‘কে লইবে মোর কার্য, কহে সন্ধ্যারবি’
প্রকাশ : ২১ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৩৩
জনগণের শেষ আশ্রয়স্থল হইল বিচার বিভাগ। জেলা জজদের উদ্দেশ্যে এই কথা বলেন প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন। এই প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন যে, এখনও বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস রহিয়াছে বলিয়াই তিনি মনে করেন। তাঁহার এই বক্তব্য হইতে প্রতীয়মান হয় যে, বিচার বিভাগের ওপর দেশবাসীর কতটুকু আস্থা অবশিষ্ট আছে তাহা লইয়া তিনি নিঃসংশয় নহেন। এই নিয়া আমাদের কোনো মন্তব্য করা বোধহয় সমীচীন হইবে না। তবে মাননীয় প্রধান বিচারপতি নিজেই বলিয়াছেন, ‘দুঃখের সঙ্গে আমাকে বলতে হচ্ছে যে, কতিপয় জেলা জজের সচেতনতা ও দায়িত্ববোধের অভাবে ইদানিং কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনা কয়েকটি জজশিপে ও ম্যাজিস্ট্রেসিতে ঘটেছে যা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমি আশা করবো, এখন থেকে প্রত্যেক জেলা জজ নিজস্ব জজশিপে যাতে অপ্রত্যাশিত ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে সচেতন থাকবেন।’ তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে ইহাও বলেন যে, জনগণের যে বিশ্বাস ও আস্থা রহিয়াছে, তাহাকে ভূলুণ্ঠিত হইতে দেওয়া যায় না । তিনি এইসব কথা বলেন গত বুধবার সুপ্রিমকোর্ট আয়োজিত জেলা জজ ও সমপদমর্যাদার বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের এক মতবিনিময় সভায়। তাঁহার এই পর্যবেক্ষণ ও আহ্বানের গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা অনস্বীকার্য।
আমরা এমন এক সময়ের পথে হাঁটিয়া চলিয়াছি যখন আস্থার সংকট পদে পদে। কোথাও কাহারও বিশ্বাস নাই, আছে শুধু সন্দেহ-সংশয়। আমরা স্বাধীনতা পাইয়াছি, আমাদের আছে গৌরবের পতাকা, আছে সংবিধান। আইন ও বিধি- বিধানেরও আমাদের কোন অভাব নাই। তবুও দেশের মানুষ ভরসা পান না সহজে কোথাও। নিয়ম-নীতির মধ্যে থাকিয়া কোথাও কোনও কাজ হইতে পারে এইকালে যেন তাহা এক অবিশ্বাস্য কল্পনা। প্রত্যন্ত পল্লীর হতদরিদ্র মানুষটি হইতে শুরু করিয়া রাজধানীর অভিজাত নাগরিক পর্যন্ত— এমন কাহাকেও খুঁজিয়া পাওয়া দুরূহ যিনি নির্দ্বিধায় বলিতে পারেন যে, সোজা কাজটি সোজা পথে হইয়া যাইবে। সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত কিংবা সাংবিধানিক এমন কোনও প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার কথা কি আমরা বলিতে পারি, যাহার উপর পুরোপুরি বিশ্বাস রাখা যায়! সংবিধান যেইসব প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনভাবে নিজ কর্তব্য পালন করিয়া যাইবার অধিকার দিয়াছে, সেইসব প্রতিষ্ঠানও কি সর্বক্ষেত্রে ন্যায়ের ঝান্ডা সমুন্নত রাখিতে পারিয়াছে? যাহারা দায়িত্বশীল, তাহাদের কেহ কি কখনও এইরূপ প্রমাণ দিতে পারিয়াছেন যে, নিয়ম-নীতির প্রশ্নে তিনি অবিচল! বলিতে দ্বিধা করা উচিত নয় যে, স্বাধীনতা-উত্তর চার দশকের ইতিহাসে এইরূপ মহত্ দৃষ্টান্ত বিরল। এমতাবস্থায় সমাজে কে কাহার উপর বিশ্বাস রাখিতে পারে! আস্থার সংকট প্রকট হইয়া দেখা দেওয়াই তো স্বাভাবিক।
দেশ-কালের সর্বত্র, উপর হইতে নিচ পর্যন্ত আস্থার জায়গাগুলি যেখানে নড়বড়ে হইয়া গিয়াছে, সেইখানে কোনো একটি জায়গায় আস্থা স্থাপন করা প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার। গ্রামের পাঠশালা হইতে শুরু করিয়া সচিবালয়, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিচারালয় কোনও কিছুই বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। আলাদা করিয়া বিশোধন সম্ভব নয়। এমনটি সম্ভব কেবলই কল্পনায়, যেমন কিনা সম্ভব করিয়া তুলিয়াছিলেন টমাস মুর তাঁহার ইউটোপিয়া গ্রন্থে। ইউটোপিয়া মানে ’নো হোয়ার’ অর্থাত্ কোথাও নাই, আছে শুধু কল্পনায়। বাস্তবে এইরকমটি হইবার নয়। তথাপি, অসম্ভব জানিয়াও মহত্ কিছু আশা করিতে দোষ নাই। সব আলো নিভিয়া গেলেও কোথাও না কোথাও পিদিম জ্বলে বৈকি! সামান্য হইলেও সে আলো দিতে পারে নিশ্চয়। এইখানে পাঠ করা যাইতে পারে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কণিকা কাব্যগ্রন্থের ‘কর্তব্য গ্রহণ’ ‘শিরোনামের সেই ছোট কবিতাখানি’ কে লইবে মোর কার্য, কহে সন্ধ্যারবি, শুনিয়া জগত্ রহে নিরুত্তর ছবি। মাটির প্রদীপ ছিল, সে কহিল, স্বামী, আমার যেটুকু সাধ্য, করিব তা আমি।’