[ রা জ নী তি ]
ভয় পেয়ে অপপ্রচারে নেমেছে জামায়াত
প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৩৫
হরতাল, হরতাল, হরতাল! অনেক দিন থেকেই এ নিয়ে মানুষের মনে চরম বিরক্তি। কিন্তু গত ১৮ ডিসেম্বরের সিপিবি-বাসদ ও বাম মোর্চার ডাকা হরতাল মানুষের মধ্যে এক সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী মনোভাব ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সবাই এখন বলছে, যদি এটাই হয় হরতালের প্রকৃত রূপ তবে তাতে বিরক্তির বা ক্ষোভের কী আছে? হরতালের এই প্রকৃত চেহারার সাথে নবীন প্রজন্মের একেবারেই পরিচয় নেই। প্রবীণরাও তা প্রায় ভুলতে বসেছিল।
গত ৩/৪ দশক ধরে মানুষ হরতাল হিসেবে যা দেখে অভ্যস্ত (কিছু ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত বাদে) তাকে হরতাল বলে আখ্যাায়িত করাটা যতোটা না যুক্তিসংগত তার চেয়ে বেশি উপযুক্ত হলো তাকে ‘ডরতাল’ বা ‘ভয়তাল’ বলে চিত্রায়িত করা। সে সব কথিত ‘হরতালের’ প্রধান উপাদান হল, জনগণের মধ্যে ভয়-ডর-আতঙ্ক ছড়িয়ে তাদেরকে গাড়ি বের করা ও দোকানপাট খোলা থেকে বিরত রাখা। হরতালের নামে এসব ‘ডরতাল’ পরিচালনার আসল উদ্দেশ্য হলো, দেশে ‘গোলমাল’ চলছে, সরকার শান্তি-শৃংখলা বজায় রাখতে পারছে না, সরকারকে বদলে দেয়ার ‘ব্যবস্থা’ না করলে দেশ যে নৈরাজ্যে ডুবে যাবে তা দেশি-বিদেশি ‘মহাজনদের’ কাছে প্রদর্শন করা ইত্যাদি। এবং সে জন্য সহিংসতা, সন্ত্রাস, আতঙ্ক, নৈরাজ্য, অনিশ্চয়তার একটি কৃত্রিম সাজানো ‘সিচুয়েশন’ বা পরিস্থিতির জন্ম দেয়া। এসব করতে প্রয়োজন, পেট্রোল-কেরোসিন-আগুন, ককটেল-বোমা-ইট-পাটকেল ইত্যাদি। আমজনতার তাতে সক্রিয়ভাবে অথবা মানসিকভাবে অংশগ্রহণের বিষয়টি সেক্ষেত্রে তুচ্ছ ও অপ্রাসঙ্গিক।
অন্য সব বড় অনুষ্ঠানের মতো এসব ‘হরতালের’ জন্য আজকাল ‘ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট’ প্রয়োগ করা হয়। এ কাজের জন্য এক্সপার্ট লোকজন ব্যবহার করা হয়। খরচ করা হয় একগাদা টাকা। ‘হরতালের’ ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের জন্য চিহ্নিত ক্যাটারিং সার্ভিসের সাথে টাকার বিনিময়ে ফয়মায়েস অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাজ করিয়ে নেয়ার কথাবার্তা আগেই পাকা করা হয়। কয়টা পটকা বা ককটেল ফোটাতে হবে, কয়টা গাড়িতে আগুন দিতে হবে, কয়টা যানবাহন ভাঙচুর করতে হবে—যেভাবে অর্ডার থাকবে, সেভাবে সাপ্লাই হবে। রিস্ক বহন করবে কে, কতোটা— তার ভাগবাটোয়ারাও আগেই ঠিক হয়ে থাকে। বলা বাহুল্য, এসব কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই কোনো গণআন্দোলনের পদক্ষেপ নয়, সবই হলো গণআন্দোলনের নামে ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক ও ক্ষতিকর তামাশা বা প্রহসনের মরণ খেলা। ‘হরতাল’ নিয়ে এই মরণ খেলাকে ডাল-ভাত করে তুলেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এবং এই দুই দলের জোট সঙ্গীরা।
‘হরতালের’ সেই অস্ত্রকেই আরো সহিংস তাণ্ডবে শাণিত করে এবার মাঠে নেমেছে জামাত-শিবির চক্র। নভেম্বর মাস থেকে তারা মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচারাধীন আটক শীর্ষ নেতাদের মুক্তির দাবিতে। ট্রাইব্যুনালে তাদের কারো কারো বিচার প্রক্রিয়া সাক্ষী-প্রমাণ ও যুক্তি-তর্কের পর্যায় শেষে রায় প্রদানের পর্যায়ে উপনীত হওয়ায় জামাত-শিবির মরিয়া হয়ে মাঠে নামে। পুলিশ বাহিনীর উপর গেরিলা কায়দায় অতর্কিত হামলা চালানো, পুলিশের হাত থেকে রাইফেল ছিনিয়ে নিয়ে তা দিয়েই পুলিশকে পিটানো, আইনমন্ত্রীর গাড়ী বহরে আক্রমণ, বিজিবির গাড়িতে হামলা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ধ্বংস সাধন ইত্যাদি ঘটনা জামাত-শিবিরের প্রশিক্ষিত ক্যাডারদের দ্বারা সামরিক কায়দায় উপর্যুপরি পরিচালিত হতে থাকে। ট্রাইব্যুনালে বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করে যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি দেয়ার দাবিতে তারা বিজয়ের মাস ডিসেম্বরের ৪ তারিখে হরতাল ডাকার ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে। হরতালে তারা তাদের সহিংস তাণ্ডব আরো বিস্তৃত করে। জামাতের কাজকর্মে মানুষের ক্ষোভ বাড়তে থাকে। লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত স্বাধীনতার বিজয়ের মাসে সেই ঘাতকদের সহিংস হরতাল পালনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ ঘটনায় মানুষ ক্রোধান্বিত হয়ে তার দাঁতভাঙ্গা জবাবের প্রত্যাশা করতে থাকে। আওয়ামী লীগ, মহাজোট এবং তাদের সরকার উপযুক্ত পাল্টা রাজনৈতিক জবাবের বদলে শুধু বক্তৃতা ও সমাবেশ-মিছিল-মানববন্ধন এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা দিয়ে জামাত-শিবিরকে মোকাবেলার পথ গ্রহণ করে। তারা রাজনৈতিক আক্রমণের ক্ষেত্রে জামাতকে প্রধান টার্গেট না করে তাদের ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিকে রাজনৈতিক আক্রমণের মূল টার্গেট করার ভ্রান্ত কৌশল অনুসরণ করতে থাকে। ফলে, বিএনপির ১৮ দলের ছত্রছায়ার আশ্রয় নিয়ে জামাত তার সহিংস তত্পরতা বাড়িয়ে দেয়।
এরকম পটভূমিতে গত ১৮ ডিসেম্বর সারাদেশে সিপিবি-বাসদ-বাম মোর্চার ডাকে একটি সফল, ব্যতিক্রমধর্মী ও অভূতপূর্ব হরতাল হয়ে গেল। হরতাল ডাকা হয়েছিল প্রধানত তিনটি দাবিতে। প্রথমত—যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তি দ্রুত সম্পন্ন করা এবং জামাত-শিবির ও রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার দাবি। দ্বিতীয়ত—ছিল, ২৪ নভেম্বর তাজরিন ফ্যাশন গার্মেন্টসে আগুনে পুড়ে শতাধিক গার্মেন্ট শ্রমিকের মৃত্যুর জন্য দায়ী গার্মেন্টের মালিক ও অন্যান্য কর্মকর্তার গ্রেফতার ও বিচার, সব কারখানার কাজের নিরাপদ পরিবেশের নিশ্চয়তা এবং শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার প্রদান করার দাবি। তৃতীয়ত ছিল, বাড়িভাড়া, বাসভাড়া বৃদ্ধি বন্ধ ও নতুন করে তেল-মবিল-বিদ্যুত্ প্রভৃতির দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা বন্ধ করার দাবি। হরতালের দাবিগুলোর জনপ্রিয়তা, সার্বজনীনতা ও যুক্তিগ্রাহ্যতা তাকে বুর্জোয়া দলগুলোর বা জামাতের ডাকা ইদানিংকালের ‘হরতালগুলো’ থেকে প্রথমেই আলাদা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন করে তোলে। এবারের হরতাল যে নিছক গদির কামড়া-কামড়ির হরতাল নয়, এটা যে জাতি ও জনগণের জরুরি স্বার্থরক্ষার দাবিতে হরতাল, তা মানুষ বুঝতে পারে। অধিকন্তু, যে সব দল এই হরতালের ডাক দিয়েছে (বিশেষ করে সিপিবি), তাদের সততা, দেশপ্রেম ও বিশ্বাসযোগ্যতা হরতালের গ্রহণযোগ্যতাকে বাড়িয়ে দেয়। মানুষের মনে সুপ্ত থাকা ‘বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির’ প্রত্যাশাও এই হরতালের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
হরতাল আহ্বানকারীরা তাদের উত্থাপিত দাবিগুলো নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালায়। লক্ষ লক্ষ হ্যান্ডবিল ছাপিয়ে প্রচার করা হয়। পথসভা, খণ্ড মিছিল ইত্যাদির মাধ্যমে তৃণমূলে যেয়ে জনগণের মাঝে হরতালের কর্মসূচি ও দাবিগুলোর কথা পৌঁছে দেয়া হয়। গার্মেন্টস ও পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের সাথে উপর্যুপরি বৈঠক ও মতবিনিময় করা হয়। রিক্সা, ভ্যান, সিএনজির গ্যারেজে-গ্যারেজে প্রচার দল পাঠানো হয়। মাইক দিয়ে প্রচারণা চালানো হয়। হরতালের সপক্ষে মশাল মিছিল বের করা হয়। একের পর এক শ্রমিক, কৃষক, ক্ষেতমজুর, ছাত্র, যুব, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি সংগঠন হরতালের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করতে থাকে। জামাতের সমর্থন নিয়ে ১২টি তথাকথিত ইসলামি দল (অবশ্য পরবর্তীতে তাদের মধ্যে ৮টি দল জানায় যে, তারা এর সাথে যুক্ত নয়) ঘোষণা করে যে, ১৮ তারিখের হরতাল প্রত্যাহার না করলে তারা কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে ২০ ডিসেম্বর হরতাল করবে। এতে জনগণ তাদের ঔদ্ধত্যের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে আরো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে ওঠে।
হরতালের আগের বিকেল-সন্ধ্যায় শত-শত মিছিল হয়েছে, মশাল শোভাযাত্রা হয়েছে। কিন্তু কোনো গাড়ি পোড়ানো হয়নি, ককটেল ফাটিয়ে মানুষকে ভীত-সন্ত্রস্ত্র করা হয়নি। হরতালের দিনেও কোনো আগুন লাগানো হয়নি, পটকা-ককটেল ফোটানো হয়নি। একটি ঢিলও নিক্ষেপ করা হয়নি, একটি গাড়িও ভাঙচুর করা হয়নি। মিছিলগুলো খুব বড় ছিল না। মিছিল হয়েছে অসংখ্য। গিটার, ঢোল-করতাল নিয়ে গানের দল গান গেয়ে মিছিল করেছে। মানুষকে করজোড়ে অনুরোধ করা হয়েছে হরতালে শরিক হওয়ার জন্য। হরতাল অভূতপূর্ব সফলতা অর্জন করে।
