বিশ্বকাপ ফুটবল কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নহে-ইহা এক বৈশ্বিক উৎসব। চার বৎসর অন্তর এই উৎসবকে কেন্দ্র করিয়া কোটি কোটি মানুষ আনন্দ, উত্তেজনা ও আবেগে একসূত্রে গাঁথা হয়। প্রযুক্তির বিকাশে এখন আর খেলা দেখিবার জন্য বসার ঘরে টেলিভিশনের সামনে বসিয়া থাকিবার প্রয়োজন হয় না-মোবাইল ফোনের পর্দাতেই বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের খেলা দেখা সম্ভব; কিন্তু সুবিধার এই নতুন যুগের অন্তরালেই লুকাইয়া রহিয়াছে এক বিপজ্জনক অন্ধকার। বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে সেই অন্ধকারেরই উদ্বেগজনক চিত্র ফুটিয়া উঠিয়াছে। প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ দেখিবার জন্য বৈধ অনলাইন প্ল্যাটফরমে সাবস্ক্রিপশন গ্রহণ করিয়াও অনেক দর্শক প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে খেলা দেখিতে পারেন নাই। তখন তাহারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে 'ফ্রি' স্ট্রিমিং লিংক খুঁজিতে বাধ্য হন। আর এই দুর্বল মুহূর্তকেই কাজে লাগাইতেছে প্রতারক চক্র। ফুটবলপ্রেমীদের আবেগকে পুঁজি করিয়া তাহারা ছড়াইয়া দিতেছে ভুয়া ওয়েবসাইট, নকল অ্যাপ এবং প্রতারণামূলক লিংক।
ইহা নতুন কোনো ঘটনা নহে। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রতিটি প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সহিত নতুন ধরনের অপরাধেরও জন্ম হইয়াছে। একসময় ডাকযোগে প্রতারণা হইত, পরে টেলিফোনে, এখন ডিজিটাল মাধ্যমে। পার্থক্য কেবল এই যে, বর্তমান যুগে প্রতারণার গতি ও বিস্তার বহু গুণ বৃদ্ধি পাইয়াছে। একজন ব্যবহারকারী মাত্র একটি লিংকে ক্লিক করিয়াই নিজের ব্যক্তিগত তথ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট, এমনকি ব্যাংক হিসাবের নিরাপত্তাও বিপন্ন করিতে পারেন। সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা সতর্ক করিয়াছেন যে, এই ধরনের ভুয়া স্ট্রিমিং সাইটে ম্যালওয়্যার, ট্রোজান, স্পাইওয়্যার কিংবা ক্ষতিকর স্ক্রিপ্ট লুকাইয়া থাকিতে পারে। ব্যবহারকারীর অজান্তেই তাহার ডিভাইস আক্রান্ত হইতে পারে, তথ্য চুরি হইতে পারে কিংবা আর্থিক জালিয়াতির শিকার হইতে পারেন। উদ্বেগের বিষয় এই যে, প্রতারকেরা এখন আর অমার্জিত বা সহজে চেনা যায়-এমন ওয়েবসাইট তৈরি করে না। বরং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থা বা জনপ্রিয় সম্প্রচার মাধ্যমের আদলে এমন নিখুঁত নকল তৈরি করে যে, সাধারণ ব্যবহারকারীর পক্ষে আসল-নকল পার্থক্য করা কঠিন হইয়া পড়ে।
এই ঘটনাগুলি কেবল প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্ন নহে। ইহা ডিজিটাল সচেতনতার প্রশ্নও। আমরা স্মার্ট ফোন ব্যবহার করিতে শিখিয়াছি: কিন্তু স্মার্ট ব্যবহারকারী হইতে শিখি নাই। 'ফ্রি' শব্দটির প্রতি মানুষের স্বাভাবিক আকর্ষণ আছে; কিন্তু ডিজিটাল জগতে প্রায়ই দেখা যায়, যাহা বিনা মূল্যে পাওয়া যায় বলিয়া মনে হয়, তাহার মূল্য পরে বহু গুণে পরিশোধ করিতে হয়। কয়েক মিনিটের খেলা দেখিবার লোভে যদি ব্যক্তিগত তথ্য কিংবা সঞ্চিত অর্থ হারাইতে হয়, তাহা হইলে সেই 'ফ্রি' সেবার প্রকৃত মূল্য অত্যন্ত ভয়াবহ। অবশ্য দায় কেবল ব্যবহারকারীর নহে। বৈধ সম্প্রচার ও স্ট্রিমিং সেবাগুলিরও দায়িত্ব আছে। গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরের সময় যদি অনুমোদিত প্ল্যাটফরমগুলিতে প্রবেশ করাই কঠিন হইয়া পড়ে, তাহা হইলে অনেক দর্শক বিকল্প পথ খুঁজিবেন-ইহা স্বাভাবিক। সেই বিকল্প পথই যখন প্রতারণার রাস্তা হইয়া দাঁড়ায়, তখন নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করাও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্তব্য।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাম্প্রতিক তৎপরতা কিছুটা আশাব্যঞ্জক। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, শত শত প্রতারণামূলক ওয়েবসাইট শনাক্ত করা হইয়াছে এবং বহু ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হইয়াছে; কিন্তু বাস্তবতা হইল, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের বিরুদ্ধে কেবল অভিযান যথেষ্ট নহে। প্রয়োজন জনসচেতনতা, ডিজিটাল শিক্ষার বিস্তার এবং নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়িয়া তোলা। মনে রাখিতে হইবে, বিশ্বকাপের উন্মাদনা ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু একটি ভুল ক্লিকের ক্ষতি দীর্ঘস্থায়ী হইতে পারে। অতএব ফ্রিতে খেলা দেখিবার আনন্দে মগ্ন হইবার পূর্বে আমাদের সচেতন থাকিতে হইবে-এই লিংক প্রতারণার জালে লইয়া যাইবে না তো!

