বড়দিনের বাণী :যীশু খ্রিস্ট ও মানবাধিকার
প্রকাশ : ২৪ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৫৮
প্রকৃতির বিধানে বর্ষ পরিক্রমায় বড়দিন ফিরে আসে যেন অন্ততপক্ষে আমরা যারা যীশু খ্রিস্টকে মানবজাতির পরিত্রাতারূপে বিশ্বাস করি, তারা চিন্তা-চেতনায় ও অন্তরাত্মায় এদিনের তাত্পর্যকে উপলব্ধি করে খ্রিস্টের আদর্শকে অনুসরণ করতে চেষ্টা করি। প্রথাগতভাবে এদিনটি পালিত হয় যীশু খ্রিস্টের জন্মবার্ষিকীরূপে। মানুষের সামগ্রিক পরিত্রাণ ও কুশলের জন্য নিঃস্বার্থ প্রেম ও ত্যাগের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষাগুরু ঈশ-মানব খ্রিস্ট জন্মেছিলেন নিতান্ত এক অসহায় ও দরিদ্রতম অবস্থায়। কিন্তু স্বর্গের দূতেরা তাঁর জন্মবারতা জানিয়ে সেদিন গেয়েছিল, “ঊর্ধ্বলোকে ঈশ্বরের মহিমা এবং পৃথিবীতে তাঁহার প্রিয়পাত্র মনুষ্যদের মধ্যে শান্তি।”
নিজের বিষয়ে খ্রিস্ট বলেছিলেন, “শৃগালদের গর্ত আছে, এবং আকাশের পক্ষীদের বাসা আছে, কিন্তু মনুষ্যপুত্রের মস্তক রাখিবার স্থান নাই” (লুক ৯:৫৮)। যিনি স্রষ্টা ও শাশ্বত ঈশ্বর দীন-দরিদ্র বেশে সৃষ্টির মধ্যে সৃষ্টরূপেই তিনি হয়েছিলেন আবির্ভূত। খ্রিস্টের শিষ্য পৌল তাঁর বিষয়ে লিখেছেন, “ঈশ্বরের স্বরূপবিশিষ্ট থাকিতে তিনি ঈশ্বরের সহিত সমান থাকা ধরিয়া লইবার বিষয় জ্ঞান করিলেন না, কিন্তু আপনাকে শূন্য করিলেন, দাসের রূপ ধারণ করিলেন, মনুষ্যদের সাদৃশ্যে জন্মিলেন এবং আকারে-প্রকারে মনুষ্যবত্ প্রত্যক্ষ হইয়া আপনাকে অবনত করিলেন; মৃত্যু পর্যন্ত, এমনকি, ক্রুশীয় মৃত্যু পর্যন্ত আজ্ঞাবহ হইলেন” (ফিলিপীয় ২:৬-৮)। পবিত্র বাইবেল সাক্ষ্য দেয় যে, যীশু জন্মের পরেই রাজা হেরোদ তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেন। তাই নবজাত শিশুকে রক্ষা করার জন্য পিতা-মাতা ও মানবাধিকারবঞ্চিত যোসেফ ও মরিয়ম যীশুকে নিয়ে মিসরে উদ্বাস্তুর আশ্রয় নেন । যীশুর খোঁজ না পেয়ে সেদিন হেরোদের জল্লাদ বহু নিরপরাধ শিশুকে হত্যা করেছে। জন্ম থেকেই যীশু ছিলেন মৌলিক অধিকারহারা একটি মানুষ। এভাবেই কেটেছে তাঁর পার্থিব জীবন। আর একদিন সমাজের ধর্মান্ধ ও কুটিল মানুষ প্রহসনমূলক এক বিচারের রায়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে তাঁকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সর্বত্রই খ্রিস্ট হয়েছিলেন অপমানিত ও মানবাধিকারবঞ্চিত। খ্রিস্টের জন্ম, জীবন ও কাজকে মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার একটা সঙ্গত কারণ আমরা সব সময়ই উপলব্ধি করি। খ্রিস্ট বিশ্বাসানুসারে তিনি মানবজীবনকে চূড়ান্ত মূল্যে ভূষিত করেছেন তাঁর মানবদেহ ধারণে।
যীশু খ্রিস্ট ঈশ্বরের স্বর্গীয় প্রেমকে চূড়ান্তরূপে প্রকাশ করেছেন তাঁর বাক্যে, শিক্ষায় ও মানুষের জন্য তাঁর সেবার কাজে। যেখানেই মানুষ অত্যাচারিত ও অধিকারবঞ্চিত হয়েছে সেখানেই তিনি তাঁর অধিকারে তাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পবিত্র বাইবেলের শিক্ষা অনুসারে মানুষ ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি (Image)। তার মানে মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের বিষয়ে চিন্তার আত্মিক শক্তি আছে, আছে ঈশ্বরের নৈতিক