সুস্থ থাকতে স্বাভাবিকভাবে পাকানো টমেটো খেতে চাই
প্রকাশ : ২২ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:২৯
আমাদের দেশে বিক্রি হওয়া টমেটোর অধিকাংশই আসে উত্তরাঞ্চল থেকে। এ বছর উত্তরাঞ্চলে টমেটোর ভালো ফলন হলেও খুশি হতে পারছি না। কারণ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলে কাঁচা টমেটোকে কিভাবে সেখানে লাল করা হয় তা দেখানো হচ্ছে। টমেটো ‘পাকানো’র জন্য একশ্রেণীর অসত্ ব্যবসায়ী আর্টিফিসিয়াল রাইপেনার ব্যবহার করে থাকে। এই অপবিজ্ঞানটি চালু হয়েছে বিগত প্রায় এক যুগ থেকে। তবে যত সময় যাচ্ছে ততই এর ব্যাপকতা বাড়ছে।
আর্টিফিসিয়াল রাইপেনার ব্যবহার করলে যেসব টমেটো পূর্ণতা পাওয়ার আগেই গাছ থেকে পেড়ে ফেলা হয় সেগুলো দ্রুত ও একসাথে ‘পাকানো’ যায়। কিন্তু এসব অপূর্ণাঙ্গ টমেটো পাকানোর প্রাকৃতিক নিয়মের সবগুলো পর্যায় স্বাভাবিক নিয়মে অতিক্রম করে না বলে অপূর্ণাঙ্গ টমেটোর শ্বেতসার অম্ল ইত্যাদি উপাদান প্রাণরাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে শরীরের পুষ্টি সাধনের উপযোগী উপাদানে রূপান্তরিত হতে পারে না। এসব টমেটোতে সুগন্ধ ও স্বাদও তৈরি হয় না এ কারণেই। অর্থাত্ আর্টিফিসিয়াল রাইপেনার টমেটোর শুধু রঙ তৈরি করতে পারে, টমেটোর স্বাভাবিক পুষ্টি-সুগন্ধ-স্বাদ কখনোই নয়। আর্টিফিসিয়াল রাইপেনার দিয়ে তাই আসলে টমেটো কখনোই পাকানো যায় না। এগুলো আবার বিভিন্ন পর্যায়ে প্ল্যান্ট গ্রোথ রেগুলেটর, গ্রোথ প্রমোটার, গ্রোথ হরমোন ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। এসব দিয়ে কৃত্রিমভাবে পাকানো আম কিনে ভোক্তারা তাই প্রতারিত হচ্ছেন। তারা টমেটোর পুষ্টি, সুগন্ধ বা স্বাদ কোনটাই পাচ্ছেন না। এর ফলে ভোক্তাদের শুধু অর্থেরই অপচয় হচ্ছেন তা নয়, তারা শারীরিকভাবেও ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। কিন্তু ক্রেতা-ভোক্তারা বাধ্য হয়ে কোন বিকল্প না পেয়ে এগুলো কেনে। ব্যবসায়ীরাও যখন দেখে যে, ক্রেতারা এগুলো কিনছে, এগুলো অবিক্রীত থাকে না, তখন তারাও এই কৃত্রিমভাবে পাকানোর কাজ অব্যাহত রাখে। ক্রেতা-ভোক্তাদের স্বাস্থ্য রক্ষার স্বার্থেই এই চক্র ভাঙ্গা দরকার। প্রকৃতির নিয়ম হচ্ছে পুষ্টি-স্বাদ-গন্ধ পেতে হলে টমেটোকে স্বাভাবিক নিয়মে পরিপক্ব হতে দিতে হবে। স্বাভাবিকভাবে পাকার সময় ফলের ভেতরে নানা ধরনের অসংখ্য প্রাণরাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে, যেগুলো ছাড়া পুষ্টি-স্বাদ-গন্ধ পাওয়া যাবে না। প্রকৃতির নিয়মে স্বাভাবিক যে পরিবর্তন তার প্রথম পর্যায় হলো কোষ বিভাজনের মধ্য দিয়ে টমেটো আকারে ও ওজনে বড় হতে থাকে। টমেটো পূর্ণতা না পাওয়া পর্যন্ত এই কোষ বিভাজন চলতে থাকে। কিন্তু তখনো এই পূর্ণতাপ্রাপ্ত টমেটো খাওয়ার উপযুক্ত হয় না অর্থাত্ এতে পুষ্টি-স্বাদ-গন্ধ আসে না। এর জন্য টমেটো পাকার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এই পর্যায়ে টমেটোর কোষগুলো পুনরায় প্রাণরাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে