নিরলস পরিশ্রম ও মেধার সমন্বয়ে আয়োজন করা হলো এই উত্সবের, তার প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা কই? এমনকি মিডিয়ার নজরও তেমনভাবে আকর্ষণ করতে পারছে না এতবড় এই আয়োজন। আশা করা হয়েছিল, কিছুটা নতুনত্বের কারণে এই উত্সব আয়োজন মিডিয়ার কাছে গুরুত্ব পাবে। কিন্তু না, তা পায়নি। রাজনৈতিক হানাহানি, নেতাদের বাক-বিতণ্ডা নিয়ে গণমাধ্যমের যতটা ব্যাকুলতা, মানুষকে আশাবাদী করা, আমোদিত করার ব্যাপারে মনে হয় ততটা নয়। এখন কেউ যদি বলেন, কোন বিষয়কে কতটা ট্রিটমেন্ট দিতে হবে, সে ব্যাপারে আমাদের মিডিয়া এখনও ততটা ঋদ্ধ হয়ে উঠতে পারেনি— তাহলে তাকে দোষারোপ করা যাবে কি? আরেকটা বিষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এদেশে মর্মবস্তুর চেয়ে মোড়কের কদর বেশি। মোড়কটি চাকচিক্যময় হলে ভেতরের অন্তঃসারশূন্যতাও বড় হয়ে দেখা দেয় না।
এই লেখাটির মাধ্যমে আমরা সবাইকে আহ্বান জানাই, আপনারা ১৫, ১৬ ও ১৭ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয় খেলার মাঠে উপস্থিত হয়ে বিজয়ে- পার্বণে উত্সবকে সফল করে তুলুন। উত্সবে এমন সব আয়োজন থাকবে যেগুলো আপনাকে অবশ্যই আন্দোলিত ও আল্পুত করবে।
লেখক :সাংবাদিক
mahbubkamal 08@ yahoo.com