গুণাবলী, যথা:পবিত্রতা, প্রেম, ন্যায্যতা, বিবেক-বুদ্ধি, যুক্তি ইত্যাদি। যীশু খ্রিস্ট মানুষের বেশে এসে মানুষের দুঃখ-কষ্টের অভিজ্ঞতাকে আপন করে নিয়েছেন, যেন মানুষ ঈশ্বরকে ও তাঁর প্রেমকে জানতে পারে এবং ঈশ্বরের সঙ্গে ও অন্য মানুষ এবং প্রকৃতির সঙ্গে সুসম্পর্কে বাস করতে প্রেরণা লাভ করে। বাইবেলে বলা হয়েছে, ঈশ্বর মানুষের সকল দুঃখে দুঃখিত। খ্রিস্টপূর্ব ৮ম শতকের নবী যিশাইয় তাই বলেছিলেন, “ তাহাদের সকল দুঃখে তিনি দুঃখিত হইতেন” (যিশাইয় ৬৩ঃ৯)। ঈশ্বর সমস্ত মানুষের, সকল মানুষই তাঁর প্রেম ও অনুগ্রহের পাত্র। তিনি চান যেন মানুষ তাঁর ন্যায্যতা ও ধার্মিকতার শিক্ষানুসারে জীবনযাপন করতে আন্তরিক হয়।
খ্রিস্টের শিক্ষায় ঈশ্বরে বিশ্বাসের বিষয়টি মানবপ্রেমের ও মানব মর্যাদার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। খ্রিস্টানদের মধ্যে রোমান ক্যাথলিক, অর্থোডক্স ও বিভিন্ন উপভাগে বিভক্ত প্রটেস্ট্যান্ট, এই তিন বিভাগের সকলেই মানুষের মৌলিক মানবাধিকার প্রশ্নে একমত। তাদের মধ্যে ঈশতাত্ত্বিক বা খ্রিস্টতাত্ত্বিক বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয়ের পার্থক্য থাকলেও তাদের সকলের কাছে মানুষের মানবাধিকারের যে কোন লঙ্ঘন নিন্দনীয়। দুঃখের বিষয় এই যে, পাশ্চাত্যের অনেক তথাকথিত খ্রিস্টিয়ান দেশ তাদের উপনিবেশবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী চিন্তার কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে মানুষের মানবাধিকারকে লঙ্ঘন করে আসছে । এখানে উল্লেখ করা ভাল যে, ঐ সমস্ত দেশ খ্রিস্টধর্মীয় কোন মূল্যবোধে তাড়িত হয়ে নয়; কিন্তু তাদের জাতিগত অহমিকা ও বাণিজ্যিক স্বার্থেই এরূপ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে।
খ্রিস্টীয় চিন্তায় মানবাধিকারের মূলে আছে এই বিশ্বাস যে, সকল মানুষকে ঈশ্বর তাঁর সমস্ত সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ প্রাণীরূপে সৃষ্টি করেছেন, তার মধ্যে তিনি দিয়েছেন তাঁর নৈতিক গুণাবলীর অংশ। তাই খ্রিস্টীয় নৃতত্ত্বের ভাষায় মানুষের অপমানে স্বয়ং স্রষ্টাও হন অপমানিত। ঈশ্বর স্বর্গে আছেন বলে আমরা বিশ্বাস করলেও তাঁর কাজ ও বিচরণ মানুষের মধ্যেই।
বড়দিন তাই আমাদের জন্য ঈশ্বরের বড় দান। কিন্তু এ দানের অপর পিঠে লেখা আছে বড় প্রতিবাদের একটা কথা। খ্রিস্ট মানুষকে দিয়ে মানুষের প্রতি মানুষের সকল প্রকার অমানুষিকতার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। যেমন তিনি যুগে যুগে অন্যায় ও অধর্মের বিরুদ্ধে করেছেন টেলেমাখুসের মতো অনেকের মধ্য দিয়ে। যীশু খ্রিস্ট আচারসর্বস্ব ধর্মকর্ম ও সমস্ত প্রকার ভণ্ডামি এবং ধর্মীয় সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন। তাঁর কাছে মানুষের জীবনই ছিল প্রথম ও শেষ বিষয়। খ্রিস্টীয় বিশ্বাস এই, ঈশ্বর মানুষকে তার আদি ও আসল অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য পবিত্র আত্মার শক্তিতে মানুষ হয়ে জন্মেছিলেন। মানুষ সেই পবিত্র আত্মার প্রভাবে তার পাপ স্বভাবের উপরে জয়লাভ করে নতুন মানুষ হতে পারে। খ্রিস্ট তাঁর কথা ও কাজে জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও মর্যাদাভেদে সকল মানুষকে সমান চোখে দেখেছেন। পথের ভিখারী থেকে রাজপ্রাসাদের মানুষ পর্যন্ত তাঁর আশীর্বাদে গতানুগতিক জীবন থেকে নতুন জীবনের সন্ধান পেয়েছে। সকল মানুষের মধ্যে তিনি দেখেছেন স্রষ্টার প্রতিমূর্তি ও সাদৃশ্য। যেখানেই মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় সেখানেই সেই প্রতিমূর্তি হয় চূর্ণ-বিচূর্ণ। তা সে যে কারণেই হোক না কেন—ধর্মের নামে হোক, আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, গোত্রীয় বা যে কোন কারণেই হোক। ধর্মীয় গোঁড়ামি, রাজনীতি, ক্ষমতার দর্প ইত্যাদি নানা কারণেই ঐ বিনাশ ও ধ্বংসলীলা চলছে এখন রহমতের দেশে, রক্ত ও গোলা-বারুদের গন্ধে বিষাক্ত হয়েছে সে দেশটি। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ আজ তাদের ন্যায্য মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত। শান্তি ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য কতই না সম্মেলন ও কাগুজে চুক্তি হচ্ছে। তবু স্থায়ী শান্তির আশা যেন বড় দুরাশা।
আজ যখন মানুষে মানুষে হিংসা ও হানাহানি, পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে, বিশ্বমানব পরিবারে যেখানে মানবতার অবমাননা, তখন আমাদের প্রত্যেককেই অধিকার ও কর্তব্য—এ উভয়ের উপরেই গুরুত্ব দিতে হবে। যেখানে আজ ধর্ম, বর্ণ, জাতি, দল ও শ্রেণীতে হিংসা ও স্বার্থপরতা, সেখানেই ঈশ্বর ব্যথিত ও দুঃখিত। আজ যারা জীবন সংগ্রামে পর্যুদস্ত, যারা আজ ক্ষতবিক্ষত, ঈশ্বরের বিষয়ে তাদের সর্বোত্তম কথাগুলো হোক নৃতত্ত্বের ভাষায়। খ্রিস্টের সুসমাচারে মানুষের পরিপূর্ণ মর্যাদা রয়েছে কেন্দ্রীয় স্থানে। সামাজিক অন্যায্যতা যেখানে যতই প্রকট, সেখানে সামাজিক ধার্মিকতার গুরুত্ব ততই বাড়তে বাধ্য। সামাজিক ন্যায্যতা, মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও মানবীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার তাগিদ এখন তাই আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধের কেন্দ্রীয় বিষয়।
বাইবেলে ধর্মকর্মকে শান্তি, ন্যায্য আচরণ ও মানবাধিকারের সঙ্গে একসাথে দেখা হয়েছে। কারণ মর্ত্যের মানুষের অধিকারের উত্স স্বর্গে, যে স্বর্গ ছেড়ে পুত্র এলেন পিতার প্রেম জানাতে যেন মানুষের মধ্যে শান্তি ও প্রেমই হয় প্রথম ও শেষ কথা। মানুষের এমন কোন ব্যথা কি দুঃখ নাই, যা ঈশ্বর মোচন করতে পারেন না। মানুষকে কেবল বেছে নিতে হবে কোন পথে তার সেই শান্তি। অন্যায়, অপমান ও দুঃখকে ঈশ-মানব নিষ্পাপ খ্রিস্ট সহ্য করেছেন। তাকে সমর্থন করার জন্য নয়; কিন্তু আমরা যেন পাপের ঐসব কুফল আন্তরিকভাবেই বুঝতে পারি ও তা থেকে ফিরে তাঁর পথে চালি। যীশু খ্রিস্টের জীবন ও শিক্ষা আজ আমাদের সেদিকেই এগিয়ে দিক। খ্রিস্টের জন্মদিন দু’টি:একটি ২৫ ডিসেম্বর, প্রথাগতভাবে আমরা যেদিন তাকে পালন করি। অপরটির কোন নির্দিষ্ট দিনক্ষণ নাই। আমাদের অন্তরে তাঁর প্রেম ও পবিত্রতার আদর্শ যেদিন স্থান পায়, সেদিনই তিনি আমাদের মধ্যে জন্মলাভ করেন। কবির কথায় বলি, “নব আনন্দে জাগ, আজ নব আনন্দে জাগ, সব রবি জীবনে জাগ, শুভ্র সুন্দর প্রীতি উজ্জ্বল, নব আনন্দে জাগ।” খ্রিস্টের দিব্য জ্যোতিতে আমাদের জীবন হোক আলোকিত, হোক আলোড়িত।
লেখক : খ্রিস্টীয় ঈশতত্ত্ব মহাবিদ্যালয় বাংলাদেশের অধ্যক্ষ