নরম ও তরল হতে থাকে, শ্বেতসার ও অম্ল অংশগুলো বিভিন্ন চিনিতে রূপান্তরিত হয়, সুগন্ধি উদ্বায়ী তেলের জন্ম হয়। একই সাথে সবুজ ক্লোরোফিলগুলো ফ্লাভনয়েডে পরিবর্তিত হয় বলে টমেটোর ত্বকে কমলা-লাল রঙের আভা দেখা দেয়। টমেটো যখন এই পর্যায়গুলো সম্পূর্ণ করে তখন এর ত্বকে চমত্কার রঙ তৈরি হয়, সেইসাথে আসে এর পূর্ণ স্বাদ ও সুগন্ধ। কেবল এই পর্যায়ে এসে টমেটোর পুষ্টিগুণ তৈরি হয়, তার আগে নয়।
কিন্তু এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ করার জন্য টমেটোকে বোঁটার মাধ্যমে গাছ থেকে প্রাণরস সরবরাহ পেতে হয়। একদিন-দু’দিনে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় না। এর জন্য কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়। নইলে ইথ্রেল, প্রফিট, রাইপেন, টমটম, ভেজেম্যাক্স, ইডেন, ওকোজিম, মেগাভিট ইত্যাদি যে নামের রাসায়নিকই ব্যবহার করা হোক না কেন তাতে টকটকে রঙ পাওয়া গেলেও এগুলোতে পুষ্টিগুণের ঘাটতি থাকে। তাছাড়া সর্বনেশে সত্যি হলো, এসব পদার্থের ক্ষতিকর উপাদান মানুষের পাকস্থলীতে সরাসরি যায় বলে এক পর্যায়ে গুরুতর অসুখে আক্রান্ত হওয়ার আশংকা রয়েছে, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী, যা বংশানুক্রমে বিস্তৃত হতে পারে। এসব ক্ষতিকর উপাদান নিয়মিত খেলে মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং স্নায়বিক বৈকল্য দেখা দেয়। প্ল্যান্ট গ্রোথ রেগুলেটর জাতীয় রাসায়নিক দ্রব্য শুধু গবেষণা কাজেই ব্যবহার করা যেতে পারে। এগুলো উত্পাদিত ফল বা সবজিতে ব্যবহার করা নিয়মবহির্ভূত। বাংলাদেশের কোনো আইনে এভাবে কেমিক্যাল দিয়ে ফল পাকানো বা বৃদ্ধির অনুমোদন নেই। এসব কেমিক্যাল বাংলাদেশে বিক্রিও আইনত বৈধ নয়। কিন্তু তবুও এগুলো বিক্রি হচ্ছে এবং এসব দেখারও যেন কেউ নেই। কিন্তু বাইরে থেকে ভোক্তা কীভাবে আসল টমেটো চিনবেন? স্বাভাবিকভাবে পাকানো টমেটোর সাথে কৃত্রিমভাবে পাকানো টমেটোর পার্থক্য হলো এগুলো পুরোপুরি লাল, কোথাও কোন তারতম্য নেই। আর লাল মানে টকটকে লাল, স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ও গাঢ় লাল। স্বাভাবিকভাবে পাকানো টমেটোর গা হবে হালকা নরম, বোঁটার কাছে সবুজ এবং হালকা সুগন্ধময়। কিন্তু কৃত্রিমভাবে পাকানো টমেটোর গা হবে শক্ত, বোঁটার কাছেও টকটকে লাল ও গা থেকে কোনো সুগন্ধ পাওয়া যাবে না। এসব লক্ষণ দেখে ভোক্তা সহজেই বুঝতে পারবেন যে, বাজারে এখন যেসব টমেটো বিক্রি হচ্ছে তার প্রায় সবই কৃত্রিমভাবে পাকানো, যেগুলোতে টমেটোর স্বাদ-গন্ধ-পুষ্টিমান কোনোটাই নেই, আছে শুধু চকচকে রঙ আর সীমাহীন স্বাস্থ্যঝুঁকি। কৃত্রিমভাবে পাকানোর রাসায়নিক ও গ্রোথ প্রমোটারগুলো তাই বিজ্ঞান নয়, অপবিজ্ঞান। এগুলো আধুনিক বিজ্ঞানের আশীর্বাদ নয়, অভিশাপ। আসুন, এর বিরুদ্ধে নিজেরা সতর্ক হই এবং সরকারকে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দাবি জানাই।
লেখক :অধ্যাপক, ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: abmfaroque@yahoo.com