নিরাপদ কর্মক্ষেত্র ও সচেতনতা

গত এক দশকে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়িয়াছে। বিশেষত শিল্প-কল-কারখানায় এ ধরনের অপ্রত্যাশিত ঘটনায় শ্রমিকের হতাহতের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ইহার সপক্ষে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) পরিসংখ্যান তুলিয়া ধরা হইয়াছে। তাহাতে দেখা যায়, ২০০১ সালে কর্মক্ষেত্রে নিহত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৩০১ জন। দশ বত্সর পর ২০১১ সালে এক বত্সরে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৭৯ জনে। আর এই বত্সর জুন নাগাদ মাত্র ছয় মাসে নিহত হইয়াছে ৭০৪ জন শ্রমিক। সংগত কারণেই সম্প্রতি সাভারের তাজরিন গার্মেন্টসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত এক শতাধিক শ্রমিক এই তালিকাভুক্ত হন নাই। তাহার পরও এমন একটি চিত্র পাওয়া যায়, যাহা আমাদেরকে বিচলিত না করিয়া পারে না। এখানে নিহতের পাশাপাশি আহতের সংখ্যাও বিবেচনায় আনা দরকার। শুধু ২০১১ সালে এই ধরনের দুর্ঘটনায় আহত হইয়া পঙ্গুত্ব বরণ করিয়াছে এক হাজার ২৩৫ জন শ্রমিক। ইহাও বেদনাদায়ক ও মর্মান্তিক। সাধারণত এসব পরিসংখ্যান পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের উপর ভিত্তি করিয়া সংগৃহীত। ইহার বাহিরেও দুর্ঘটনা ঘটিয়া থাকিতে পারে। অন্যদিকে দুর্ঘটনা যে শুধু অগ্নিকাণ্ডের কারণে হয়, তাহাও নহে। গ্যাস লাইন ফাটিয়া আগুন লাগিয়া যাওয়া, ত্রুটিপূর্ণ বা ঝুলন্ত তারের সংস্পর্শে বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হওয়া, প্রয়োজনীয় সুরক্ষা না থাকায় উঁচু স্থানে কাজ করিতে গিয়া পড়িয়া যাওয়া, নির্মাণ ত্রুটির কারণে ভবন ধস, মেয়াদোত্তীর্ণ বয়লার বিস্ফোরণ, রাসায়নিক বিস্ফোরণ বা বিষাক্ত গ্যাসে দম বন্ধ হইয়া যাওয়া, পুরাতন ও অনিরাপদ যন্ত্রপাতির ব্যবহার, অপর্যাপ্ত বিশ্রাম ইত্যাদি কারণে শ্রমিকরা তাত্ক্ষণিক বা দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির শিকার হইয়া থাকে। জাহাজভাঙ্গা শিল্পে বুটজুতা কিংবা ওয়েল্ডিং কারখানায় সেফটি গ্লাস না থাকায় দুর্ঘটনার কবলে নিপতিত হয় বহু শ্রমিক। আবার কেহ কেহ বিভিন্ন রাসায়নিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় রোগাক্রান্ত হইয়া পড়ে। কিন্তু তাহাদের চিকিত্সা বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না থাকায় ভোগান্তি আরও বাড়ে। এইসব কথা মাথায় রাখিয়া বলা যায়, কর্মক্ষেত্র নিরাপদ রাখা ও কাজের পরিবেশের উন্নতির কোন বিকল্প নাই। অবশ্য শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারাবিশ্বেই দুর্ঘটনায় শ্রমিক হতাহতের সংখ্যা বাড়িতেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর হিসাব অনুযায়ী প্রতি বত্সর ২০ লক্ষ শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে কোন না কোন দুর্ঘটনার শিকার হইয়া মৃত্যুবরণ করেন। আহত হইয়া পঙ্গুত্ব বরণ ও কর্মহীন হইয়া পড়েন ১২ লক্ষ শ্রমিক। আর পেশাগত কারণে রোগে আক্রান্ত হন ১৬ কোটিরও বেশি শ্রমিক। এইভাবে দেখা যাইতেছে, এই সমস্যা কমবেশি সব দেশেই আছে। তবে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও অন্যান্য কারণে তৃতীয় বিশ্বের গরীব দেশের সমস্যা মোকাবিলার সক্ষমতা কম। বস্তুত অনিরাপদ কর্মক্ষেত্রের জন্য শুধু মালিকপক্ষকে দায়ী করা যায় না। কাজের পরিবেশ সুন্দর ও নিরাপদ রাখার বিষয়টি শ্রম আইনের মধ্যেই পড়ে। কর্তৃপক্ষ ইহা এড়াইয়া যাইতে পারেন না। তবে এক্ষেত্রে একতরফা দোষারোপের কোন অবকাশ নাই। কেননা এক্ষেত্রে শ্রমিকদেরও অধিকার সচেতনতার প্রয়োজন রহিয়াছে। আমাদের দেশে ইহারই বড় অভাব। সাধারণত এ দেশে দেখা যায়, শ্রমিক বা ইউনিয়ন নেতারা বেতন-ভাতা বাড়ানোর জন্য যতটা সোচ্চার, কর্মপরিবেশের উন্নতি বিধানে ততটা তত্পর নন। এই পরিস্থিতি হইতে উত্তরণে উভয়পক্ষের আন্তরিকতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা একান্ত দরকার। অফিস বা কর্মক্ষেত্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ রাখিতে শ্রমিকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিতে হইবে। সকলের সচেতনতাই কেবল দুর্ঘটনা রোধ করিতে পারে। আবার দুর্ঘটনা-উত্তর সুচিকিত্সা ও পুনর্বাসনেরও যথাযথ ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।