বই ব্যবসায়ীদের সংকট
প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:০০
বাংলাদেশের বই ব্যবসায়ীদের এখন দুর্দিন যাইতেছে। গত শনিবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, ব্যবসায়িক মন্দার কারণে তাহারা ভাল নাই। তাহাদের এই ভাল না থাকার পিছনে প্রধান কারণ হইল নোট-গাইড বই প্রকাশ ও বিক্রয়ের পথ বন্ধ হইয়া যাওয়া। তাহাছাড়া ২০১০ সাল হইতে প্রাথমিকের পাশাপাশি মাধ্যমিকের বইও সরকার বিনামূল্যে দিয়া আসিতেছে। ফলে বই ব্যবসায়ীরা আরো বিপাকে পড়িয়াছেন। তাহাদের কাজের ক্ষেত্র সংকুচিত হইয়া আসিয়াছে। এই দৈন্যদশায় কেহ কেহ পেশা বদলও করিতেছেন। সৃজনশীল বইয়ের তুলনায় পাঠ্যবই ও নোট-গাইডের ব্যবসাই বাংলাবাজারের প্রাণভোমরা। সেই প্রাণভোমরা যখন হাতছাড়া হইয়া গিয়াছে, তখন ব্যবসায় ধস নামিবে ইহাই স্বাভাবিক। এখন এসব প্রকাশক ও বই বিক্রেতা নিজেদের দোকানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্কুল-কলেজের খাতা, কাগজ, কলম ইত্যাদি রাখিতেছেন। অনেক ঐতিহ্যবাহী লাইব্রেরী মালিক শুধু পূর্ব-পুরুষের স্মৃতি রক্ষার্থে কোনভাবে ব্যবসা ধরিয়া রাখিয়াছেন। মফস্বলেও ইহার প্রভাব পড়িতে শুরু করিয়াছে। অনেক বইবিক্রেতা বইয়ের দোকান গুটাইয়া ফেলিতেছেন। বাংলাদেশে আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির প্রসারের কারণে সিনেমা হলগুলির যে করুণ হাল হইয়াছে, বহুমাত্রিক কারণে বইয়ের দোকানের ক্ষেত্রেও একই পরিণাম যেন অপেক্ষা করিতেছে।
গত শতকের ত্রিশের দশকে ১০-১২টি বইয়ের দোকান দিয়া বাংলাবাজারের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে ইহার সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। এখন প্রায় সাত হাজার ছাপাখানায় বই ছাপা হইতেছে এবং তাহা ৩৫ হাজার দোকানের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাজারজাত করা হইতেছে। এই পরিসংখ্যানই বলিয়া দিতেছে আমাদের বই ব্যবসা গত কয়েক দশকে ব্যাপক সম্প্রসারিত হইয়াছে। পাঠ্যবই বিক্রতাদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হইলেও সৃজনশীল অনেক বইয়ের প্রকাশক ও বিক্রেতা নামিদামি লেখকদের বই প্রকাশ করিয়া মোটামুটি ভালই আছেন। তবে যেভাবে ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়িতেছে, ইংরেজি জানা নূতন প্রজন্ম বইবিমুখ হইতেছে, তাহাতে তাহাদেরও এক অজানা ভয় ও আতংক পাইয়া বসিয়াছে। ই-বুকের ঝাপটায় তাহারাও কি একদিন হারাইয়া যাইবেন, মুদ্রণশিল্পের ব্যয় বৃদ্ধিতে তাহারা আরও প্রমাদ গুণিবেন? তবে মুদ্রণশিল্পের আলাদা বৈশিষ্ট্যের কারণে তাহাদের ব্যবসায় টানাপোড়েন থাকিলেও একদম বন্ধ হইয়া যাইবে এমন ভবিষ্যদ্বাণী এই মুহূর্তে কেহই করিতেছেন না। তাহারপরও একপ্রকারের আতংক গোটা সেক্টরকেই আক্রান্ত করিয়া বসিয়াছে।
বইয়ের প্রাণকেন্দ্র বাংলাবাজারে এমন অনেক প্রকাশক আছেন যাহারা নোট-গাইডের ব্যবসা করিয়াই বিপুল অর্থ-বৈভবের মালিক হইয়াছেন। পরে সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির খাতিরে সৃজনশীল প্রকাশনায় আসিয়াছেন। ১৯৮০ সালেই নোট-গাইড বই বন্ধের আইন করা হয় জনস্বার্থের কথা মাথায় রাখিয়া। কিন্তু অন্যান্য আইনের ন্যায় ইহার বাস্তবায়ন তেমন ছিল না বলিলেই চলে। ইহার সুযোগ লইয়াই এ ধরনের ব্যবসা বিকশিত হয়। তাহার পর পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি ও জনমত বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট সুনির্দিষ্টভাবে বিধি-নিষেধ জারি করে। সরকারও এ ব্যাপারে নড়িয়া চড়িয়া বসে। এখন স্কুল-কলেজের পরীক্ষায় সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করায় ঐ ধরনের ব্যবসা আরও মার খাইয়াছে। এমতাবস্থায় আমরা মনে করি, বই ব্যবসায়ীদের অবশ্যই বাস্তবমুখী হইতে হইবে, শুধু সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার দিকে চাহিয়া বসিয়া থাকিলে চলিবে না। নোট-গাইড-সাজেশন-হ্যান্ডনোট প্রভৃতি মূল ও আনুষঙ্গিক বই পড়ার প্রতি অনাগ্রহ তৈরি করে বিধায় এই ধরনের বইয়ের ব্যবসা এখন আর কাম্য নহে। তবে সরকারি বই প্রকাশের অর্ডার নিয়া ও ব্যাপকভাবে সৃজনশীল বই প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করিয়া তাহারা এই শিল্পের আরও উন্নতি সাধন করিতে পারেন। এজন্য বই পড়া আন্দোলনকে সামগ্রিকভাবে বেগবান করিতে হইবে। এই জায়গায় সকলের ঐকমত্য পোষণ ও উদ্যোগ গ্রহণ আবশ্যক।
প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের জেলা-উপজেলার পাঠাগার ও স্কুল-কলেজের লাইব্রেরিগুলি জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে। অনেক ক্ষেত্রে নাই কোন লাইব্রেরিয়ান। ইহাই মূল সমস্যা। এক্ষেত্রে সঞ্জীবনী শক্তির প্রয়োজন। লাইব্রেরি ও পাঠাগারগুলি জাগিয়া উঠিলে বাংলাবাজারও প্রাণ ফিরিয়া পাইবে। আর শুধু সাহিত্যগ্রন্থই নহে, চাই নানা স্বাদ ও রুচির বিচিত্র বইয়ের প্রকাশনা। জীবন চলার পথে কাজের ও দরকারি বই দরকার বেশি বেশি। বিভিন্ন পেশাকে অবলম্বন করিয়া মানসম্মত বই প্রকাশ জরুরি। এভাবে বইয়ের পাঠক ও ক্রেতা উভয়ই বাড়িতে পারে। বই প্রকাশনায় আসিতে পারে সঠিক পেশাদারিত্ব। যুগে যুগে বিভিন্ন জ্ঞানী-গুণী ও মনীষীর চিন্তা ও উদ্ভাবনী শক্তি পৃথিবীর গতিপথ বদলাইয়া দিয়াছে। আনিয়াছে রেনেসাঁ। বই-ই তাহাদের চিন্তাধারাকে ধরিয়া রাখিয়াছে। অতএব, তথ্য-প্রযুক্তির বিকাশকে সহায়ক শক্তি বিবেচনা করিয়াই মুদ্রণ শিল্পকে অগ্রসর হইতে হইবে এবং দুইয়ের মধ্যে সৃষ্টি করিতে হইবে মেলবন্ধন। আর এভাবেই বই ব্যবসায়ীদের হতাশা অনেকটা কাটিয়া যাইতে পারে।