[ রা জ নী তি ]

চলমান রাজনৈতিক সংঘাতের সমাধান কোন পথে

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট কর্তৃক ৯ ডিসেম্বর আহূত দেশব্যাপী রাজপথ অবরোধ কর্মসূচি এবং পরে ১১ ও ১৩ ডিসেম্বর হরতাল চলাকালে রাজধানীসহ সারাদেশে যে ব্যাপক সহিংসতা ঘটে গেল তা দেখে দেশের মানুষ স্তম্ভিত ও শংকিত। শুধু দেশের মানুষ কেন, সারাবিশ্ব দেখলো বাংলাদেশের বড় দুই দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধীদল বিএনপির রাজনৈতিক সংঘাত কী ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে। ৯ ডিসেম্বর অবরোধ চলাকালে তিনটি তাজা প্রাণ অকালে ঝরে পড়ে। পত্র-পত্রিকার খবর অনুযায়ী এদের একজন অবরোধকারীদের ধাওয়ায় রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দ্রুতগামী বাসের চাপায় নিহত হন, আর একজন বিরোধী জোটের কর্মী যিনি সিরাজগঞ্জে নিহত। যার মৃত্যু দেশবাসীকে হতভম্ব ও আতঙ্কিত করেছে তিনি হলেন নিরীহ পথচারী বিশ্বজিত্ দাস। ২৫ বছরের তরতাজা যুবক। তিনি ওইদিন সকালে প্রতিদিনের মতো রাজধানীর পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের বাসা থেকে শাঁখারীবাজারে নিজের টেইলার্সে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী বোমাবাজ সন্দেহে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মীরা তাকে লক্ষ্মীবাজার বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে কুপিয়ে হত্যা করে। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বদৌলতে মানুষ এ নির্মম দৃশ্য টেলিভিশনে প্রত্যক্ষ করে এবং পরদিন দেশের দৈনিকগুলোতে তা প্রকাশিত হয়। ১৪ ডিসেম্বর দৈনিক ইত্তেফাকের দৃষ্টিকোণ বিভাগে বিশ্বজিত্ হত্যার ওপর পাঠকের অভিমত প্রকাশিত হয়েছে। একজন বলেছেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণে বিশ্বজিতের মতো সাধারণ নাগরিক মারা যাচ্ছে।’ আর একজন সরকারের ব্যর্থতাকে বিশ্বজিতের মৃত্যুর জন্য দায়ী করেছেন। অন্য একজন বলেছেন, ‘বিশ্বজিত্ অশুভ রাজনীতির শিকার হয়েছেন’। আবার কেউ বলেছেন, ‘আমাদের তথাকথিত গণতন্ত্রের নিষ্ঠুর বলি নিষ্পাপ বিশ্বজিত্’। অন্য একজন বলেছেন, ‘বিশ্বজিতের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দেশে অরাজক পরিস্থিতির বড় প্রমাণ মিলল’। অনেকে বিশ্বজিতের হত্যাকাণ্ডের ন্যায্য বিচার দাবি করেছেন। তিনটি তাজা প্রাণের অবসান ছাড়াও ৯ ডিসেম্বরের অবরোধ এবং পরে ১১ ও ১৩ ডিসেম্বরের হরতাল চলাকালে বিরোধী ও ক্ষমতাসীন জোটের কর্মী-সমর্থকদের বেপরোয়া সংঘর্ষে আহত হয়েছে শত শত মানুষ, নষ্ট হয়েছে দেশের সম্পদ, ব্যাহত হয়েছে স্কুল, কলেজ ও ইউনিভার্সিটির শিক্ষা কার্যক্রম। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য, উপোষ করতে হয়েছে দিন আনা দিন খাওয়া মানুষদের। দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা চলমান রাজনৈতিক সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ ও শংকা প্রকাশ করেছেন। তাদের কেউ হরতাল ও অবরোধকে ‘দঃখজনক’ বলে অভিহিত করেছেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ে ‘বিপথে চলেছে’ বলে মন্তব্য করেছেন। বলেছেন, নিরীহ পথচারী বিশ্বজিতকে কুপিয়ে হত্যা প্রমাণ করে ‘দেশে নৈরাজ্য’ চলছে। আর একজন এ সংঘাতকে ‘অশুভবুদ্ধিরই পরাক্রম’ হিসেবে দেখেছেন। চলমান সংঘাতকে ‘অসুস্থ্ রাজনীতির’ বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখেছেন অন্য একজন। চলমান সংঘাতময় পরিস্থিতিতে হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘প্রধান দলগুলো যদি উপলব্ধি করতে না পারে, সমাধানে রাজি না হয়, তাহলে কারও পক্ষে এই সংকট সমাধান করা সম্ভব নয়।’ আবার কেউ ‘সংঘাত বন্ধে রাষ্ট্রের ভূমিকা না’ দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। আবার কেউ ‘সংঘাত বন্ধ করে সংলাপ শুরুর’ ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। বলেছেন, ‘দেশের চলমান রাজনৈতিক সংঘাত থেকে উত্তরণে সংলাপের বিকল্প নেই।’ দেশের চলমান রাজনৈতিক সংঘাতময় কর্মসূচিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে ব্যবসায়ীরা ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের স্বার্থে সংঘাতময় রাজনীতি পরিহার করতে সরকার ও বিরোধীদলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। সে সাথে রাজনৈতিক মতানৈক্য দূর করতে হরতাল ও ধংসাত্মক রাজনীতির বিকল্প পন্থা বের করতে আবারো তাগিদ দিয়েছেন। শুধু দেশের সুশীল সমাজ, ব্যবসায়ী সমাজ, মিডিয়া এবং সচেতন জনগণ বড় দুই দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে আলোচনার মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ খুঁজে বের করার অনুরোধ জানায়নি, শুভাকাঙ্ক্ষি বিদেশি প্রতিনিধিরাও এ দুই দলকে আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট নিরসনের জন্য অনুরোধ জানাতে এগিয়ে এসেছেন। চলতি ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশ সফরে আসা জাতিসংঘের রাজনীতি বিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানাকো সফর শেষে ৯ ডিসেম্বর এক সাংবাদিক সম্মেলনে একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে একসঙ্গে কাজ করা ও সংলাপে বসার জন্য সব রাজনৈতিক দলকে অনুরোধ জানিয়েছেন। চলতি ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে বাংলাদেশ সফরে আসা যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ও’ব্লেক সাম্প্রতিক সংঘাত ও হরতালে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং সফর শেষে ১১ ডিসেম্বর এক সাংবাদিক সম্মেলনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে সংলাপে বসে আগামী সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য উপায়ে অনুষ্ঠানের উপায় খুঁজে বের করতে তাগিদ দিয়েছেন। তিনি আরো বলেছেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যে উপায়ে সমঝোতায় পৌঁছাবে তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। ইতিপূর্বে ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশের একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে আগামী সংসদ নির্বাচন প্রশ্নে একমত হয়ে সমাধান খুঁজতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি আরো বলেছিলেন, বিদেশিরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংঘাতের কোনো সমাধান দেবে না। গত বছর বাংলাদেশ সফরকারী জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন এবং চলতি বছর মে মাসে বাংলাদেশ সফরকারী যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন সব রাজনৈতিক দলকে আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছিলেন। বাস্তবিকপক্ষে চলমান রাজনৈতিক সংঘাতের সমাধান খুঁজতে হবে আলোচনার মধ্যে। সে আলোচনা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট ও প্রধান বিরোধীদল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে সরাসরি বা রাষ্ট্রপতির মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত হতে পারে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে বুঝতে হবে প্রধান বিরোধীদল নেতৃত্বাধীন জোটকে বাদ দিয়ে আগামী সংসদ নির্বাচন করলে তা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বাসযোগ্যতা হতে পারে না। বিএনপির শাসনামলে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তত্কালীন প্রধান বিরোধীদল আওয়ামী লীগসহ সব বিরোধীদল বর্জিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান তার জ্বলন্ত উদাহরণ। নির্বাচন অনুষ্ঠানের দেড় মাসের মধ্যে বিএনপিকে ওই সংসদের বিলুপ্তি ঘোষণা করতে হয়েছিল। প্রধান বিরোধীদল বিএনপিকেও বুঝতে হবে ১৯৯৪-৯৫ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট আন্দোলন করে তাদের কাছ থেকে সংসদ নির্বাচনকালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি আদায় করতে পারেনি। ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি এককভাবে সংসদে বিল এনে সংসদ নির্বাচনের সময়কালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করেছিল। সবশেষে যা বলা দরকার তা হলো, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার রাজনৈতিক সংঘাত শুধু গণতন্ত্রের অগ্রগতির পথকে কন্টকাকীর্ণ করবে। এতে আওয়ামী লীগ বা বিএনপির কেউ লাভবান হবে না। বরং লাভবান হবে অগণতান্ত্রিক শক্তি। তাই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির উচিত হবে চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে সংলাপে বসা। এর কোনো বিকল্প নেই। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এ নিদারুণ সত্যটা অনুধাবন করতে সক্ষম হলে তা তাদের নিজেদের ও গণতন্ত্রের জন্য শুভ হবে। লেখক :সাবেক সচিব Email:latifm43¦gmail.com