চীন শেষ গন্তব্যের দ্বারপ্রান্তে

এশিয়া মহাদেশে ২০২০ সালের মধ্যে বেশ বড় ধরনের কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাবে— এমন পূর্বাভাষ অনেকদিন থেকেই গণমাধ্যমে আসছে। একদিকে সারা বিশ্বে দক্ষিণ আমেরিকার একক আধিপত্য বিস্তারের মাত্রা ক্রমেই সকল দেশকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে চীন ১৯৪৯ সাল থেকে তার বিপরীতে অবস্থান নিয়ে নিজের অবস্থান তৈরি করছে। আজ সারা বিশ্বে যেসব পণ্যসামগ্রী উত্পাদিত হয়, তার সিংহভাগের যোগানদাতা হল চীন। আলপিন থেকে শুরু করে মহাকাশযান, কোথায় চীনের উত্পাদিত পণ্য পৌঁছায়নি?... চীন যে আগামীর পরাশক্তি হয়ে আত্মপ্রকাশ করবে— তা নিয়ে কোন সন্দেহ প্রকাশ করা তাই নিছকই বোকামি। কার্ল মার্ক্স আর ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের ইতিহাসের যুগান্তকারী দর্শনের উপর ভিত্তি করে সর্বপ্রথম সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯১৭ সালে। তাদের লক্ষ্য ছিল- সমাজের বিদ্যমান ক্ষমতা বৈষম্য ভেঙ্গে ফেলা এবং জনগণের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার পরিপূর্ণ বিকাশের মাধ্যমে সারা বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়া। ১৯৯০ সালে সোভিয়েত রাশিয়ার ভাঙন মূলতঃ সেই ঘটনারই জলজ্ব্যান্ত সাক্ষী হয়ে আছে বিশ্ববাসীর সামনে। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র কিংবা কমিউনিজম- যেই নাম বা পদ্ধতিতেই রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালিত হোক, মূলতঃ তা ক্ষমতার কাঠামোকে সামনে রেখেই তৈরি এবং বিবর্তিত হয়। মানুষের মেধা, বুদ্ধি এবং শ্রম—এসব নিরন্তর বিকাশমান। তা কিছুতেই এক জায়গায় থেমে থাকে না, তাই প্রযুক্তি এবং পুঁজির বিকাশ মানুষের স্বাভাবিক চিন্তা- চেতনার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ক্ষমতার জন্য লড়াই করার ফলেই বরং সেই মেধা, বুদ্ধি এবং শ্রমের সুস্থ বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এজন্য কার্ল মার্ক্স এবং ফ্রেডরিখ এংগেলস’সহ সমমনা বস্তুবাদী দার্শনিকদের মূল্যায়নে কিছুটা ভ্রান্তি রয়ে গেছে। মূলতঃ এ ভ্রান্তির জায়গাটা তারা ইচ্ছা করেই তৈরি করেছেন। কারণ সব দর্শনেই মানুষকে স্বার্থান্ধ হিসাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। আর একজন মানুষ যদি সুযোগ পেলেই যে কোন সময় স্বার্থপর হয়ে উঠে, তাহলে তা’কি আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব?... সেজন্য এমন এক ব্যবস্থা প্রয়োজন— যা ব্যক্তিকে স্বার্থপর হতেই বাধা দেবে, অর্থাত্ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা (ধর্ম)। কিন্তু বস্তুবাদী দার্শনিকেরা কৌশলে সেই ব্যবস্থাকে সমালোচনা করে এড়িয়ে গেছেন। যার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে বস্তুবাদী দর্শনের উদ্দেশ্য কিছুতেই মঙ্গলজনক নয়। চীন কমিউনিজমকে ভিত্তি করে পরিচালিত রাষ্ট্র ব্যবস্থা। আপাতঃদৃষ্টে সেই ব্যবস্থাকে মঙ্গলজনক মনে হতেই পারে, কিন্তু বাস্তবে চীনের শ্রমের বাজার বেশ সস্তা। এমনকি কেউ কেউ বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের শ্রমিকদের সাথেও একে তুলনা করে থাকেন। শ্রম সস্তা না হলে উত্পাদন খরচ বেশি পড়ে। যা আন্তর্জাতিক বাজারে তুমুল প্রতিযোগিতা তৈরি করবে, ফলে সেই বাজার হাতছাড়া হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। সাধারণতঃ শ্রমকে সস্তা মূল্য দিয়ে কেনার জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতাকে কম বিবেচনা করে কাজের দক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। চীনে এই চিত্রের উপস্থিতি লক্ষণীয়। একজন শিক্ষিত মানুষের জন্য ন্যূনতম দুইটি ভাষাতে দখল থাকা জরুরি (রাষ্ট্রীয় মাতৃভাষা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভাষা)। চীনা নাগরিকদের মধ্যে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভাষাকে তেমন গুরুত্ব দেয়া হয় না বলে সমালোচনা রয়েছে। যার কিঞ্চিত্ প্রমাণ পাওয়া যায়- সরকারি এবং বেসরকারিভাবে পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওয়েব সাইট ও সেটার উপস্থাপন কৌশল পর্যালোচনা করে দেখলে। চীন সারাবিশ্বে পণ্যের যোগানদাতা হলেও ভাল করে দেখলেই বোঝা যায় পণ্যের মালিকানা অন্য কোন দেশের। সেই দেশ মূলত চীনের সস্তা শ্রম বাজারের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সেখান থেকে পণ্যটা কম খরচে বানিয়ে সারা বিশ্বে বাজারজাত করছে। সমালোচনা এটি নয়, সমালোচনার জায়গা হলো চীনের নিজস্ব পণ্যের বাজারের ভিত্তি নিয়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে— যে কোন ব্যবসাতে দুইটি দিকের প্রতি গুরুত্ব দিতে হয়। প্রথমতঃ মানসম্পন্ন পণ্যের নিজস্ব বাজার এবং দ্বিতীয়তঃ বাজার নিয়ে নিরন্তর গবেষণা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা। চীন সেখানে মাত্রাতিরিক্ত দুর্বল— এমন সমালোচনা তৈরি হয়েছে সমপ্রতি। চীন হয়ত গন্তব্যের খুব কাছেই। কিন্তু সেই গন্তব্য যদি কারো সাথে বৈরিতার কারণ না হয়ে দাঁড়ায় এবং চীন যদি দক্ষিণ আমেরিকার মত মোড়লিকে গুরুত্ব না দিয়ে সত্যিকার অর্থেই বিশ্বে শান্তি আনয়ন করার প্রতি আন্তরিকতা পোষণ করে থাকে- তাহলে গন্তব্যপথ অবশ্যই নিষ্কণ্টক হয়ে উঠবে। নতুবা যে বালির বাঁধ দিয়ে সেই পথের যাত্রা ১৯৪৯ সালে শুরু হয়েছিল তা যে কোন সময় স্রোতের ধাক্কায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে— এমন আশঙ্কাকেও উড়িয়ে দেয়া যাবে না! লেখক :জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষে বর্তমানে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত neehon^forid@hotmail.com