মানুষ হয়ে যীশুর পৃথিবীতে আগমন

আমরা জানি, ‘যখন যীশু জগতে জন্মগ্রহণ করলেন তখন থেকেই তাঁর শুরু। কিন্তু ১ ও ২ পদ অনুসারে দেখা যায় যে, যীশু খ্রিস্ট সব সময় বর্তমান ছিলেন। ‘আদিতে বাক্য ছিলেন, এবং বাক্য ঈশ্বরের কাছে ছিলেন, এবং বাক্য ঈশ্বর ছিলেন। তিনি আদিতে ঈশ্বরের কাছে ছিলেন’। জগত্ শুরুর আগে থেকে যীশু ছিলেন, সেই বিষয়ে তিনি নিজে বলেছেন, ‘আমি তোমাদিগকে বলছি, অব্রাহামের জন্মের পূর্বাবধি আমি আছি।’ (যোহন ৮ ঃ ৫৮ পদ)। তিনি অনন্তকালীন অথবা তিনিই সৃষ্টিকর্তা, কারণ তিনি স বসময় বিরাজমান ছিলেন। এই অংশ বাইবেলের আরম্ভে যে কথা দিয়ে শুরু হয়েছিল তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ‘আদিতে ঈশ্বর আকাশমণ্ডল ও পৃথিবী সৃষ্টি করলেন’ (আদিপুস্তক ১ঃ১পদ)। ‘বাক্য’ শব্দের গ্রীক শব্দ হলো ‘লোগোস’ যা যীশু খ্রিস্টের প্রকাশকে বুঝায়। গ্রীক সভ্যতায় ‘লোগোস’ হলো যা সমস্ত কিছুর তাত্পর্য দিয়ে থাকে। আমরা যা চিন্তা করি তা আমাদের মুখ থেকে কথা বা কালাম হিসেবে বের হয়ে আসে। অর্থাত্ আমাদের চিন্তার প্রকাশ হলো মুখ। সুতরাং ঈশ্বরের মনের মধ্যে যা বিরাজ করছিল তা যীশুর মাধ্যমে সঠিকভাবে প্রকাশিত হলো। ঈশ্বর এবং মানুষের মধ্যে তিনিই হলেন সেই সেতু। আমার মনের মধ্যে যা কিছু আছে তা আজ আপনাদের কাছে প্রকাশ করতে চাই এবং এর মাধ্যম হিসেবে আমি শুধুমাত্র আমার কথাগুলোকে বা মুখকে ব্যবহার করতে পারি। একইভাবে চিন্তা করলে আমরা বুঝতে পারি যে, যীশু খ্রিস্ট হলেন ঈশ্বরের বাক্য বা কথা। প্রকাশিত বাক্য ১ ঃ ৮ পদে তিনি নিজের সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন যে, তিনিই আলফা এবং ওমগো। অর্থাত্ তিনিই শুরু এবং তিনিই শেষ। ‘বাক্য ঈশ্বরের সাথে ছিলেন’ যা আমাদের দিকনির্দেশনা দিচ্ছে যে, পিতা ঈশ্বরের সাথে সম্মুখাসম্মুখী যীশুর সম্পর্ক প্রকাশিত হয়েছে। ঈশ্বরের সাথে তাঁর শুধু ঘনিষ্ঠ সহভাগিতা ছিল তা নয়, ঈশ্বর ছিলেন ‘বাক্য’। এই স্বল্প পরিসরে বিশদ ব্যাখায় না গিয়ে শুধু এটুকু বলতে চাই যে, যীশু খ্রিস্ট ঈশ্বরের কোন সৃষ্টি ছিলেন না, কিন্তু তিনি নিজেই ঈশ্বর। তাই ১ ও ২ পদের সারসংক্ষেপ হলো, তিনি আরম্ভে ঈশ্বরের সাথে ছিলেন। তা হলো, এই শিশুটিই হলেন সৃষ্টিকর্তা। যীশু হলেন সৃষ্টিকর্তা ৩ পদে আমরা দেখতে পাই যে, যীশু একই সাথে সৃষ্টিকর্তা। আমরা কলসীয় পুস্তক থেকে যা শিখেছি