আমরা শোকাহত
প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:০১
দিনটি ছিল শুক্রবার। অন্যসব দিনের মতই সে দিনের সেই সকালটিও ছিল হিম শীতল। কোমলমতি নিষ্পাপ শিশুরা আসিয়াছিল তাহাদের প্রিয় স্কুলে। হঠাত্ সেখানে উদ্ধত বন্দুক হাতে হানা দেয় নির্দয় খুনি। কেউ কিছু বুঝিয়া উঠিবার আগেই শুরু হইয়া যায় নির্বিচার গুলিবর্ষণ। মুহূর্তেই বক্ষ বিদীর্ণ হইল শিশুদের। এই পৈশাচিক হামলায় প্রাণহানি ঘটে আমেরিকার কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের নিউ টাউন শহরের স্যান্ডিহুক এলিমেন্টারি স্কুলের কুড়িজন শিশু শিক্ষার্থীসহ আটাশজনের। এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করিবার পর বিশবছর বয়সী ঘাতক অ্যাডাম লান্জা বাছিয়া নেয় আত্মহননের পথ। নিজেই নিজেকে হত্যা করিয়া নিবারণ করে তার অব্যাখ্যাত রক্তপিপাসা। এ নিয়া অবশ্য তথ্যের ভিন্নতাও রহিয়াছে। কোনো কোনো সূত্রে বলা হইয়াছে যে, অ্যাডাম লান্জা নিহত হইয়াছে পুলিশের গুলিতে। জানা যায়, এই শিশু হন্তারক স্কুলে হানা দিবার আগে নিজের মাকে হত্যা করে। তার মা ওই স্কুলেরই একজন শিক্ষিকা ছিলেন।
মর্মান্তিক এই ঘটনায় স্তম্ভিত— বেদনার্ত গোটা আমেরিকা। শোকে স্তব্ধ হইয়া গিয়াছে অভিজাত ও ধনবানদের শহর বলিয়া পরিচিত নিউটাউন। বন্ধ ঘোষিত হইয়াছে নগরীর সব স্কুল। বিমর্ষ-বিচলিত প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ঘটনার অব্যবহিত পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে তিনি বলেন, আমার হূদয় ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। এই শিশুদের বাবা মা, ভাই-বোন ও স্বজনদের কথা ভাবিয়া আমরা ব্যথিত।’ প্রেসিডেন্ট তাঁর এই অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন, শুধু একজন প্রেসিডেন্ট হিসাবে নয়, অভিভাবক হিসাবেও। নিউ টাউন ট্রাজেডির সংবাদে আন্তর্জাতিক সমাজও উদ্বিগ্ন ও শোককাতর। জাতিসংঘের মহাসচিব ছাড়াও বিশ্ব নেতৃবৃন্দ শোক জ্ঞাপন করিয়াছেন।
প্রসঙ্গত বলা আবশ্যক যে, নিউটাউনের পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ স্মরণকালের মধ্যে ভয়াবহতম হইলেও আমেরিকাসহ পাশ্চাত্য বিশ্বে এই ধরনের ঘটনা ইহাই প্রথম নয়। ১৯৮২ সাল হইতে এই পর্যন্ত এই ধরনের ৬৩ টি সহিংস ঘটনা সংঘটিত হইয়াছে বলিয়া এক হিসাব হইতে জানা যায়। ২০০৭ সালে ভার্জিনিয়া টেক ইউনিভার্সিটিতে এক ছাত্রের গুলিতে নিহত হন ৩২ জন। ১৯৯৯ সালে কলোরোডো রাজ্যের একটি হাইস্কুলে ২ শিক্ষার্থীর সশস্ত্র হামলায় মারা যান ১৩ জন। আমেরিকার বাইরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও এই ধরনের অমানুষিক ঘটনা সংঘটিত হইবার দৃষ্টান্ত রহিয়াছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের আগ্নেয়াস্ত্র রাখিবার মৌলিক অধিকার এবং অস্ত্রের সহজলভ্যতা লইয়া প্রশ্ন উঠিয়াছে। প্রেসিডেন্ট নিজেও প্রসঙ্গটির অবতারণা করিয়াছেন। এই অধিকার নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হইতেছে। পক্ষান্তরে বলা হইতেছে যে, এইরূপ নৃশংসতার পশ্চাতে আরও নানাবিধ সামাজিক ও মনোবৈজ্ঞানিক কারণ নিহিত রহিয়াছে। সমাজচিন্তাবিদ ও মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনের শৈথিল্য, অসহিষ্ণুতা, হতাশা— অবসাদ এবং মানসিক বৈকল্য এই ধরনের নির্দয় ও অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের অনুঘটক হিসাবে কাজ করিয়া থাকে। বিষয়টি লইয়া নূতন করিয়া ভাবিবার সময় আসিয়াছে। নিউ টাউনের হূদয়বিদারক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আমরা ব্যথিত- বেদনার্ত। আমরা জ্ঞাপন করি গভীর শোক ও সমবেদনা।