কর সংগ্রহ বাড়াইয়া ব্যাংক ব্যবস্থা হইতে ধার কমান
প্রকাশ : ১৯ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:২৮
ব্যাংকিং খাত হইতে সরকারের নেওয়া ঋণ রেকর্ড ছাড়াইয়াছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এই ঋণের স্থিতি দেখাইয়াছে ১ লক্ষ ১ হাজার ২১৫ কোটি টাকা। এই পরিমাণের অতিসামান্যই করা হইয়াছে বর্তমান অর্থ বত্সরে। অবশ্য বর্তমান অর্থ বত্সরের বেশিরভাগটাই রহিয়া গিয়াছে। এবং সাধারণত বত্সরের শেষের দিকে ব্যাংকিং খাত হইতে সরকারের ঋণ বাড়িতে থাকে। তবে ব্যাংকিং খাত হইতে সরকারের ঋণের পরিমাণ কমানোর জন্যে অব্যাহত চাপ রহিয়াছে বিভিন্ন মহল হইতে। তাহার পরেও এই ঋণের পরিমাণ একেবারে বর্ধিত হারে বাড়িতেছে। প্রশ্ন হইলো, সরকার এই খাত হইতে ধার-দেনা না করিয়া অন্য আরও কোন বিকল্প হইতে অর্থসংস্থান করিতে পারে কি? দৃশ্যত মনে হইতেছে, চেষ্টা সত্ত্বেও সরকার সফল হইতেছে না এই বিকল্পের ক্ষেত্র অনুসন্ধানে।
ধার না করিলে কি হয়? ধার না করিলে সরকারের উন্নয়ন বাজেট, যাহার ষাট ভাগ অভ্যন্তরীণ খাত হইতে ধারের উপর নির্ভরশীল, তাহা থামিয়া যায়। অন্যদিকে, উন্নয়ন বাজেটের বাকি চল্লিশ ভাগ, যাহা বৈদেশিক উত্স হইতে আসার কথা, তাহার ক্ষেত্রে দারুণ রকমের ব্যর্থতা পরিলক্ষিত হইতেছে। ফলে রাজস্ব আয় যেহেতু পুরোপুরিভাবে খরচ হইয়া যাইতেছে তাই সরকারের রুটিন খরচ মিটাইতে উন্নয়নের জন্যে অর্থের যোগান রাজস্ব আয়ের বাহির হইতেই আসিতে হইবে। যেহেতু বৈদেশিক উত্স হইতে অর্থের প্রবাহ প্রয়োজনমত বাড়িতেছে না সেহেতু অভ্যন্তরীণ উত্স হইতেই তাহা করিতে হইতেছে। তবে সম্প্রতি সরকার বন্ড বিক্রির মাধ্যমে ডলার সংগ্রহের যে স্কীম হাতে নিয়াছেন তাহা খানিকটা সুবিধা দিতে পারে অর্থায়নের ক্ষেত্রে। ইহাতে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ঋণের বোঝা বাড়িবে তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। তবে ধারকৃত ডলারের সঠিক বিনিয়োগ হইলে তাহার সুবিধা পরবর্তী প্রজন্মও পাইবে। আর যদি অদক্ষতা বা দুর্নীতির কারণে অপচয় হইয়া যায়, তবে সুবিধা পাইবে কতিপয় মানুষ আর বোঝা বহিতে হইবে সমগ্র জাতিকে। সমগ্র পরবর্তী প্রজন্মকে।
তবে একটা বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার। তাহা হইলো, কেন উন্নয়ন বাজেট পুরোপুরি ঋণনির্ভর হইয়া গিয়াছে। অথবা কেন রাজস্ব বাজেটের ব্যয় বহন করিতে গিয়া আমাদের রাজস্ব আয়ের পুরোটাই শেষ হইয়া যাইতেছে। আয় কম বলিবে, নাকি ব্যয় বেশি বলিবে। আসলে দুইটাই সত্য বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। বর্ধনশীল জনসংখ্যার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন বিভাগের ক্ষমতা বাড়াইতে গিয়া খরচ বাড়িতেছে। অন্যদিকে, জিডিপির অনুপাতে কর-আয় হিসাব করিলে তাহার পরিমাণ সেই অর্থে বাড়িতেছে না। সরকারের দিক হইতে কর-আয় বাড়ানোর নানাবিধ প্রচেষ্টা থাকিলেও তাহা কার্যকর হইতেছে না। আরেকটা কারণ কর-আয় পর্যাপ্ত না বাড়িবার। তাহা হইলো বিশ্বায়নের ফলে যে বাণিজ্য উদারীকরণ হইয়াছে তাহার কারণে বাণিজ্যশুল্ক হইতে আদায়কৃত করের পরিমাণ আনুপাতিক হারে না বাড়া। দাতা সংস্থাগুলির ধারণা ছিলো মূল্য সংযোজন কর সংযোজনের ফলে বাণিজ্য শুল্ক হইতে কম করের ঘাটতি পুষাইয়া যাইবে। কিন্তু বাস্তবে তাহা ঘটেনি। ইহা শুধু বাংলাদেশের বেলায় ঘটিয়াছে তাহা নয়, উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশের ক্ষেত্রেই সরকারের ব্যাংকিং খাত হইতে ঋণের বোঝার পরিমাণ ছাড়াইয়া যাওয়ার প্রমাণ মিলিয়াছে। গত কয়েক বত্সর আগে ব্যাংকে অতিরিক্ত তারল্য অলস পড়িয়া থাকিবার কারণ দেখাইয়া সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংকের আমানতের সুদের হার কমানো হইয়াছিল। মানুষের শেয়ারবাজার-মুখী হওয়ার এটাও একটা কারণ ছিল। ইহাতে ঐ সময়ে সুদের হার কমানোর ভিতরের কারণ ছিল সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের উপর যে সুদ দিতে হয় তাহার বোঝা কমানো। অতএব অভ্যন্তরীণভাবে ব্যাংকিং খাত হইতে ঋণের বোঝা না কমাইতে পারিলে নিকট-ভবিষ্যতে সরকার বাধ্য হইয়া অন্যান্য ভুল পলিসি নিয়া ভুল পথে চলিলে আরও সমস্যায় পড়িতে পারে।