স্মরণ

আমাদের নেতা আবদুর রাজ্জাক

আওয়ামী লীগ কর্মীদের প্রাণপুরুষ আব্দুর রাজ্জাক বাংলাদেশের মাটিতে জীবিত ফিরবে না এটা কেউ কামনা করেনি। প্রতিদিনই আমরা খোঁজ-খবর নিতে থাকি আমাদের সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি বাহালুল মজনু চুন্নু ভাইয়ের মাধ্যমে। অপারেশন হবে ১১ ডিসেম্বর। লন্ডনের কিংস হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় আমাদের নেতা আব্দুর রাজ্জাক। সারা বাংলাদেশের রাজ্জাক ভাইয়ের ভক্তরা উদ্বিগ্ন। হঠাত্ টাকার সমস্যার কথা আমাদের কানে এলো। অপারেশন করতে সাড়ে তিন কোটি টাকা লাগবে। এতো টাকা কি রাজ্জাক ভাইয়ের আছে? এই প্রশ্ন ভক্তদের শুধু নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সচেতন যারা তাদের সবারই প্রশ্ন। কেননা রাজ্জাক ভাই জীবনে টাকার পিছু ছোটেননি— এ ব্যাপারে প্রতিটি বাঙালিই ওয়াকিবহাল। ভাবী সিদ্ধান্ত নিলেন বাড়ি বিক্রি করবেন। খুব কাছের লোকজনরা বাধা দিলেন। বাড়ি বিক্রি করা যাবে না । দেখা যাক কি করা যায়। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল এবং সিকদার মেডিক্যালের সিকদার সাহেব চিকিত্সার জন্য টাকা দিয়েছেন। এ ছাড়াও অনেকে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। আমাদের চেতনায় আসে না এমন একজন জাতীয় বীরের চিকিত্সার জন্য টাকার অভাব হয় কি করে? দল বা রাষ্ট্র কি করলো? শুধু আমরা ক’জনই নই, সারা বাংলার রাজ্জাক ভাইয়ের ভক্তদেরও একই প্রশ্ন । রাজ্জাক ভাই ভারতে চিকিত্সায় যাবার আগে দেখা করেছিলাম। আমার সাথে বাংলাদেশ ব্যাংকের সি বি এ-এর সাধারণ সম্পাদক মন্জুরুল হক ছিলেন । অনেক কথার পর আমি লিডারকে বললাম, আমি আপনার জীবনী লিখতে চাই। আপনি আমায় সময় দিন। তিনি বললেন, এসব তো কখনো ভাবিনি। মরে গেলে হয়তো আমাকে সবাই ভুলে যাবে। লেখ, যদি লিখতে পারিস। আমি দুটি শুক্রবার চেয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু বিধি বাম। তিনি সময় দিতে পারেননি। রাষ্ট্রীয় কাজ এবং শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে আর হয়ে উঠেনি। সত্যিই আমি একজন হতভাগা। তার খুব কাছে এসে নিজেকে আলোকিত করেছি অথচ তার জন্য কিছুই করতে পারিনি। সেই ১৯৭৮ সালের কথা। বাংলাদেশ ছাত্রলীগে যোগ দিয়েছি। তখন আমি আনন্দমোহন কলেজের ছাত্র। শহরের ছেলে হিসাবে আমাদের প্রাধান্য বেশি। সম্ভবত ১৯৭৯ সালে রাজ্জাক ভাই ময়মনসিংহে এলেন। তিনি তখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন । মহারাজা রোডের একটি বাসায় আমরা লাইন ধরে তার সাথে দেখা করলাম। প্রায় দুই ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে আমি যখন ঠিক তার কাছাকাছি এসেছি তখন তিনি অসুস্থ হয়ে গেলেন। তার সাথে আর কুলাকুলি হলো না। কষ্ট পেলাম প্রচণ্ড। অবশ্য সর্বশেষ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক থাকাকালীন সময়ে তার সান্নিধ্যের অভাব ছিল না। যা বলছিলাম- কিছু কিছু কষ্ট থেকেই যায়। রাজ্জাক ভাইয়ের লাশ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এলো। ফুলেল শুভেচ্ছায় রাজ্জাক ভাইয়ের দেহ ঢেকে গেলো। এবারো তার মুখটি দেখতে পেলাম না। কষ্ট থেকেই গেল। রাজ্জাক ভাইয়ের স্মৃতি নিয়ে লেখা নিয়ে শেষ করা যাবে না। আমরা প্রায় নয় বছর তার সাথে কাজ করেছি। রাজপথে তার পাশে থেকেছি। রাজ্জাক ভাইয়ের মৃত্যু সত্যিই অকাল মৃত্যু। তিনি বেঁচে থাকলে যুদ্ধাপরাধীর বিচার আরো ত্বরান্বিত হতো। ভারতের সাথে সম্পর্ক আরো গভীর হত। নদী বা পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের সাথে আরো জোরালো ভূমিকা রাখা যেতো। তিনি স্বাধীনতা-পূর্ব এবং স্বাধীনতা-উত্তর অনেক দিয়েছেন বাংলাদেশ এবং বাঙালিকে। তিনি কখনোই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে বিচ্যুত্ হননি। সে জন্যই জনগণ তাকে বলতো বঙ্গবন্ধুর মানসপুত্র আব্দুর রাজ্জাক। লেখক :ব্যাংকার ও কথাসাহিত্যিক