ওবামার ব্যর্থ মধ্যপ্রাচ্য নীতি

কয়েক মাস আগে লিবিয়ার বেনগাজিতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নিহত হওয়ার পর এ বিষয়ক এক প্রতিবেদনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের পদ্ধতিগত ব্যর্থতা, নেতৃত্ব এবং ব্যবস্থানপার ত্রুটিকেই দায়ী করা হয়েছে। এ কারণে চারজন মার্কিন কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছেন। আরো কয়েকজন এ কারণে পদত্যাগ করতে পারেন। এ ব্যর্থতার সব দায় নিজের কাঁধেই নিয়ে নিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন এবং সফলভাবে এর দায় এড়াতেও সক্ষম হয়েছেন তিনি। বেনগাজি প্রতিবেদনে একটি বিষয় বাদ পড়েছে। তা হলো ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনাটি একটি বড় সমস্যার লক্ষণ মাত্র। এ সমস্যা আরো ঘনীভূত হচ্ছে, কারণ ঘটনার জন্য দায়ী আল কায়েদার সদস্যরা ও তাদের সহযোগী বাহিনীর সদস্যদের বিচার না হওয়া। যার ফলে তারা আগামীতে মার্কিনীদের প্রতি আবারো আঘাত হানতে পারে। আর এজন্য ওবামা প্রশাসনের সম্পূর্ণ মধ্যপ্রাচ্য নীতি এখন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। গত প্রায় দুই বছর আগেও মধ্য প্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিরাজ করছিলো। যদিও এটাকে অস্বস্তির শান্তি হিসেবে বিবেচনা করতো যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তারপর বিরাট এই অঞ্চলে অস্বস্তিকর শান্তি হাজার বছরেরও বেশি সময় টিকে ছিলো। মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ দেশই স্বৈরশাসকের অধীনে ছিলো। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এসব স্বৈরশাসকদের বেশিরভাগই ছিলো মার্কিনপন্থি। এসব স্বৈরশাসকের কয়েকটি দেশ ইসরাইলের বিরুদ্ধে সভা-সমাবেশ করলেও তারা ইহুদিদের ওপর হামলা করেনি বা যুদ্ধে জড়ায়নি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পুরোপুরি ভিন্ন। সবকিছুই পরিবর্তিত। সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় মিশরের আমেরিকাপন্থি স্বৈরশাসকের পরিবর্তন ঘটেছে। আর এখন সেই দেশটিতে আমেরিকা বিরোধী মুসলিম ব্রাদারহুড সরকার গঠন করেছে। তারা এখন ইসলামিক সংবিধান প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় লিবিয়ায় গাদ্দাফির সরকারের পতন হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত সরকার ক্ষমতায় থাকলেও তারা দেশটিকে দৃঢ়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। যারা আল কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মিলিশিয়াদের হামলা থেকে মার্কিন কূটনীতিকদের বাঁচাতে পারেনি। সিরিয়ার বাসার আল আসাদ এখনো ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াননি। উপরন্তু দেশটিতে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। নিরীহ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। দেশটিতে জাতিগত সহিংসতাও ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া ন্যাটো জোটের সদস্য তুরস্কের জন্য নতুন হুমকি তৈরি করেছে দেশটি। পরমাণু শক্তিধর হওয়ার পথে রয়েছে ইরান। এছাড়া এ অঞ্চলের কর্তৃত্বময় হয়ে উঠেছে দেশটি। সাদ্দাম পরবর্তী ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রপন্থি সরকার হবে এমন আশাও শেষ হয়ে গেছে। দিন দিন ইরাক ইরান বলয়ে ঠুকে পড়ছে। মার্কিন সেনারা আফগানিস্তান ছাড়ার পর সেখানে বহুপক্ষীয় গৃহযুদ্ধের সূচনা হতে পারে। এখন ভালোর মধ্যে হলো মিশরে মার্কিন বিরোধী ব্রাদারহুডের শাসন। আর খারাপের মধ্যে হলো আসন্ন সংঘাত। এখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংঘাত অপেক্ষা করছে। আর কট্টর ইসলামী ও আল কায়েদা তাদের প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট হচ্ছে। এ ধরনের সংঘাত চলতে থাকলে একটা সময় দেখা যাবে আটলান্টিক মহাসাগরের প্রান্ত থেকে পাকিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলটি যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী এবং গোষ্ঠীগত সংিহসতায় পূর্ণ হয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বন্ধু ইসরাইলের আশপাশের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো চরমপন্থিদের বাসস্থলে পরিণত হবে। যে যেভাবেই ব্যাখ্যা করুক না কেন মূল কথা হলো যুক্তরাষ্ট্র কট্টর চরমপন্থিদের হাতে মধ্য প্রাচ্যকে হারাচ্ছে এবং মার্কিনীদের উপর হামলার আরো দ্বার উন্মুক্ত করে দিচ্ছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ সামনে থেকে যে নীতি পরিচালনা করেছিলো বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা পেছন থেকেই সে নীতি পরিচালনা করছেন। যা এ কাজের জন্য অপর্যাপ্ত। বুশ আফগানিস্তান ও ইরাকে আগ্রাসন চালিয়ে স্বৈরশাসকদের ক্ষমতা থেকে সরিয়েছেন। সেখানকার শাসন ব্যবস্থার কাঠোমো পরিবর্তন করেছেন। মার্কিনপন্থিদের ক্ষমতায় বসিয়েছেন। এক দশক পর ওবামা মিশর ও লিবিয়ায় স্বৈরশাসকদের সরিয়ে তার স্বাধীনতা এজেন্ডা প্রচারের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সেখানে ক্ষমতার পরিবর্তন, স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা ও স্বয়ংসম্পূর্ণ সরকার প্রতিষ্ঠায় সাহায্যের হাত না বাড়িয়ে দূরে সরে রয়েছেন। ফলে আরব বসন্ত এখন ইসলামী চরমপন্থি ও মুসলিম ব্রাদারহুডদের হাতে নিভে গেছে। বিভিন্ন সময় মার্কিন স্থাপনায় হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা নিলেও দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা বা শাস্তি দিতে সক্ষম হয়নি। বেনগাজির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। যদিও এসব সন্ত্রাসী কারা এবং কোথায় বাস করে তা অনেকেরই জানা। এ অবস্থায় ২০১৩ সালে মার্কিনী বা মার্কিন স্থাপনায় হামলা হলে কারো অবাক হওয়া উচিত হবে কী? — ফক্স নিউজের মন্তব্য অবলম্বনে