এই পদ আমাদের সেখানে নিয়ে যায়। কলসীয় ১ঃ১৫-১৭ পদ—‘ইনিই অদৃশ্য ঈশ্বরের প্রতিমূর্ত্তি, সমুদয় সৃষ্টির প্রথমজাত, কেননা তাঁতেই সকলই সৃষ্ট হয়েছে; স্বর্গে ও পৃথিবীতে, দৃশ্য কি অদৃশ্য যা কিছু আছে, সিংহাসন হোক, কি প্রভুত্ব হোক, কি আধিপত্য হোক, কি কর্তৃত্ব হোক, সকলই তাঁর দ্বারা ও তাঁর নিমিত্ত সৃষ্ট হয়েছে। আর তিনিই সকলের অগ্রে আছেন, ও তাঁতেই সকলের স্থিতি হচ্ছে।’ যীশু একাধারে সৃষ্টিকর্তা এবং যোগানদাতা উভয়ই। যীশু জীবন ও জ্যোতি বাক্য ঈশ্বর ছিলেন, যীশু হলেন সৃষ্টিকর্তা, এবং তৃতীয়ত যীশু জীবন ও জ্যোতি। ৪-৫ পদ—‘তাঁর মধ্যে জীবন ছিল, এবং সেই জীবন মনুষ্যগণের জ্যোতি ছিল। আর সেই জ্যোতি অন্ধকারের মধ্যে দীপ্তি দিতেছে, আর অন্ধকার তা গ্রহণ করলো না।’ আদিপুস্তক ১ অধ্যায়ে শাস্ত্রের আরম্ভ হয়, দৃশ্যত অন্ধকার দিয়ে। আর সেই অন্ধকারকে দূর করার জন্য ঈশ্বর বললেন, ‘দীপ্তি হউক’। কিন্তু আদিপুস্তক ৩ অধ্যায়ে দেখা যায়, আধ্যাত্মিক অন্ধকার আমাদের জগেক নষ্ট করে দিয়েছে। কিন্তু এই অন্ধকারকে শুধুমাত্র প্রভু যিনি জীবন ও জ্যোতি তিনিই দূর করতে পারেন। অন্ধকারের মধ্যে জ্যোতি হিসেবে যীশু জ্বলছেন। এখনও যারা তাঁকে গ্রহণ করতে পারেনি তারা অন্ধকারে আছে এবং তারা তাঁকে বুঝতে পারছে না। আজকে অনেকে সত্যিকারের বড়দিনের তাত্পর্য উপলব্ধি করতে পারছেন না। কারণ সার্বিকভাবে জগতে যীশুর জন্য কোন জায়গা নেই। অন্ধকারের মধ্যে যদি একটি বাতি জ্বলে তখন অন্ধকার দূরে সরে যায়। কারণ অন্ধকার থেকে বাতির শক্তি বেশি। অন্ধকার বাতিকে ত্যাগ করতে পারে না। একবার যদি আপনার কাছে একটি বাতি থাকে তাহলে আরেকটির প্রয়োজন হয় না। শুধুমাত্র তারাই যারা অন্ধকারের মধ্যে আছে তারা যীশুকে বুঝতে পারে না, যিনি জীবন ও জ্যোতি। যোহন ১ঃ৬-৮ পদে যোহন বাপ্তাইজক ভাববাদির ভূমিকা সম্পর্কে আমরা জানতে পারি। তিনি অন্ধকারের মানুষগুলোর কাছে সেই জ্যোতি সম্পর্কে সাক্ষ্য দিতে এসেছিলেন। যেন তারা জ্যোতিকে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত হতে পারে। সেই জ্যোতির জন্য পথ প্রস্তুত করছিলেন। তিনি মানুষের কাছে আবেদন রাখলেন, যেন তারা পাপ স্বীকার করে। আর ৯ পদে বলা হয়েছে, যীশু খ্রিস্টই সত্যিকারের জ্যোতি হিসেবে প্রকাশিত হলেন, যেন প্রত্যেককে সেই জ্যোতি দিতে পারেন। দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের মধ্যে অনেকে অন্ধকারের মধ্যে বাস করতে পছন্দ করি। যীশু বিষয়টিকে এভাবে বর্ণনা করেছেন, যোহন ৩ঃ১৯-২০ পদ— ‘আর সেই বিচার এই যে, জগতে জ্যোতি এসেছে, এবং মনুষ্যেরা জ্যোতি হতে অন্ধকার অধিক ভালবাসিল, কেননা তাদের কর্ম সকল মন্দ ছিল। কারণ যে কেহ কদাচরণ করে, সে জ্যোতি ঘৃণা করে, এবং জ্যোতির নিকটে আসে না, পাছে তাঁর কর্ম সকলের দোষ ব্যক্ত হয়।’ যোহন সুসমাচারে জ্যোতি ও অন্ধকারের কথা বারবার বলা হয়েছে। আমাদের এর যে কোন একটাকে ভালবাসতে হবে, উভয়টিকে আমরা কিন্তু ভালবাসতে পারি না। আমরা এই জগত্ময় বাগানের অতিথি। বড়দিন আমাদের এই মহান সত্যটি মনে করিয়ে দেয়, যেন কখনও তা ভুলে না যাই। আনন্দের বিষয় হলো, আপনি বড়দিনের এই মহা অনুগ্রহের ভাগিদার হতে পারেন, যদি আপনি তাঁকে আপনার জীবনে গ্রহণ করেন। এই বিষয়টি কোন মাংসিক বা জাগতিক বিষয় নয়। এটি হলো এক মহা আধ্যাত্মিক বিষয়। খ্রিস্ট ধর্ম কারো বানানো গল্প বা তৈরি কিছু নয় যে, হঠাত্ করে তা এসে গেছে। ঈশ্বরের কোন জাগতিক জন্ম নেয়া সন্তান নেই। কোন না কোনভাবে আপনি অবশ্যই যীশুকে মুক্তিদাতা ও প্রভু হিসেবে বিশ্বাস ও গ্রহণ করেছেন। কিন্তু আমাদের যীশুর বাস্তবতাকে গ্রহণ করে নতুন জন্ম লাভ করতে হবে। তাহলেই আমরা সত্যিকারের বড়দিনের বিষয় বুঝতে পারবো। সত্যিকারে বড়দিনের জ্ঞান আপনি যা জানেন তা প্রকাশ করে না ;কিন্তু আপনি যাঁকে জানেন তাই প্রকাশ করে। তাই মূল বিষয় আপনি কতটুকু তথ্য জানেন তা নয় কিন্তু জীবনের আমূল পরিবর্তন। আমরা অধিকাংশ যথেষ্ট তথ্য জানি, শাস্ত্র জানি, তবে প্রয়োজন শুধুমাত্র সিদ্ধান্ত নেয়া। আপনি যেন এই বড়দিনের সবচেয়ে মহান পুরস্কারটি গ্রহণ করার সুযোগ নিতে পারেন, সেই আহ্বান জানিয়ে আমি আমার আলোচনাটি সমাপ্ত করছি। আর সেই পুরস্কারটি হলো যীশু খ্রিস্ট। তিনি আপনার নাম নিয়ে ডাকছেন এবং আপনার জীবনের দরজায় কড়া নাড়ছেন। আপনি কি তাঁকে ভিতরে প্রবেশ করতে দিবেন? আপনি কি তাঁকে গ্রহণ করবেন? শাস্ত্র এই কথা বলে, যদি আপনি তাঁকে গ্রহণ না করেন তাহলে আপনি তাঁকে সত্যি পরিত্যাগ করছেন। যদি আপনি তাঁকে বিশ্বাস ও গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকেন তাহলে প্রার্থনার মাধ্যমে তাঁকে গ্রহণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানাতে পারেন।  লেখক :সম্পাদক, পাক্ষিক সময়ের বিবর্তন