বাড়িভাড়া প্রসঙ্গে
প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৫২
বছর শেষে রাজধানীতে বাড়িভাড়া বৃদ্ধি পুনরায় সংবাদশিরোনাম আকারে হাজির হইয়াছে। তবে কেবল রাজধানীই নয়, সকল বড় শহরেই নূতন বছরে এই বৃদ্ধি ঘটিতে চলিয়াছে। সন্তানদের ভর্তি লইয়া পেরেশান অভিভাবককূলের এই সংবাদ তাহাদের ভ্রূকুঞ্চনের কারণ হইয়াছে। রাজধানীতে জীবনযাপনের ব্যয় কেবল উচ্চমূল্যের বাড়িভাড়ার কারণেই বাড়িয়া চলিয়াছে, ঢাকা পরিণত হইয়াছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম এক ব্যয়বহুল শহরে। কেবল বাড়িভাড়াই মধ্যবিত্তের মধ্যে দুই উপশ্রেণীর জন্ম দিয়াছে— যাহারা ভাড়া দেন তাহারা মধ্যবিত্ত থাকিয়া যাইতেছেন, যাহারা ভাড়া নেন তাহারা উচ্চ মধ্যবিত্তে পরিণত হইতেছেন। নিশ্চয়ই বাড়িভাড়া বৃদ্ধি পাইবে, কিন্তু এই বৃদ্ধি লাগামছাড়া, জীবনযাপনের ব্যয়বৃদ্ধির আনুপাতিক হারের চাইতে এই বৃদ্ধির হার অনেক উচ্চ।
ঢাকা শহরের ভূমির পরিমাণ ইহার জনসংখ্যার তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। ঢাকা হইলো পৃথিবীর সবচাইতে ঘনবসতিপূর্ণ শহর। যাহাদের নিজস্ব বাড়ি রহিয়াছে এই শহর যেন তাহাদেরই। দেড় কোটি মানুষের এই শহরে আবাসন চাহিদা তীব্র, এই সুযোগে বাড়িভাড়া বল্গাহীন বাড়ে। রাজধানীতে অল্প কিছু বড় আকারের ফ্ল্যাট সহজলভ্য, কিন্তু ইহার ভাড়া বেশিরভাগ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাহিরে থাকিয়া যায়। মাঝারি ও ক্ষুদ্র আকারের বাড়ি পাওয়া যায় না বলিলেই চলে। এই পরিস্থিতি বাড়িওয়ালাদের বেপরোয়া হইবার সুযোগ করিয়া দেয়। তাহারা ফি বছর ভাড়া বাড়াইয়া বলিতে পারেন যে, না পারিলে বাসা ছাড়িয়া চলিয়া যান। বাসা খালি করিতে তাহারা পাড়ার মাস্তানদেরও ব্যবহার করিয়া থাকেন। ব্যক্তিজীবনে সজ্জন হইবার পরও, একই ব্যক্তিকে দেখা যাইবে বাড়িওয়ালা হিসাবে বড়ই নির্মম। ইহা যেন এক সংস্কৃতি, বাড়িওয়ালা প্রজাতিটি যেন বিশেষ ধাতুতে গড়া। তাহারা লক্ষ টাকা অগ্রিম নেন, বছর না ঘুরিতেই ভাড়া বাড়াইয়া দেন এবং অসহায় ভাড়াটিয়াদের সোজা বলিয়া দেন, না পোষাইলে অন্যত্র চলিয়া যান।
বাড়িভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টিতে কোনো ধরনের নিয়ম-নীতির প্রয়োগ নাই, বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ২০ বছর ধরিয়া অকার্যকর হইয়া পড়িয়া রহিয়াছে। জানা গিয়াছে, আইনটি প্রয়োগের মূল কর্তৃপক্ষ ঢাকা সিটি কর্পোরেশন (ডিসিসি) নাকি জেলা পরিষদ তাহার সুস্পষ্ট সংজ্ঞায়ন নাই। ঢাকা মহানগরে ১০টি জোনের মধ্যে ৩টি স্তরের বাড়িভাড়া নির্ধারণ করিয়াছে ডিসিসি। ইহার মধ্যে রহিয়াছে প্রধান সড়কের পাশে, গলির ৩০০ ফুটের ভিতরে ও আশপাশে। বাড়ির ক্ষেত্রে পাকা, সেমিপাকা ও কাঁচা— এই তিনটি স্তর রয়েছে। বাড়িওয়ালাদের ডিসিসির চার্ট অনুযায়ী প্রধান সড়কের পাশে ১২শ স্কয়ার ফুটের একটি পাকা বাড়ির ভাড়া হইবে ৭ হাজার ৮শ টাকা— বাড়িওয়ালাদের বিবেচনায় ইহা অবাস্তব মনে হইবে। নির্মাণসামগ্রীর ব্যয়বৃদ্ধির কারণে বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচও বাড়িয়াছে। তাই প্রয়োজন পড়িয়াছে বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনকে হালনাগাদ করিয়া ঢাকার বাড়িভাড়ার একটি মান নির্ধারণ করার। এই আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কে হইবে তাহাও নির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। সরকারের দিক হইতে এই ক্ষেত্রে নজরদারির ব্যবস্থা চালু করিতে হইবে। পাশাপাশি বাড়িভাড়া বৃদ্ধি সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণের বেশ কয়েকটি সেল শহরব্যাপী চালু করিতে হইবে। আর বাড়িভাড়া গ্রহণের বিষয়টি একটি আনুষ্ঠানিক বিষয়ে পরিণত করিতে হইবে যাহার আওতায় বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটে চুক্তি করিবেন, ভাড়াবৃদ্ধির ন্যূনতম সময়সীমা থাকিবে এবং বাড়িভাড়া বৃদ্ধির সর্বোচ্চ হারও নির্ধারিত হইবে। অন্যথা এই পাগলা ঘোড়াকে রোখা যাইবে না।