অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আমদানি হ্রাসের প্রবণতা

খবরে প্রকাশ, আমদানি ব্যয় কমিয়া যাওয়ায় বাজারে মার্কিন ডলারের চাহিদা কমিয়া গিয়াছে। ইহার প্রমাণ পাওয়া গিয়াছে, গত এক বত্সরে ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য প্রায় ৫ শতাংশ বাড়িয়া যাওয়া হইতে। সরকারের বৈদেশিক বাণিজ্য একাউন্টের ক্ষেত্রে বাণিজ্য ঘাটতি কিছুটা কমিয়া যাওয়ার মধ্যেও ইহার প্রমাণ মিলিতেছে। ইহার ফলে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা বাড়িয়া যাওয়ার কথা। রিজার্ভ বাড়িবার আরেকটা কারণ হইল, প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ অর্থাত্ রেমিট্যান্স বাড়িয়া যাওয়া। এইসবের ফলেই আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়িয়াছে। ফলে ইহা আমাদের জন্য অনেকটা স্বস্তিদায়ক বিষয়। তবে যেভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের কিছুটা উন্নতি ঘটিয়াছে তাহার মধ্যে অস্বস্তিদায়ক বিষয়ও রহিয়াছে। আর সেই অস্বস্তির বিষয় হইল আমদানি কমিয়া যাওয়া। গত বত্সরের একই সময়ের তুলনায় আমদানির প্রবৃদ্ধি কমিয়া যাওয়া। এই প্রবৃদ্ধি কমিয়া যাওয়ার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব কিন্তু ভাল নয়। বাংলাদেশের আমদানির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ হইল মূলধনী দ্রব্য ও উত্পাদনের উপকরণসমূহ। যেমন, আমরা বাহিরে যে পোশাক রফতানি করিয়া আঠার-বিশ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করিতেছি তাহার জন্য আমাদেরকে বাহির হইতে বেশ অনেক বিলিয়ন ডলারের কাপড় আমদানি করিতে হইতেছে। ফলে যেকোন আমদানি কমিয়া যাওয়া অর্থনীতির জন্য সুখবর নয়। আমদানির বাকি এক-চতুর্থাংশের অর্ধেক নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও বাকি অর্ধেক বিলাসদ্রব্য। কম আমদানি ভাগে ভাগে দেখিলে আমাদের উত্পাদনের সহিত সংশ্লিষ্ট আমদানি কমিয়া যাওয়ার প্রমাণ মিলিবে। ফলে আমাদের খেয়াল রাখিতে হইবে যে, ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধির জন্য যে আমদানি তাহা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় আমাদের মুদ্রানীতির কারণে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটারি পলিসি স্টেটমেন্ট প্রতি ৬ মাস অন্তর পরিবর্তন করা হয় যাহাতে মুদ্রানীতির পরিবর্তন ও তাহার কারণ ব্যাখ্যা করা হয়। গত কয়েক বত্সরে বেশ কয়েকবারের এই স্টেটমেন্ট দেখিলে দেখা যাইবে এইগুলিতে আমদানিকে বিভিন্ন নীতির দ্বারা নিরুত্সাহিত করা হইয়াছে। এই নিরুত্সাহিতকরণ কেবল বিলাসদ্রব্যের ক্ষেত্রে হইলে সমস্যার কোন কারণ নাই। তবে তাহা যদি সকল আমদানিজাত দ্রব্য ও সেবা সামগ্রীর ক্ষেত্রে হয় তবে তাহা নিকট ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধিতে বিরূপ প্রভাব ফেলিবে। গত বেশ কিছুদিন হইতে মূলধনী দ্রব্যের আমদানির ক্ষেত্রে এলসি খোলা কমিয়া গিয়াছে বলিয়া খবর প্রকাশিত হইয়াছে। এ সকল দ্রব্যের আমদানির এলসি খোলা কমিয়া গেলে তাহার প্রভাব সঙ্গে সঙ্গেই অর্থনীতিতে পড়িবে না। তাহার প্রভাব পড়িবে আরও ছয় মাস কিংবা নয় মাস পরে। ফলে আমদানি কমিয়া যাওয়ার কারণে অর্থনীতির উপর কোন বিরূপ প্রভাব পড়িতেছে না এই ধরনের উপসংহার টানা অনেক সময়ই ভুল। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের উচিত অর্থনীতির এই চালকগুলির ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে ইহাদের পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের কথা বা চিন্তা মাথায় রাখা। বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা অবশ্যই আমাদের অন্যতম লক্ষ্য। তবে তাহার চাইতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হইল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে ধারা আমরা বজায় রাখিতে চাহিতেছি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাঁচাইয়া যে মধ্যম আয়ের দেশে পাড়ি দিতে চাহিতেছি তাহা হইতে যেন আমরা বিচ্যুত না হই। প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় থাকিলে সম্পদের কিছুটা পুনর্বণ্টন দ্বারা জনকল্যাণ করা সম্ভব। দারিদ্র্য বিমোচনে বেশখানিক সরকারি সম্পদ বরাদ্দ দেওয়াও সম্ভব। প্রবৃদ্ধি বাড়িলে করআয়ও সমানুপাতিক হারে বাড়িবে। ফলে সরকারের হাতে অধিক সম্পদ থাকিবে জনকল্যাণে ব্যয় করিবার জন্য।