স্বাধীনতার ৪১ বছর চলছে এ কোন অরাজকতা

এ বছর বাংলাদেশ ১৬ ডিসেম্বর ৪১তম বিজয় দিবস পালন করবে। মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি জানাই গভীরতম শ্রদ্ধা। এ মাস যেমন আমাদের গৌরবের মাস, উত্সবের মাস, তেমনই বেদনারও। এই ডিসেম্বর মাসেরই ১০ থেকে ১৪ তারিখের মধ্যে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সমর্থনে তৈরি ও পুষ্ট আলবদর, আলশামস বাহিনী নৃশংসভাবে হত্যা করে এদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের, যাতে করে বাংলাদেশ মেধাশূন্য হয়ে পড়ে। সেই ২৫ মার্চের অপারেশন সার্চ লাইটের আওতায় ৯ মাস ধরে ৩০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আর তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামসরা। নির্যাতন- অত্যাচার চালিয়েছে অবরুদ্ধ বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের উপর। দুই লক্ষ নারীকে শারীরিক নির্যাতন করেছে, করেছে ধর্ষণ। আজ তাই সকল গর্ব, আনন্দ আর উত্সবের অনুভূতির সাথে সাথে চোখ হয়ে ওঠে অশ্রুসজল। মনে পড়ে যায় একে একে লক্ষ শহীদের কথা, যাদের মধ্যে আছে রুমী, বদি, জুয়েল, সামাদ, আজাদ, আছেন আলতাফ ভাই, গিয়াসউদ্দীন আহমদ, সন্তোষ ভট্টাচার্য, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, গোবিন্দচন্দ্র দেব, সেলিনা পারভীন, জগন্নাথ হলের ছাত্র বন্ধুরা, মধুদা, ধোপা বাসুদেব, সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন, শহীদ সাবের, আরও কত যে নাম না জানা হারিয়ে যাওয়া এই দেশের মানুষের মুখ। বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষকে তখন পেয়ে বসেছিল এক অদ্ভুত উন্মাদনা, যে উন্মাদনায় জীবন বাজি রেখে কোটি কোটি নিরস্ত্র মানুষ নারী, পুরুষ, ধর্ম, শ্রেণী, জাতি-গোষ্ঠী ভুলে সকলেই নিজেকে পরিণত করেছি মুক্তিযোদ্ধায়। কিছু কুলাঙ্গার অবশ্যই তা করেনি, বরঞ্চ যোগ দিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে—গণহত্যা, নিপীড়ন, নির্যাতন আর নারী ধর্ষণের কাজে। সেই ব্যক্তিরা আজ একে একে চিহ্নিত হচ্ছে যুদ্ধাপরাধী বলে এবং তাদের বিচার কাজও শুরু হয়ে গেছে। অবাক হয়ে লক্ষ্য করি তাদের রক্ষা করতে মাঠে নেমেছেন স্বাধীনতার ঘোষক বলে যারা নিজেদের দাবি করেন তাদেরই দলের নেতারা। তারাও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায় থেকে মুক্তি পেতে পারেন না। তবে কিছু ব্যক্তি ব্যতীত বাংলাদেশের সকল মানুষ আজ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে তাদের বিচারের দাবিতে আর বিচারের সমাপ্তি শেষে তার রায় কার্যকর হয়েছে তা দেখার আশায়। আশা করি রায় বাস্তবায়নের জন্য খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না। এই ৪১ বছরে বাংলাদেশের অর্জন অনেক। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে—যার মধ্যে রয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর পরিবারসহ নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড, জেলখানায় চার নেতাকে কাপুরুষোচিতভাবে হত্যা করা, দীর্ঘ সময়ের জন্য জেনারেলদের শাসনের নিচে থাকতে বাধ্য হওয়া এবং তাদেরই কৌশল হিসাবে মুক্তিযুদ্ধের ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতান্ত্রিক নীতিকে খর্ব করে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পাক হানাদার বাহিনীর দালাল ও ঘাতকদের পুনর্বাসন— বাংলাদেশ এখনও পৃথিবীর মানচিত্রে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উজ্জ্বল অস্তিত্ব বজায় রেখে চলেছে। অমর্ত্য সেনের বহুমাত্রিক উন্নতির মাত্রায় বাংলাদেশ নারী প্রগতি এবং আরও কিছু সামাজিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য স্বাক্ষর রেখেছে। প্রকৃতপক্ষে দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশের তুলনায় বাংলাদেশ অনেক ভালো ফল অর্জন করেছে। তবে মানবাধিকারকর্মী এবং সংগঠনগুলোর বিশ্লেষণে বাংলাদেশ মানবাধিকার, সুশাসন, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং আইনের শাসনের ক্ষেত্রে তেমন অগ্রগতি সাধন করতে পারেনি—বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানবাধিকার ও বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী এবং নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষায় সরকার যথেষ্ট অবহেলা ও অনীহার পরিচয় দিয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে মানবাধিকারের লঙ্ঘনের ঘটনা উদ্বেগজনক পর্যায়ে চলে গেলেও সরকার সেসব ঘটনার দায় স্বীকার না করে নানাভাবে বরং লঙ্ঘনের পক্ষে যুক্তি দেয়ার চেষ্টা করেছে। তার ফলে সমাজে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ইত্যাদি ভয়ানক অপরাধ সংঘটিত হয়েই চলেছে এবং বিচারহীনতা, অপরাধীদের আইনের ঊর্ধ্বে থাকা এবং নিজের হাতে আইন তুলে নেয়ার প্রবণতা রোধ করা যায়নি। একই কারণে দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রেও নিরপেক্ষতার অভাব প্রদর্শন করে সরকার দুর্নীতির সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের এই বার্তা পাঠাতে পারেনি যে, তারা দুর্নীতি দমনের ব্যাপারে যথেষ্ট দৃঢ়। এ সমস্ত কারণে সরকারের ভালো কাজগুলোর সুফল জনগণের কাছে প্রত্যাশিতভাবে পৌঁছানোর ব্যাপারে যথেষ্ট ব্যর্থতা রয়ে গেছে। আজকে স্বাধীনতার ৪১ বছর পরে বিজয় দিবস উপলক্ষে আন্তরিক কামনা যে, মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনায় বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল, বাংলাদেশ যেন সেই অবস্থানে পৌঁছাতে পারে এবং সেই পথ ধরেই অগ্রসর হতে পারে। ৪১তম বিজয় দিবসে বাংলাদেশের সবার জন্য রইল অভিনন্দন। লেখক : নারীনেত্রী, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা