[ উ ন্ন য় ন]
মেট্রোরেলে যেন পদ্মা সেতুর নাটক মঞ্চস্থ না হয়
প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৫০
অতি সম্প্রতি যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেল নির্মাণের কাজ শীঘ্রই শুরু হবে বলে ঘোষণা করে পদ্মা সেতুর স্বপ্নভঙ্গের বেদনা কিছুটা লাঘব করেছেন। অনুমান করা যাচ্ছে যে, পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের বিষয়ে নানা উদ্বেগ-উত্কণ্ঠায় সৃষ্ট ক্ষত কিছুটা প্রশমিত হবে উত্তরা-মিরপুর-মতিঝিলে জাপানী অর্থায়নে সম্প্রতি ঘোষিত মেট্রোরেল প্রকল্পে। গত ৩ ডিসেম্বর এন.ই.সি সম্মেলন কক্ষে ই.আর.ডি ও জাইকার যৌথ সংবাদ সম্মেলনে উত্তরা হতে মতিঝিল পর্যন্ত ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রীর যাতায়াত নির্বিঘ্ন করার মেট্রোরেলের স্থাপনা, অর্থায়ন, ব্যবস্থাপনা ও কলা-কুশলতার ব্যাপারে বাংলাদেশ-জাপানের দ্বিপাক্ষিক অংগীকার ব্যক্ত করা হয়। নিঃসন্দেহে প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির লক্ষ্য অর্জনে সাম্প্রতিক সময়ের ক্ষয়িষ্ণু ভূমিকায় নব-উজ্জীবিত প্রতিশ্রুতি বিযুক্ত করেছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে অর্থনৈতিক কূটনীতির তাত্পর্য ও যৌক্তিকতা স্বাধীনতা-উত্তর সময় থেকেই অনুভূত হয়েছে। এ কারণে স্বাধীনতার অব্যবহিত পর স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পররাষ্ট্রনীতিতে যুদ্ধবিক্ষত দেশটির পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের অগ্রাধিকার সন্নিবেশিত হয়। সমাজতান্ত্রিক ও কম্যুনিস্ট রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সহযোগিতা না পেয়ে বঙ্গবন্ধু পাশ্চাত্য পুঁজিবাদী এবং মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির বিস্তৃতির নীতি গ্রহণ করেন। সত্তর দশকের শেষের দিকে এ উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিতে বহুমুখীকরণ প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত করে অর্থনৈতিক কূটনীতির প্রযোজ্যতার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রদান করা হয়।
এরপর থেকে অদ্যাবধি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির প্রযোজ্যতা পরিলক্ষিত হয়ে আসছে সকল সরকারের গৃহীত পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে। একবিংশ শতাব্দীতে অর্থনৈতিক কূটনীতিকে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত করা হয়।
নজিরবিহীন সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনার মহাজোট সরকার গঠন করেন, যার অন্যতম অংগীকার ছিল পদ্মা সেতু নির্মাণ। কিন্তু এ প্রকল্পে সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাবৃন্দের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির কারণ দেখিয়ে বিশ্বব্যাংক প্রতিশ্রুত অর্থায়ন স্থগিত করে। এর ফলে বাংলাদেশের জনগণের দীর্ঘ প্রতিক্ষিত পদ্মা সেতুর স্বপ্নভঙ্গ হয় এবং মহাজোট সরকারের স্বচ্ছতার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অভিঘাত সৃষ্টি হয়। এমনি প্রেক্ষিতে সদ্য-ঘোষিত মেট্রোরেল প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের প্রতিশ্রুত সাহায্যের দ্বিগুণ পরিমাণ বিরাট অংকের অর্থ-সহযোগিতার জাপানি প্রতিশ্রুতিকে মহাজোট সরকারের অর্থনৈতিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে প্রদর্শন করার ঐতিহাসিক সুযোগ এখন সরকারের হাতে।
মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ২৭০ কোটি ডলারের সিংহভাগ যোগান দিতে সম্মত হয়েছে জাপান সরকার। গত ৩ ডিসেম্বরের যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জাইকার ভাইস প্রেসিডেন্ট তোশিয়ুকি কোরিওনাগি মেট্রোরেল প্রকল্পে ২১০ কোটি ডলার অর্থায়নের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে জাপান-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন দিগন্তের সূচনা করেন। তিনি উক্ত সাহায্যকে জাপানি জনগণের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি শুভেচ্ছা হিসেবে অভিহিত করে বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের অংশীদারিত্বের অকপট ও নির্মল প্রতিজ্ঞা দ্বিরুক্ত করেন। বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের এ সোনালী অধ্যায়ে জাপানের চাওয়া-পাওয়া পূরণ করার মনোজাগতিক, দৈহিক ও বাস্তবিক প্রস্তুতি প্রমাণ করার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এখন বাংলাদেশ সরকারের স্কন্ধে। এ দায়িত্ব পালনে যদি বাংলাদেশ ব্যর্থ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে জাপানি সহযোগিতার সম্ভাবনাময় খাতসমূহে বাংলাদেশের নেতৃত্ব-ব্যর্থতাকেই মূল প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হবে, যা বাংলাদেশ - জাপান সম্পর্কে নানা অনিশ্চিতি ও বেদনার্তি যোগ করবে।
প্রস্তাবিত মেট্রোরেল যানজট কবলিত রাজধানী নগরীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় নবদিগন্তের সূচনা করবে। জাইকা ভাইস প্রেসিডেন্ট তোশিয়ুকি নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনায় বলেন, গাজীপুর থেকে ঢাকা আসতে তাঁর অভিজাত ল্যান্ড ক্রুজারে যদি সময় লাগে তিনঘণ্টা তাহলে গণপরিবহনে ৪/৫ ঘণ্টা লাগার কথা। অথচ মেট্রোরেল চালু হলে এ পথ পাড়ি দেওয়া সম্ভব হবে মাত্র আধা ঘণ্টায়। এ হিসেবে প্রতিঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রীর অসংখ্য কর্মঘণ্টা সঞ্চিত থাকবে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিশ্চিত করবে।
জাপানের বৈদেশিক সাহায্যদানের প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে জানা যায়, কোন প্রকল্পে অর্থায়নের সিদ্ধান্তের পূর্বে প্রচুর সময় নিয়ে তারা ঐ প্রকল্পে তাদের যুক্ততার যৌক্তিকতা যাচাই করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। মেট্রোরেল প্রকল্পে জাইকার সহযোগিতার চূড়ান্ত ঘোষণা থেকে অনুধাবন করা যায়, একই প্রক্রিয়ায় তারা উক্ত প্রকল্পে সাহায্যের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চলতি অর্থবছরে প্রকল্পের নীলনকশা প্রণয়ন ও আনুষঙ্গিক পরামর্শ সেবার কাজে অর্থ জোগানোর জন্য প্রাথমিকভাবে ৭০ লাখ ডলার অর্থছাড়ের ঘোষণা দেয়া হয়েছে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে। উক্ত সংবাদ সম্মেলনে জাইকার প্রধান প্রতিনিধি তাকাউ তোদাও উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ঢাকা যানবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ সূত্রে অবগত হওয়া যায় যে, বার্ষিক ১ শতাংশ সুদে ১০ বছরের রেয়াতিকালসহ জাইকার ঋণ পরিশোধের মেয়াদ হচ্ছে ৪০ বছর। ২০১৩ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত জাইকা ঋণের অর্থছাড় করবে। ২০২২ সাল থেকে দুটি বার্ষিক কিস্তিতে এ ঋণ ২০৫১ সালের জুলাই পর্যন্ত পরিশোধ করতে হবে।
বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে ধারা অব্যাহত রয়েছে তা অক্ষুণ্ন রাখতে প্রস্তাবিত প্রকল্পে জাপানের প্রত্যাশাকে সর্বাংশে পূরণ করার চেষ্টা করতে হবে। জাপানিরা অত্যন্ত ভদ্র, মার্জিত ও রুচিশীল। জাপানি মূল্যবোধে যে অকপটতা তাদেরকে বিশ্বসমাজে বিরল নজিরবিহীন সম্মান ও শ্রদ্ধা এনে দিয়েছে, সেই বিষয়ের স্পর্শকাতরতার ব্যাপারে প্রকল্পের সাথে সম্পৃক্ত সকলকে সতর্ক থাকতে হবে। দাতা-গ্রহীতার সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে নির্ভরশীলতার অভিযোগ সর্বজনবিদিত, জাপানি সাহায্য সূত্রে তা অনেকটাই অনুপস্থিত। সেই বিবেচনা থেকে উক্ত প্রকল্পে জাপানের সংশ্লিষ্টতাকে বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের নানা পর্যায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে সর্বাংশে। এক্ষেত্রে এতটুকু অস্বচ্ছতা পরিলক্ষিত হলে যদি জাপানিরা ‘দামে’ (দুঃখিত) শব্দটি উচ্চারণ করার অনুভূতিও প্রকাশ করে, তাহলে তা হবে বাংলাদেশের জাতীয় দুর্ভাগ্য, যা জাপান-বাংলাদেশ সম্পর্কে চিরন্তন অভিশাপের কালিমা লেপন করবে।
বাংলাদেশ সরকার বিলম্বে হলেও বিশ্বব্যাংকের স্বচ্ছতার পর্দা ছিন্নকারী আমলা, মন্ত্রী, এমপিদের বিরুদ্ধে আরোপিত অভিযোগের তদন্ত শুরু করে সরকারের স্বচ্ছতার নির্মল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে চলেছে। গত ৪ ডিসেম্বর জাতীয় পত্রিকাসমূহে সাবেক মন্ত্রী আবুল হোসেনসহ ১২ জনের নামে মামলা করা সংক্রান্ত দুদকের অনুসন্ধান দলের সিদ্ধান্তের খবর প্রকাশ করে সরকারের স্বচ্ছতার প্রমাণ উপস্থাপিত করেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত দুজন সাবেক মন্ত্রী আবুল হোসেন ও আবুল হাসানের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা না দেয়াতে জনমনে সরকারের বিরুদ্ধে নানা সন্দেহের উদ্রেক হচ্ছে। আশা করা যায় দুজনের বিরুদ্ধেও দুদক মামলা প্রক্রিয়া চালু করে তার প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার নিশ্চিত করবেন।
প্রস্তাবিত মেট্রোরেল প্রকল্পে যেন পদ্মা সেতু প্রকল্পের ন্যায় দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হতে না পারে, সে ব্যাপারে সকলকে পূর্বাহ্নেই সজাগ থাকতে হবে। আশাব্যঞ্জক হলো জাইকা নেতা তোশিয়ুকি ইতোমধ্যে নিশ্চয়তা দিয়েছেন যে, মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা নিয়ে তাদের কোন দুশ্চিন্তা নেই। কারণ বাস্তবায়ন তদারকির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও স্বাধীন একটি সংস্থা নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে জাইকার। তথাপিও প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরুর আগে নীলনকশা প্রণয়ন করে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবানের মত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেকসমূহে দুর্নীতির আশ্রয়-প্রশ্রয়ের নানা সম্ভাবনা রয়েছে। জাইকার পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারকে এ ব্যাপারে সদা-জাগ্রত ও চৌকস ভূমিকা রাখতে হবে। মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রস্তাবিত তিনটি পর্যায় পার হতে ২০১৭ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সময় অতিবাহিত হবে। এ দীর্ঘ দশ বছরে বিভিন্ন সরকার বাংলাদেশের ক্ষমতায় আরোহণ করতে পারে। কিন্তু মেট্রোরেল যেন কোন সরকারের দলীয় প্রকল্প হিসেবে কারো কাছে বিবেচিত না হয়। বাংলাদেশের শোষিত-বঞ্চিত গণমানুষের দীর্ঘ-প্রতীক্ষিত ও প্রয়োজনীয় মেট্রোরেল বাংলাদেশের প্রতিটি জনগণের। প্রতিটি রাজনৈতিক দল জনগণের সেই স্বপ্ন পূরণের অংগীকার পালনে সাংবিধানিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মেট্রোরেল বাস্তবায়নের মাধ্যমে জাপান-বাংলাদেশ সম্পর্কের নব উন্মোচিত দিগন্ত প্রসারিত করার কাজে জাতীয় ঐক্যই এখন অমোঘ ও অবধারিত। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিতে যেন এই অমোঘ ঐক্যের নীতি প্রতিফলিত হয়, তা নিশ্চয়তাদানের ঐতিহাসিক দায়িত্ব আজ সকলের—নাগরিকের, সুশীলের ও রাজনীতিবিদের।
লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।