অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন এত সহজে নয়
প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:১৬
দশ দিন আগের ব্ল্যাক ফ্রাইডের ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে। কানেক্টিকাটের নিউ টাউন স্যান্ডি হুক এলিমেন্টারি স্কুলের এ বীভত্স হত্যাকাণ্ডের ধাক্কা এখনো সামলে উঠতে পারেনি মার্কিনীরা। ২০ শিশুসহ ২৬ জনের মৃত্যুর কারণে দেশ জুড়ে এখনো শোকের ছায়া। তারপর থেকে শুরু হয়েছে অস্ত্র রাখার অধিকারের আইন নিয়ে।
এ আইন যে কত বিপজ্জনক— তা নিয়ে এখন আর তেমন কোনো তর্ক নেই। এ মুহূর্তে মার্কিন জনমত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের পক্ষেই। বারাক ওবামাও নাকি সেই দলে। কিন্তু তারপরও অনেক প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে।
অস্ত্র সবার হাতে থাকা উচিত, নাকি অনুচিত— এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে জোর বিতর্ক অনেক বছর ধরেই। সেই ১৭৯১ সালে একটি বিল পাস হয়েছিল সংসদে। সেখানে বলা হয়েছিল, একটা স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিকদের হতে হবে আধা সামরিক বাহিনীর সুশৃঙ্খল সদস্যদের মতো, সেখানে নাগরিকদের অস্ত্র সঙ্গে রাখার অধিকারে হস্তক্ষেপ করা যাবে না। পরে সেই আইনেও কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছিল। বিপজ্জনক অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি সবাইকে না দেয়ার ওই আইন হয়েছিল ১৯৯৪ সালে। কিন্তু আইনটির কার্যকারিতা ছিল ২০০৪ সাল পর্যন্ত। তারপর মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও কংগ্রেসে তা নবায়ন করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ফলে সমাজে অস্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহারের সুযোগ বেড়েছে। তার কুফলও দেখা যাচ্ছে। স্কুলে, পাবে, রেস্তোরাঁয় নিরস্ত্র মানুষের ওপর হামলার ঘটনা আগেও ঘটেছে।
সর্বশেষ ঘটনাটি সপ্তাহখানেক আগের। অ্যাডাম লানজা নামের ২০ বছর বয়সী এক তরুণ কানেক্টিকাটের প্রাথমিক স্কুলে নির্বিচারে হত্যা করে ২৬ জনকে। তারপর আত্মহত্যা করে লানজা। জানা গেছে, স্কুলে হামলা চালানোর আগে নিজের মাকেও হত্যা করেছিল।
লানজার এই উন্মত্ত হত্যাযজ্ঞ যেন গোটা জাতির জন্যই এক চপেটাঘাত। যুক্তরাষ্ট্রের অনেকেই ব্যাপারটিকে দেখছেন এভাবে। ২০টি শিশু, তাদের শিক্ষিকা এবং স্কুলকর্মীর জীবন অকালে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ঝরে যাওয়ায় শুধু তারা শোকাভিভূতই নন, ক্ষুব্ধও।
এ ঘটনার পর জরিপে অংশ নেয়া ৫০ শতাংশ মানুষ অস্ত্র আইন কঠোর করার পক্ষে মত দিয়েছে। এর আগে ৪২ শতাংশ মানুষ অস্ত্র আইন কঠোরের ব্যাপারে মত দিয়েছিল। শিশুহত্যার পর জনসমর্থন বেড়েছে।
এর আগে ১১ থেকে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৩৯৫ জন মানুষ জরিপে অংশগ্রহণ করেছিল। হত্যাকাণ্ডের পর ১৪ থেকে ১৭ ডিসেম্বরের মধ্যে আরো ১ হাজার ১৯৮ জন জরিপে অংশগ্রহণ করে। বারাক ওবামা ও কংগ্রেসের কয়েকজন নেতা অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন নিয়ে আবার আলোচনা শুরু করেছেন।
সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ডেমোক্র্যাটদের নেতা হ্যারি রেইড অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন নিয়ে তেমন উত্সাহী ছিলেন না। ওই ঘটনার পর ওবামার পাশাপাশি তিনিও জানান, এ ধরনের দুঃখজনক ঘটনা বন্ধ করতে আরো কিছু করা দরকার।
তাই সার্বিকভাবেই দাবি উঠছে প্রচলিত আইন বদলানোর। মার্কিন প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র জে কারনি গত মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে অস্ত্র মালিকানা আইনে পরিবর্তন দরকার সেটা ওবামাও মনে করেন এবং এ বিষয়ে কিছু প্রস্তাব পেলে সেগুলো খতিয়ে দেখে পরিবর্তনটা তাড়াতাড়ি করার চেষ্টাও তিনি করবেন। এ সময় ডায়ানে ফেইনস্টাইনের একটি দাবির কথাও তুলে ধরেন কারনি। ক্যালিফোর্নিয়ার ওই সিনেটর আগ্নেয়াস্ত্র সবার হাতে তুলে দেয়ার সহজ এবং বর্তমানে প্রচলিত নিয়মটি বাতিল করার পক্ষে।
কানেক্টিকাটের স্কুলে এমন হূদয়বিদারক ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর সবারই ফেইনস্টাইনের দাবির প্রতি সমর্থন জানানোর কথা। অথচ এ নিয়েই অদ্ভুত এক সমস্যা দেখা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন অফ আমেরিকা, অর্থাত্ এনআরএ মনে করে এমন কিছু করতে যাওয়া হবে ভুল। শুনলে মনে হতে পারে এ সংগঠন হয়তো সমাজে এমন হত্যাকাণ্ড বন্ধ হোক তা চায় না। ব্যাপারটা ঠিক উল্টো। আসলে এনআরএ এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকারদেরই সংগঠন। এর সদস্য প্রায় চার লাখ এবং তাদের প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে কোনো না কোনো জায়গায় দুঃখজনকভাবে প্রিয়জন হারানো বাবা, মা, ভাই, বোন বা অন্য কোনো নিকটাত্মীয়। সংগঠনটি জানিয়েছে কানেক্টিকাটের ঘটনায় তারাও যারপরনাই দুঃখিত, কিন্তু তারপরও জনগণের অস্ত্র রাখার সুযোগ তুলে নেয়া হোক এটা তাদের কাম্য নয়। তারা চান সেই ১৭৯১ সালের আইনে ফিরে যেতে, যেখানে বলা হয়েছিল নিজেকে বাঁচাতে প্রত্যেকটা মানুষ সঙ্গে শুধু অস্ত্র রাখবেই না, প্রয়োজনের সময় তা আধা সরকারি বাহিনীর সদস্যদের মতো ব্যবহারও করতে পারবে!
সব মিলিয়ে এ নিয়ে বিতর্ক এতোটাই জটপাকানো যে ওবামা চাইলেও এত সহজে সেদেশে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করা সম্ভব নয়।