সরকার পড়ে যায় এক ধরনের বেকায়দায়। দাবিগুলো বিশেষত প্রধান হয়ে ওঠা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি অগ্রাহ্য করা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে ওঠে। তাই সরকার ও মহাজোটের নেতারা বলা শুরু করল যে, এই দাবি তাদেরও দাবি, তবে সে জন্য হরতালের কোনো প্রয়োজন নেই। তারা প্রকাশ্যে উল্টা প্রশ্ন করে, ‘কাকে খুশি করার জন্য সিপিবি হরতাল ডেকেছে, তা জানতে হবে’। মহাজোটের শরিক একটি ‘বাম’ দলের নেতা বলে বেড়ানো শুরু করেন যে, এই হরতাল হলো ‘বালকসুলভ’ উগ্রতার প্রকাশ ও স্ট্যান্টবাজি। হরতালের আগে বিভিন্ন স্থানে বাধা দেয়া শুরু করল। বরিশাল, নেত্রকোনা, মাগুরা প্রভৃতি স্থানে হামলা, প্রচার মিছিল ছত্রভঙ্গ, মাইক ভাঙচুর ইত্যাদি করা হল। হরতালের দিন বিভিন্ন স্থানে ২০ জনকে আটক করা হল, ১৫ জনকে পিটিয়ে আহত করা হল। কিন্তু সরকার যখন টের পেল যে, হরতাল ঠেকানো যাবে না, হরতাল হয়ে যাবে, তারা তখন কৌশল পাল্টাল। কোনো গাড়ি ভাঙচুর অগ্নিসংযোগের ঘটনা ছাড়াই হরতালের প্রতি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন প্রকাশ পাওয়ায় পুলিশ এ্যাকশনে যাওয়ার সুযোগ পেল না। বিএনপির শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মিছিলকে যেভাবে পুলিশ বাহিনী প্রটেকশন দিয়ে থাকে, সেভাবে রাজধানীর দু’টি এলাকাকে প্রটেকশন দিয়ে রাখা হল। ‘এই হরতাল থেকে বিএনপির শিক্ষা নেয়া উচিত’, (নিজেদেরও যে শিক্ষা নেয়া উচিত, সে কথা কিন্তু তারা বললেন না!), ‘হরতাল সফল করায় বামপন্থিদের ধন্যবাদ জানাই’ ইত্যাদি বাতুলতার আশ্রয় নিয়ে হরতালের সাফল্যের জন্য সিপিবিসহ বামপন্থিদের কৃতিত্বকে নিজেদের পটেকস্থ করার জন্য সরকার তত্পর হয়ে উঠল। ফলে বিভ্রান্তি ছড়াল। কোনো কোনো মহল কথা তোলার সুযোগ পেল যে, এটি ছিল ‘সরকারি হরতাল’।
১৮ ডিসেম্বরের হরতাল সফল হওয়ায় জামাতকে আশ্রয় দেয়ার নীতি নিয়ে চলতে থাকা বিএনপি হরতালে ব্যাপক গণসমর্থন ব্যক্ত হওয়ায় বিচলিত হয়ে পড়লো। তাদের গোপন এজেন্ডা হল তারেক-কোকোকে বাঁচানো। সেজন্য তাদেরকে আরো হরতাল করতে হবে। সেজন্য জনসমর্থন নয়-ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, সন্ত্রাস, টাকা দিয়ে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের এজেন্ট ভাড়া করে ‘হরতাল’ করানো ছাড়া গত্যন্তর নেই। যেহেতু সিপিবি ও বামপন্থিদের ব্যতিক্রমধর্মী হরতাল প্রমাণ করেছে যে, এসব ছাড়াই স্রেফ জনসমর্থন দিয়ে হরতাল সফল করা যায়, তাই বিএনপির পক্ষে সহজ পথে ‘ডরতাল’ করে হরতাল করার দাবি করা ভবিষ্যতে কষ্টকর হবে। অন্যদিকে, সরকারের বিরোধী শক্তি হিসেবে তাদের ডানপন্থি একচেটিয়াত্বকে চ্যালেঞ্জ করে স্বতন্ত্র ও পৃথক বামপন্থি অবস্থান থেকে যদি শক্তির উত্থান ঘটে তবে তা তাদের জন্য হয়ে উঠবে বড় বিপদ। তাই, সিপিবি-বাসদের হরতালকে ‘সরকারি হরতাল’ বলে আখ্যায়িত করে বিএনপি হরতালের সাফল্যকে হেয় করতে মরিয়া প্রচার চালাতে শুরু করলো।
