রাজনীতি এবং ভবিষ্যত্ ভাবনা

বাংলাদেশে রাজনীতির মাঠে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস কারো অজানা নয়। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তানিদের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং স্বাধীনতার পর স্বৈর-শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সীমাহীন রক্তঝরা ইতিহাস সমৃদ্ধ বাংলাদেশকে চিনেছে বিশ্ববাসী। বাঙালি বীরের জাতি হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছে বটে। এতকিছুর পরও বালাদেশে সুস্থ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেনি। নেতৃত্বের দূরদর্শিতার অভাবে আশির দশক থেকেই টাকাওয়ালা অসত্ ব্যক্তিদের কাছে রাজনীতি বন্দী হয়ে আছে। সেই সাথে গণতন্ত্রও বন্দী আমলাতন্ত্রের হাতে। তাই রাজনীতির সকল গৌরবময় ইতিহাস গুরুত্ব হারাতে বসেছে। শিক্ষিত, সত্ ও দেশপ্রেমিক মানুষ রাজনীতির অঙ্গন থেকে অনেকটাই নির্বাসিত। তাদের এই নির্বাসনে যোগ্য উত্তরসূরির অভাব প্রকট হতে চলেছে। সেই বৃটিশ আমল থেকে রাজনৈতিক ধারাবাহিক পথে কত জ্ঞানী-গুণী দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব দৃশ্যমান ছিল এই উপমহাদেশে। সেইসব কীর্তিমান বরেণ্য রাজনীতিবিদদের কোন কলংক ছিল না। অতি সাদামাটা জীবন-যাপনে অভ্যস্ত কেউ বিস্তর টাকার মালিক ছিলেন না। মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন আদর্শের রাজনীতি করে যতটা পেরেছেন দিয়েছেন জনগণকে। আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবতো একটি জাতি ও দেশই উপহার দিয়ে গেলেন। এ সব মহান নেতাদের অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গেই সকলে স্মরণ করলেও তাদের আদর্শ থেকে সরে আসায় চলমান রাজনীতির এমন ভগ্নদশা দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করছে। উত্তরাধিকার সূত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্বে আসীন হওয়া বড় দুই দলের দুই নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার রাষ্ট্র পরিচালনায় অভিজ্ঞতা রয়েছে। খালেদা জিয়া দুইবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন পূর্ণ মেয়াদে আর একবার কয়েকদিনের জন্যে। শেখ হাসিনা প্রথম দফা পাঁচ বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। দ্বিতীয় দফা বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে এই দুই নেত্রীর ভূমিকা খাটো করে দেখার উপায় নেই। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে যে, সাংঘর্ষিক রাজনীতি থেকে মুক্ত হবার কোন সুযোগ আপাত দৃষ্টিতে নেই। প্রধান দুটি বড় রাজনৈতিক দলে অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকট। তাছাড়া সরকারি জোট ও বিরোধী জোটে পরস্পরে বিপরীতমুখী অবস্থানে সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। আওয়ামী লীগ বিএনপি এই দুটো রাজনৈতিক দলের ওপর এখনও মানুষের ভরসা রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক অসুস্থ সংস্কৃতির পরিবর্তন না হলে নির্ভরতার জায়গা আর থাকবে না। বামপন্থী তথা অন্যান্য রাজনৈতিক দলে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব থাকলেও ব্যাপক জনগোষ্ঠীর সমর্থন তাদের প্রতি নেই। যদিও তাদেরকে মানুষ ভালবাসে এবং ভাল চোখে দেখে। তবে বামপন্থীদের রাজনৈতিক দর্শন উপস্থাপনায় কৌশলগত দুর্বলতা রয়েছে। সাধারণ মানুষ তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে এখনও সক্ষম হয়ে উঠেনি। তাই রাজনৈতিক বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে এমন ভাবনা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে যে, হাসিনা, খালেদার পর কে দেবে জাতির নেতৃত্ব? প্রধান এই দুটি দলের ভবিষ্যত্ নেতৃত্ব গড়ে উঠবার কোন সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছে না। ছাত্র, যুবক ও তরুণদের মধ্য থেকেই নেতৃত্ব গড়ে উঠবে, কিন্তু এই দুটি দলের ভেতর নেতৃত্ব তৈরি করার প্রচেষ্টার লক্ষণ নেই। দলগুলোর মধ্যে নিয়ম-নীতি কিংবা গঠনতন্ত্র মোতাবেক কাউন্সিল হয় না- যদিও বা হয় কর্মীদের চাহিদা ও অনুভূতিকে উপেক্ষা করে কমিটি করা হয়। যে কারণে যোগ্য ব্যক্তিত্ব নেতৃত্বে আসীন হতে পারেন না। একথা অনস্বীকার্য যে, রাজনৈতিক অস্থিরতার ভেতর দিয়েও বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে ধীরলয়ে। যদি দুর্নীতি ও মাস্তানবাজি মুক্ত শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হতো তবে দেশ আরও অগ্রসর হতো। সুশাসনের জন্যে যোগ্য নেতৃত্ব অপরিহার্য। বাংলাদেশ নিয়ে বিদেশি বন্ধুদের যথেষ্ট আগ্রহ দেখা যাচ্ছে, তাদের আগ্রহ দেখে রাজনৈতিক নেতৃত্ব অনুগ্রহ পাবার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তাদের প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করে বন্ধু দেশের ঝানু কূটনীতিকগণ নেতাদের নিজ বাড়িতে ডেকে নিয়ে খানাপিনা করাচ্ছে নিয়মিত। নেতাদের প্রতি কূটনীতিকদের আদর-যত্ন দেখে মনে হচ্ছে বাংলাদেশ ছোট হলেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশে নিযুক্ত একজন প্রভাবশালী কূটনীতিক তো বাংলাদেশকে আগামীদিনের অর্থনৈতিক ব্র্যাঘ্র হিসেবেই আখ্যায়িত করেছেন। বাঘ নয় এ বাঘ হবে অর্থনৈতিক বাঘ। বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক বাঘ বলার জন্যে রাজনৈতিক নেতারা তো মহাখুশি তবে জনগণ ততখুশি বলে মনে হয় না। কেননা এদেশ প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর হলেও তাতে সাধারণ মানুষের কোন লাভ হবে না তা তারা ভাল করেই জানে। এক শ্রেণীর মানুষ মোটা দাগে বড়লোক হবে। ভবিষ্যতে যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে দেশের সম্পদ চলে যাবে ভিনদেশিদের নিয়ন্ত্রণে। আফ্রিকা মহাদেশের অনেক দেশ আছে যে দেশগুলোতে রয়েছে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ। সম্পদের ঐশ্বর্যশালী ঐসব দেশের কৃষ্ণবর্ণের মানুষ দেখে কেউ কী বলবে ওদের সম্পদ বলতে কিছু আছে? উগান্ডা, পূর্ব তিমুর, কম্বোডিয়া, ক্যামেরুন, টোবাগো ত্রিনিদাদ, টেগো-এরূপ অনেক দেশ আছে যে দেশগুলো প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। কিন্তু তারা কী নিজ দেশের সম্পদ ভোগ করতে পারছে? কেবল যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে ঐ সব দেশের সাধারণ মানুষের কঙ্কালসার মুখগুলো আমরা টেলিভিশনে লক্ষ্য করি। ঐ কঙ্কালসার মানুষ নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য হয়। বিশেষ একটি শ্রেণীকে ম্যানেজ করে ঔপনিবেশিক শক্তি ভাগ-যোগ করে খাচ্ছে মূল্যবান সম্পদ। কাজেই দেশে যদি নেতৃত্বের যোগ্য উত্তরসূরি তৈরি না হয় তবে মধ্যম আয়ের দেশ হবে ঠিকই কিন্তু সাধারণ মানুষ হয়ে পড়বে রিক্ত, নিঃস্ব, কামলাখাটা। নীতিবোধ সম্পন্ন ন্যায়পরায়ণ দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক চেতনা লালনকারী নেতা তৈরি হলে বিদেশি বন্ধুরা সত্যিকারের মর্যাদা দিবে। এসব দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক নেতারা কখনো আজ্ঞাবাহী হন না। যেমনটি ছিলেন আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অযোগ্য মেধাহীনরা পরের প্রশংসা বাক্যে নেচে উঠে। কিন্তু ঐ প্রশংসা যে পামপট্টি তা বোঝার শক্তিও তাদের নেই। আমাদের দেশে বিভিন্ন স্তরে সভ্যতা বিবর্জিত নানারকম কর্মকাণ্ডে জড়িতরাই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের আসনে বসে আছে। এদের দিয়ে জাতির কী প্রত্যাশা পূরণ হবে? কাজেই সবকিছু মাথায় রেখে শীর্ষ নেতৃত্বকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে কীভাবে যোগ্য উত্তরসূরি তৈরি করা যায়। রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্তের কারণে দেশ থেকে মেধাও পাচার হয়ে যাচ্ছে। দেশের এই পরিস্থিতি দেখে মেধাবী ছাত্রদের রাজনীতির প্রতি রয়েছে অনীহা ভাব। সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করে মেধাবিদের রাজনীতিতে আসার পরিবেশ তৈরি করা খুবই জরুরি। মাস্তানবাজি দিয়ে সাময়িক ক্ষমতা অর্জন করা যায় বটে, কিন্তু দেশের কোন কল্যাণ হয় না। দেশের কল্যাণ না হলে সাময়িক ক্ষমতাও ভোগ করা সম্ভব হবে না। দেশ হবে পরাধীন কিংবা পরনির্ভরশীল। লেখক :মহাসচিব, বিশ্বশান্তি ও মানবাধিকার আন্দোলন বাংলাদেশ phani.sarker@gmail.com