আঞ্চলিক শক্তির উত্থান এবং ক্ষয়িষ্ণু সর্বভারতীয় রাজনীতি

এই শতাব্দীর প্রথম থেকেই শুরু। ২০০২ সালে সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ এবং বিজেপির নেতৃত্বে এনডিএ যাত্রা শুরু করে এবং জোটবদ্ধ রাজনীতি কংগ্রেস এবং বিজেপির মত সর্বভারতীয় দলগুলোকে অনেকটা আদর্শিকভাবে সংকীর্ণ করে ফেলে যা সর্বভারতীয় রাজনীতিতে নয়া মেরুকরণের জন্ম দেয়। এরপর থেকে ক্রমাগত কংগ্রেস এবং বিজেপির দুর্বলতাকে পুঁজি করে আঞ্চলিক দলগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠে যা সরকার গঠনে তাদের অপরিহার্যতাকে সামনে নিয়ে আসে। যদিও প্রথম মেয়াদে জোট সরকার ভালোই সময় পার করে কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে শুরু থেকেই হোঁচট খেতে শুরু করে। বিশেষ করে তামিলনাড়ুতে ডিএমকের পতন এবং পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থান কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারকে খানিকটা দুর্বল করে ফেলে। প্রথম দফায় পুরো দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোতে আঞ্চলিক দলগুলো জোর কদম ফেলে। বিধানসভার ৭০ শতাংশ আসনের প্রতিনিধিত্ব করছে আঞ্চলিক দলগুলো। তামিল জাতীয়তাবাদীদের প্রবল দাপটে দক্ষিণে বলতে গেলে কোণঠাসা উত্তরের বেশধারী এবং সর্বভারতীয় কংগ্রেস এবং বিজেপি। দ্বিতীয় দফায় পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জীর হাত ধরে ৩৪ বছরের বাম দুর্গের পতন তৃণমূলকে অদ্বিতীয় আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করে। তৃণমূল ক্রমশ হাত বাড়ায় পূর্বাঞ্চলীয় আসাম, মনিপুর, মেঘালয়ের দিকে। একটি পূর্বাঞ্চলীয় মুখ্যমন্ত্রীদের ফ্রন্ট খুলে রীতিমত কেন্দ্রকে ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলেন ভদ্রমহিলা। তৃতীয় দফায় ভারতের সবচেয়ে জনবহুল এবং রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ উত্তর প্রদেশে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের এবং মূলায়ম সিং যাদবের নেতৃত্বে সমাজবাদী পার্টির বিপুল বিজয় উত্তর প্রদেশে কংগ্রেসের আধিপত্যকে হটিয়ে আঞ্চলিক রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় যা সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলোকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। চতুর্থত, বিদেশি পুঁজির লগ্নি তথা এফডিআই নিয়ে চলমান বিতর্কে কেন্দ্রীয় সরকার থেকে তৃণমূলের সমর্থন তুলে ফেলায় বর্তমানে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বলতে গেলে সংখ্যালঘু সরকারে পরিণত হয়েছে। সমাজবাদী পার্টি এবং বিএসপির সমর্থনে কোর রকম টিকে আছে কংগ্রেস সরকার অর্থাত্ এই দুটি আঞ্চলিক দল সমর্থন সরালেই পতন ঘটবে কেন্দ্রীয় সরকারের। লাঠি এখন আঞ্চলিক শক্তির হাতে। সর্বশেষ উগ্র ডানপন্থী এবং মারাঠি জাতীয়তাবাদী শিবসেনা দলের সুপ্রিমো বালঠাকরের মৃত্যুর পর মুম্বাই কেন্দ্রিক পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি সংকীর্ণ রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দক্ষিণ ভারতবিদ্বেষী এবং বর্তমানে কট্টর ইসলাম বিদ্বেষী এই দলটি আগামীতে মহারাষ্ট্র তথা মুম্বাইয়ের মত এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে- বিশ্লেষকদের এই অভিমত বলতে গেলে অঘোষিতভাবে প্রদর্শিতও হলো গত সপ্তাহে। ভারতীয় রাজনীতির এ নতুন মেরুকরণ দেশটির আঞ্চলিক অখণ্ডতা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং সর্বোপরি ভারতীয় রাজনৈতিক ধারাকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দিয়েছে যা বস্তুত ভারত রাষ্ট্রের আদর্শিক এবং ঐক্যবদ্ধ চিন্তাধারার পরিপন্থী। কেন্দ্রীয় সরকারের একের পর এক দুর্নীতি, মন্ত্রীদের অর্থ কেলেংকারি এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা কংগ্রেসের মতো ঐতিহ্যবাহী দলগুলোকে ভয়াবহ সংকটের মুখে ফেলে দিয়েছে এবং এই সংকট শুধু কংগ্রেসের নয় বরং সর্বভারতীয় রাজনীতির ক্রান্তিলগ্ন বললেই চলে। আঞ্চলিক দলগুলো যেভাবে আঞ্চলিক ইস্যুগুলোকে পুঁজি করছে তা রাষ্ট্রের মূল দর্শন এমনকি পররাষ্ট্রনীতির মতো মৌলিক বিষয়কেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। তৃণমূল কংগ্রেসের গোড়ামির কারণে তিস্তা চুক্তি না হওয়ায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ‘অসম গণ পরিষদ’-এর মতো উগ্র আসামী জাতীয়তাবাদী দলগুলোর কারণে উত্তর-পূর্ব ভারতে একটি ভয়াবহ বাংলাদেশ বিরোধী প্রপাগাণ্ডা চলছে এবং সাম্প্রতিক চলমান বোড়ো-মুসলিম দাঙ্গায় অহেতুক বাংলাদেশকে জড়িয়ে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। তামিল জাতীয়তাবাদী দলগুলোর কারণে শ্রীলংকার সাথে সম্পর্কে ভারত সরকার স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। কিছুদিন আগেই আসামের দাঙ্গা চলাকালীন সময়ে মিডিয়ার ভূমিকার সমালোচনা করতে গিয়ে খোদ কংগ্রেসেরই মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ বলেছেন পূর্বের মানুষদের মূল ভারত এখনো আলাদাভাবেই দেখে। আর রাষ্ট্রপ্রতি পদে মেঘালয়ের সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর পরাজয় পূর্বাঞ্চলের মানুষকে আবারো ভিন্ন জাতিসত্তা হিসেবে মেলে ধরেছে। এই আঞ্চলিক বৈষম্য বিভেদের রাজনীতি উগ্র আঞ্চলিকতার ফলস্বরূপ ক্রমাগত আঞ্চলিক দলগুলোর হাতে জিম্মি হয়ে যাচ্ছে সর্বভারতীয় দলগুলো। সাথে সাথে ধর্মীয় উগ্রপন্থী এবং শিবসেনা ও আকালীর মতো দলগুলোর ভয়াবহ উত্থান আধুনিক ভারতের চেহারায় কালিমা লেপন করছে। নিখিল ভারতীয় রাজনৈতিক দর্শন আজ হুমকির মুখে, বলতে গেলে ক্রমশ বিলীন হয়ে পড়ছে। এমতাবস্থায় একটি উদীয়মান পরাশক্তি কিভাবে এই বহুত্ববাদ এবং আঞ্চলিকতাকে প্রশ্রয় দিয়ে জাতীয় পরিচয় বিনির্মাণে যে লড়াই করবে তা যথেষ্ট প্রশ্নসাপেক্ষ, তবে প্রতিবেশীর এ লড়াই দেখার জন্য মোটেও মন্দ হবে না। লেখক :শিক্ষার্থী, এমএসএস, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা