ভিভিআইপি’র কালচার ও বিমান বন্দর

বিমান বন্দর পৃথিবীর সব দেশের পরিচয়সূত্র। যে কোন দেশের বিমান বন্দরে নেমেই আঁচ করা যায় দেশটি কেমন। কেমন হতে চলেছে ভ্রমণ পর্ব। এটি বড়, ছোট বা মধ্যমানের দেশ বা তার সমৃদ্ধির পরিচায়কও বটে। একথা মানতেই হবে, হিথরো, জেএফকে, সিডনি বা সিঙ্গাপুরের এয়ারপোর্ট, তাদের পরিকাঠামো, সেবার মান ও সুযোগ-সুবিধা উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় চোখ ধাঁধানো। কিন্তু তার মানে এই নয়; এরাই সেরা। কিছুদিন আগেও এক জরিপে আমেরিকা, ইউরোপকে পিছে ফেলে দিয়ে শীর্ষে উঠে এসেছে এশিয়ার দেশগুলোর সুবিন্যস্ত, বিশাল বিমান বন্দর, ট্রানজিট রুট নামে পরিচিত সিঙ্গাপুর, হংকং, মালয়েশিয়া এমনকি থাইল্যান্ডের সুবর্ণভূমিও আজ জ্বলজ্বলে উজ্জ্বল, কয়েক বছর আগে কম্বোডিয়া ভ্রমণে গিয়ে প্রথমে পা রেখেছিলাম তাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সিয়াম রীপের ছোট্ট বিমান বন্দরের মাটিতে। অষ্ট্রেলিয়ার সিডনি, মেলবোর্ন বা ব্রিসবেনের তুলনায় গ্রাম্য বলাটা যৌক্তিক এমন এক বিমান বন্দরে অবতরণের স্মৃতিটি উজ্জ্বল হয়ে রইল আন্তরিক অভ্যর্থনা আর বিনয়খচিত সৌজন্যে। বিমান থেকে নেমে হেঁটে আসার পথেই জাপানী কায়দায় মস্তক অবনত প্রণাম, সালাম আর ছোট ফুলের তোড়া দিয়ে তারা জানিয়ে ছিলেন শহরটি পর্যটনের জন্য তৈরি। তৈরি তার অতিথি বরণে, এমন সাদর সম্ভাষণ অচেনা, অজানা পর্যটকের জন্য স্বস্তির। বালির মত ছোট দ্বীপেও বালিনীজদের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হবার বিকল্প ছিল না। আমাদের যিনি নিতে আসবেন সেই গাইড কাম ড্রাইভারের বিলম্বে হকচকিয়ে যাওয়াকে মুহূর্তে ভুলিয়ে দিয়েছিলেন অপূর্ব লাস্যময়ী সুন্দরী এয়ারপোর্ট কর্মী। আগ বাড়িয়ে হোটেল বুকিংয়ের কাগজপত্র দেখে নিয়ে ফোন করে জানিয়ে ছিলেন সব ঠিকঠাক, ড্রাইভারটি এসে পড়ল বলে। আমাদের একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরটি এখন আর আগের মত দরিদ্র বেশ বা মলিন ভূষণে নেই, তার গায়েও লেগেছে আধুনিকায়নের হাওয়া। সবচে বেশি পুলকিত হই, পাসপোর্ট ভিসা বা অন্যান্য কাগজপত্র নিয়ে আগের মত খোঁচাখুঁচি বা ছুত্বাই নেই বলে। দু’তিন মিনিটে কাজ সেরে গন্তব্যে পা বাড়ানোই এখন রীতি হয়ে গেছে। এই জন্য প্রশংসা বা ধন্যবাদ তারা পেতেই পারেন। গোল বাঁধে লাইনে দাঁড়ানো বা মালপত্র নিয়ে বেরুনোর সময় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও ভিআইপি মর্যাদা দেয়ার নামে অন্যায় অব্যবস্থায়। কোন দেশে, কোন জাতিতে, কোন বিমান বন্দরে এত ভিআইপি বা কথিত গুরুত্বপূর্ণ যাত্রী সামলানোর রেওয়াজ চোখে পড়ে না। সারাপথ জুড়ে দেশ ও জাতির পজেটিভ গল্প, বদলে যাওয়া বাংলাদেশের কথা বলতে বলতে আসা ফরাসী সহযাত্রীটির চোখে মুহূর্তে ম্লান হয়ে যাওয়া ভাবমূর্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায় দেশজ ভিআইপি’র উত্পাত। লাইনের মধ্যভাগ বা পেছন থেকে টপাটপ তুলে নিয়ে যাওয়া ঐ মানুষগুলোকে হঠাত্ উধাও হয়ে যেতে দেখে বিদেশিরা ভড়কে যায়। নাম ধরে ডেকে নিয়ে যাওয়া, এগিয়ে এসে করমর্দন করে নিয়ে যাওয়া বা সেলাম ঠুকে হাতের পাসপোর্টটি ছোঁ মেরে নিয়ে যাওয়ার এমন অসভ্য রীতি পৃথিবীর খুব কম দেশেই দেখতে পাওয়া যায়। এঁরা সাত, দশ, আঠার বা বিশ ঘন্টা বিমানে বসে থাকার ধৈর্য রাখলেও ঢাকায় নেমে দশ মিনিট অপেক্ষা করতে নারাজ। এটা সময়ের জন্য যতটা তারচে অধিক নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করার অপচেষ্টা। রাত নয়টা বা দশটায় যে বিমানটি ঢাকা এসে নামে তার যাত্রীর না আছে দুঃসহ যানজটের উদ্বেগ, না কোন জরুরি মিটিং বা এজেন্ডা ফেল করার দুঃস্বপ্ন। তারপরও তিনি লাইনে থাকবেন না। থাকলে তার প্রেস্টিজে লাগে। ফলে দেশ, জাতি ও এয়ারপোর্টের ভাবমূর্তির বারোটা বাজিয়ে হলেও তাকে আগে যেতে হবে। বলাবাহুল্য এর পৃষ্ঠপোষক রাজনীতি, সরকারি ও বিরোধী দলের নামে গজিয়ে ওঠা মাফিয়া চক্রই এর পেছনে সক্রিয়। আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকার মাফিয়া আক্রান্ত দেশের মত ওয়াকিটকির অস্পষ্ট উচ্চারণে হাই, হ্যালো, আধা ভাঙ্গা ইংরেজির অস্পষ্ট কণ্ঠস্বরের দাপটে লাইনচ্যুত যাত্রীর বৈতরণী পারের পেছনে আছে আওয়ামী সাংসদ, মন্ত্রী বা ক্ষমতার দাপট। বিরোধী দলীয় নেতা-নেত্রীরাও কম যায় না। তাদের ফোন কল, হম্বিতম্বি, ‘সামনের বারে দেইখ্যা নিমু’র ভয়ে কম্পিত বিমান বন্দর কর্মচারীরা তথাকথিত ভিআইপি’দের আনাগোনার পথ সহজ করে দেন। খবর নিলে জানা যাবে যিনি গেলেন তিনি কোন ইলেকট্রিক বা কম্পিউটার ব্যবসার মধ্যস্বত্বভোগী, কোন মফস্বলীয় নেতা অথবা এশিয়ার দেশে দেশে ঘুরে কাপড় অথবা প্রসাধনী ব্যবসার এজেন্ট, তারপরও ক্ষমতা বলে কথা। এ প্রক্রিয়া বাংলাদেশের ক্লিন ইমেজ ও এয়ারপোর্ট ভাবমূর্তির স্বার্থেই বন্ধ হওয়া জরুরি। এ প্রক্রিয়া বা দৌরাত্ম্য ক্ষমতাবান ও রাজনীতিবিদদের কোথায় এনে দাঁড় করিয়েছে তা তারা নিজেরাও আঁচ করতে পারছেন না। তিন হপ্তার দেশ সফরে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা ভ্রমণকালে একই বিমানে চড়ে ছিলেন এক মন্ত্রী। একজন প্রাক্তন ও বর্তমানে দপ্তরহীন মন্ত্রী ও জাঁদরেল সাংসদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, রাশেদ খান মেনন ও দীপংকর বাবুকে একজন যাত্রীও সম্মান জানিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বা হাত বাড়িয়ে সম্ভাষণ জানায়নি। তারা অনেকটা এবিএম মূসার ভাষায় চোরের মত উঠে নীরবেই নেমে গিয়েছিলেন। বিমান বন্দরের তথাকথিত সব ভিআইপি’ই এই পরিণামের দিকে এগুচ্ছেন। হায় তারা যদি তা জানতেন! সিডনি থেকে dasguptajoy@hotmail.com