যুক্তরাষ্ট্রে এক ধর্মোন্মাদের বিচার ও মিডিয়ার ভূমিকা প্রসঙ্গে
প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৩৪
সেপ্টেম্বর মাসের ত্রিশ তারিখে ওহিও অঙ্গরাজ্যে একটি ইসলামিক সেন্টারে অগ্নিসংযোগের দায়ে এক ব্যক্তির বিচার শুরু হইয়াছে যুক্তরাষ্ট্রে। ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্য নিবাসী র্যান্ডলফ লিন। এই ব্যক্তি ইতোমধ্যে কৃতকর্মের দায় স্বীকার করিয়া লইয়াছেন বিধায় তাহার কারাদণ্ডের মেয়াদ কমিয়া আসিয়া বিশ বত্সর হইবে বলিয়া ধারণা করা হইতেছে। অপরাধ স্বীকার না করা অবস্থাতে দোষী প্রমাণিত হইলে উল্লেখ্য অপরাধ সংঘটনের ও আগ্নেয়াস্ত্র বহনের দায়ে মার্কিন আইনে তাহার চল্লিশ বত্সর পর্যন্ত কারাদণ্ড হইতে পারিত। হিংসায় উন্মত্ত হইয়া পরধর্মের উপরে আঘাত হানিবার পরিণাম কি হইতে পারে তাহা বুঝিবার জন্য র্যান্ডলফ লিনের বিচারপ্রক্রিয়ার দিকে নজর রাখা যাইতে পারে। তবে গত বুধবার আদালতের সামনে বক্তব্যদানকালে, অপরাধটি সংঘটিত করিবার পিছনে মিডিয়ার ভূমিকা দ্বারা আলোড়িত হইবার যে বিবরণ অভিযুক্ত ব্যক্তিটি উপস্থাপন করিয়াছেন তাহা লইয়া ভাবিবার যথেষ্ট অবকাশ আছে।
ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, র্যান্ডলফ লিন গত সেপ্টেম্বর মাসের ৩০ তারিখে ওহিওর ইসলামিক সেন্টার ফর গ্রেটার টলেডোতে অগ্নিসংযোগ করেন। অবশ্য অগ্নিনির্বাপক দল দ্রুত ঘটনাস্থলে হাজির হইবার কারণে বড় কোন ক্ষতির হাত হইতে সেন্টারটি রক্ষা পায়। পরবর্তীতে ক্লোজ সার্কিট টেলিভিশনের ফুটেজ হইতে দেখিয়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তির তথ্যের ভিত্তিতে তাহাকে গ্রেফতার করা হয়। লিন মনে করেন, মুসলিমরা সর্বদাই আমেরিকানদিগকে হত্যা করিবার চেষ্টাতে লিপ্ত আছে এবং মুসলিমরা যুক্তরাষ্ট্রে যথেচ্ছা কার্য করিবার সুযোগ পাইয়া যাইতেছেন। আদালতে এক বিচারক কর্তৃক মুসলিম মাত্রই সন্ত্রাসী কিনা এমত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি অধিকাংশ মুসলিমকেই সন্ত্রাসী বলিয়া গণ্য করিবার কথা জানান। সন্দেহ নাই যে, র্যান্ডলফ লিন ‘ইসলামভীতিতে’ আক্রান্ত হইয়া আছেন যাহা বিশেষ করিয়া নয়-এগারোর পর হইতে পশ্চিমে কিছু মানুষজনের মনে ভালোভাবে শিকড় গাড়িয়া বসিয়া অশান্তির বীজ ছড়াইতেছে।
র্যান্ডলফ লিনের মত মানুষজনের মধ্যে অযথা পরধর্ম-ভীতি, যাহা সময়ে-সময়ে ঘৃণায় রূপান্তরিত হয়। এইরূপ ক্ষেত্রে মিডিয়ার ভূমিকা কতটা নেতিবাচক হইতে পারে তাহা বুঝিবার জন্য উক্ত ব্যক্তির জবানবন্দির দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। লিন আদালতকে জানাইয়াছেন যে, ব্যক্তিগতভাবে কোন মুসলিমের সহিত তাহার কোন পরিচয় নাই; কেবলমাত্র ফক্স টেলিভিশনে প্রচারিত খবরাদি দেখিয়া এবং রক্ষণশীল রেডিওগুলির অনুষ্ঠান শুনিয়াই তিনি মুসলিমদের ব্যাপারে উপরোক্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাইয়াছেন। শুধু তাহাই নহে, লিনের দেওয়া তথ্যমতে, মিডিয়ার অনুষ্ঠানগুলি মুসলিমদিগের বিরুদ্ধে তাহার ঘৃণার মাত্রা এতোটাই চড়াইয়া দেয় যে, তিনি ছয় ঘন্টার মধ্যে ৪৫ ক্যান বিয়ার সেবন করিয়া হস্তে গ্যাস ক্যান ও আগ্নেয়াস্ত্র লইয়া ইসলামিক সেন্টার ফর গ্রেটার টলেডোর অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন এবং অগ্নিসংযোগ করেন।
র্যান্ডলফ লিন যেই অপকর্মে লিপ্ত হইয়াছেন তাহার শাস্তি তিনি পাইবেন। কিন্তু নির্দিষ্ট কয়েকটি মিডিয়ার দ্বারা প্ররোচিত হইয়া উঠিবার প্রসঙ্গে তিনি যাহা বলিয়াছেন তাহা কিন্তু ভাবিবার মত। আজিকার দিনে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে মিডিয়ার ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু মিডিয়ার বিরুদ্ধে যদি অভিযোগ উঠে, তবে তাহা লইয়াও কথা বলিবার জন্য মিডিয়াকেই প্রস্তুত থাকিতে হইবে বৈকি। তাহা না হইলে সমাজে-রাষ্ট্রে শান্তি-স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্যটিই ব্যাহত হইয়া যাইবে। র্যান্ডলফ লিনের জবানবন্দি এই কর্তব্যটিকেই আরেকবার স্মরণ করাইয়া দেয়।