১৮ ডিসেম্বরের হরতালে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জামাত-শিবির চক্র। খালি মাঠে তারা যেভাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল, সেখানে তাদের সহিংস হরতালের চেয়ে তাদেরই বিরুদ্ধে ১৮ ডিসেম্বরের শান্তিপূর্ণ হরতালে অভূতপূর্ব সাফল্য হাতেনাতে একথাই প্রমাণ করে দিল যে, ব্যাপক দেশবাসী জামাত-শিবির নিষিদ্ধ হোক তা চায়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে দৃঢ় গণরায় আবার প্রকাশিত হল। পায়ের নিচে থেকে মাটি সরে যেতে থাকায় তারা তাই ভয়ঙ্কর ভীত ও সাথে সাথে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে হরতালের সাফল্যকে ম্লান করে দিতে উঠে পড়ে লাগলো। আওয়ামী নেতাদের বাচালতা তাদেরকে এক্ষেত্রে সুযোগ করে দিল। হরতালের সাফল্যকে ম্লান করে দেখানোটা জামাতের জন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার সহিংস তত্পরতা অব্যাহত রাখার জন্য অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ায়, তারা তাই আরো জোরে রব উঠাল যে, এই হরতার ছিল ‘সরকারি হরতাল’।
কিছু অতিবামপন্থি তাদের চিরায়ত চরিত্র নিয়ে জামাতের বিরুদ্ধে কলম না ধরে কমিউনিস্টদের সফল হরতালকে ‘সরকারি হরতাল’ বলে চিত্রায়িত করে লেখা ও টকশোতে অপপ্রচার চালাতে শুরু করলো। সুশীল সমাজের একাংশ ও তাদের মুখপত্রগুলো দেখল, এতো সর্বনাশা কাণ্ড! হরতালের সাফল্য সামনে চলে আসলে তো একথাই প্রমাণ হয়ে যাবে যে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে বাদ দিয়ে দেশে ‘অরাজনৈতিক’-এর বদলে একটি রাজনৈতিক বিকল্প সম্ভব এবং তার উত্থান শুরু হয়েছে। তাহলে তাদের এক-এগারো মার্কা বিরাজনীতিকরণের ফর্মূলার আর কোনো দাম থাকবে না। তারাও ‘সরকারি হরতাল’ বলে জামাত-বিএনপির চালানো অপপ্রচারে যোগ দিল। ‘সরকারি হরতালের’ মিথ্যা অপপ্রচারের উত্স হলো এসব হরেক রকমের শক্তির বিভিন্ন ধরনের উদ্দেশ্য।
অনেকের মনে একটি আন্তরিক প্রশ্ন হল, সরকারের সাথে যোগসাজশ ছাড়া এতো কম কর্মী ও পিকেটার দিয়ে হরতাল এতো সফল হওয়া সম্ভব কি? হ্যাঁ, তা সম্ভব। ১৯৬৬ সালের ৭ জুনের ৬ দফার হরতালে আমি নিজে পিকেটিং করতে যেয়ে গ্রেপ্তার হয়েছিলাম। আমি দেখেছি, সেদিন পিকেটারের সংখ্যা ছিল অতি নগণ্য। ১৮ ডিসেম্বরের হরতালের পিকেটারদের সংখ্যার চেয়ে এক-দশমাংশের কম। কিন্তু সাধারণ মানুষ ছিল হরতালের দাবির পক্ষে। সেদিনের সে হরতাল পরিণত হয়েছিল জনগণের হরতালে। হরতাল সফল হওয়ার জন্য সহিংস সন্ত্রাস সৃষ্টির চেয়ে জনগণের সমর্থন পাওয়াটাই যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সে কথা ১৯৬৬-এর ৭ই জুনের হরতালের মতো ২০১২-এর ১৮ই ডিসেম্বরের হরতালের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।
দেশে আজ রাজনৈতিক বিকল্প শক্তি জাগতে শুরু করেছে। ১৮ ডিসেম্বরের হরতাল নিয়ে যে যাই বলুক, যতো আক্রমণ বা অপপ্রচারই চালাক, দেশে বাম-গণতান্ত্রিক শক্তির উত্থান কেউ রোধ করতে পারবে না। ১৮ ডিসেম্বরের সফল হরতালের মধ্য দিয়ে তার আগমনী বার্তা ধ্বনিত হয়েছে।
লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)
E-mail : selimcpb@yahoo.com