জীবন নিয়ে এ খেলা কবে শেষ হবে!

সমপ্রতি বিরোধী দলের অবরোধের প্রেক্ষিতে সারাদেশে তিনজন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে পুরোনো ঢাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ কর্তৃক বিশ্বজিত্ হত্যকাণ্ড সারাদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। বিশ্বজিত্ হত্যকাণ্ডের সাথে জড়িত কতিপয় ছাত্রনামধারী সন্ত্রাসী ধরা পড়েছে। বাকিরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তবে আলোচিত এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের হত্যাকারীরা শাস্তি পাবে কিনা সেই প্রশ্ন এখন জনমনে। কারণ প্রথম থেকেই সরকারের উপরমহলের কতিপয় ব্যক্তি হত্যাকারীদের বাঁচানোর চেষ্টা করছে। সর্বশেষ প্রশ্নবিদ্ধ ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন সেই আশংকাকে সত্যি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করল। এই ঘটনার অল্পকাল পূর্বে সাভারের নিশ্চিতপুরে তাজরিন ফ্যাশন নামক এক তৈরি পোশাক কারখানায় আগুন লেগে ১১১ জন (মতান্তরে ১২৪ জন) এবং চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে নির্মাণাধীন উড়াল সড়কের গার্ডার ভেঙ্গে ১২ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। অন্য দুর্ঘটনাগুলোর মত এই ঘটনাগুলো ঘটার পর সরকার ও বিরোধী দলের উপরমহলের টনক নড়েছে। তাজরিন ফ্যাশন ও বহদ্দারহাটের দুর্ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী সংসদে আশংকা প্রকাশ করে বলেছিলেন “জানি না জীবন নিয়ে এ খেলা কবে শেষ হবে।” প্রধানমন্ত্রীর এই আশংকাই সত্যি হল। বিরোধী দলের ডাকা অবরোধের দিন তিন তিনটি তাজা প্রাণ ঝরে গেল। এই ঘটনার পর আমরাও প্রধানমন্ত্রীর মত আতংকিত। উদভ্রান্ত। দিকহারা পথিক। না জানি কখন অকালে বিনা দোষে থেমে যায় আমাদের জীবন প্রদীপ। মনে প্রশ্ন জাগে, এই রকম জীবন নিয়ে খেলা বন্ধ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর কী কিছুই করার নেই? তারা কী অন্য সব ঘটনার মত এই ঘটনাতেও একে অপরের উপর দোষ চাপিয়ে সত্যকে আড়াল করবেন! চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী কাদের দায়ী করবেন? সেখানে তো নিজ দলের নেতার নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতা, দুর্নীতি ও অবহেলার কারণে উক্ত ঘটনা ঘটেছে। আর পুরোনো ঢাকায় নিরীহ দোকানদার বিশ্বজিত্ দাসকে হত্যা করেছে ছাত্রলীগের কর্মীরা। যা তদন্ত ছাড়াই সূর্যালোকের মত স্পষ্ট। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ প্রায় নিয়মিতই মারা পড়ছে নানা দুর্ঘটনাতে। উড়াল সড়ক ভেঙ্গে, লঞ্চ ডুবে, রেল-বাস-ট্রাক-টেম্পু অ্যাক্সিডেন্টে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। এই রক্তের হোলি খেলা এত বিস্তৃত হয়েছে যে সমাজের সব স্তরে মরণব্যাধি হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই ব্যবসায়ীরা নিরাপদ নয় তার প্রতিপক্ষের কাছে। ব্যক্তিগত স্বার্থে টান পড়লে একে অপরকে না ফেরার দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে। রাজনীতিবিদরা বসে নেই। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে পাড়ার উঠতি মাস্তানদের পুষছে। প্রয়োজনে তাদের দ্বারা প্রতিপক্ষের বুকে গুলি চালাচ্ছে। এভাবে ক্যাম্পাস থেকে রাজপথ। লঞ্চঘাট থেকে শোবার ঘরের খাট। কোথাও কারোর নিরাপত্তা নেই। যেন মৃত্যু উপত্যকাতে আমাদের বসবাস! প্রকৃতপক্ষে, এদেশে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতের কর্মীদের চরিত্রগত কোন পার্থক্য নেই। যারাই ক্ষমতায় যাচ্ছে তারাই দেশের জনগণের স্বার্থকে ভুলে আখের গুছাতে মত্ত হয়ে উঠছে। তাই প্রতি সরকারের সময় সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। দুর্নীতি-সন্ত্রাস-লুটপাটের বিষবাষ্পে মানুষ সর্বস্বান্ত হচ্ছে। নিমতলী বা রায়েরবাজারের বস্তিতে আগুন লাগার মত ঘটনা ফি-বছর ঘটছে। র্যাংগস ভবন ধসে শ্রমিক নিহত হওয়ার পর আমাদের স্পেকটার্ম ভবন ধসে শ্রমিক নিহত হওয়ার নির্মম ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায় নানা দুর্ঘটনায় মানুষ নিহত হওয়ার সংবাদ বিদঘুটে বিজ্ঞাপনগুলোর মত নীরবে সহ্য করতে হচ্ছে। প্রতিভাবান সাংবাদিক মিশুক মুনির, চলচ্চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদ নিহত হওয়ার পর সরকারের উচ্চমহল থেকে সড়কের উপর দোষ চাপিয়ে খুনি ড্রাইভারের পক্ষে সাফাই গাইছে। উপরন্তু, আওয়াজ করে বলছে, ড্রাইভারদের প্রশিক্ষণের দরকার কী? গরু-ছাগল চিনলেই তাদের লাইসেন্স দেয়া যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের আমরা এসব বিবেকহীন মানুষদের দ্বারাই শাসিত হচ্ছি। সরকার যতই সব ঘটনার মধ্যে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আবিষ্কার করুক না কেন আমরা দৃঢ়কণ্ঠে বলতে চাই এর দায়ভার রাষ্ট্র তথা সরকার এড়াতে পারে না। কারণ এসব ঘটনা বার বার ঘটতো না যদি সরকার তার যথাযথ দায়িত্ব পালন করত। অদক্ষ, দুর্নীতিবাজ, লোভী, মুনাফাখোর দলীয় লোকদের সব বিষয়ে নাক গলাতে না দিতো। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের কঠোর শাস্তি প্রদান করতো। বছরের পর বছর এমন ঘটনা ঘটছে। কিন্তু অবাক ব্যাপার হচ্ছে সব দায়িত্বশীলরা ঘটনা ঘটার পর হা-হুতাশ করছেন। কেউ বলেছেন, ‘আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে।’ কেউবা ‘বেডরুমে পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়।’ কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বিধানে কেউই কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। বরং মেতে উঠেছেন এইসব ঘটনাকে পুঁজি করে নোংরা রাজনীতির খেলায়। খুঁজছেন ক্ষমতা যাওয়ার অথবা টিকে থাকার পথ। লেখক :শিক্ষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় salah.sakender@gmail.com