মিসরে গণভোট পরবর্তী জটিলতা
প্রকাশ : ২৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৩২
সদ্য-সমাপ্ত গণভোট ঘিরিয়া মিসরের রাজনৈতিক পরিস্থিতির আরও একদফা অবনমন স্পষ্টতর হইতেছে। এইবারের গণভোটে মোট ভোটারের মাত্র ৩০ শতাংশ তাহাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করিয়াছে। আর প্রদত্ত ভোটের মধ্যে বেসরকারি হিসাবমতে অনধিক ৬৫ শতাংশ ভোট ধর্মনির্ভর সংবিধান রচনার পক্ষে পড়িয়াছে। সরকারবিরোধীরা নির্বাচনে জনগণের নিতান্ত নিম্নমাত্রার অংশগ্রহণকে ধর্মনির্ভর সংবিধানের প্রতি প্রত্যাখ্যান হিসাবে চিহ্নিত করিতেছেন। এইদিকে ভোটের হার যত কমই হউক না প্রদত্ত ভোটের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রাপ্তিকে নিজেদের পক্ষে ম্যান্ডেট হিসাবে আখ্যায়িত করিতেছে ক্ষমতাসীন ব্রাদারহুড। অবশ্য এই ফল সম্বল করিয়া মিসরের ক্ষমতাসীনরা সহসাই তাহাদের রাজনৈতিক ইচ্ছার বাস্তবায়ন ঘটাইতে সক্ষম হইবেন বলিয়া মনে হইতেছে না।
সরকারবিরোধীরা ইতিমধ্যে জানাইয়া দিয়াছে যে, গণভোটের ফলকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করিয়া মুসলিম ব্রাদারহুডের সরকার যদি ধর্মনির্ভর সংবিধান পাস হইয়া যাইবার ঘোষণা প্রদান করিয়াও ফেলে তথাপি তাহা মানিয়া লওয়া হইবে না, বরঞ্চ এইহেন একটি সংবিধানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অব্যাহত থাকিবে। উল্লেখ্য, যে কায়দায় গণভোটটি অনুষ্ঠিত হইয়াছে তাহাকে মৌলিকভাবে অবৈধ হিসাবে আখ্যায়িত করিয়াছে মিসরের গণতন্ত্রপন্থিরা। তাহাদের মতে এইবারের গণভোটটিতে এত কম ভোট পড়িয়াছে যে, উহাকে কোনভাবেই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমতের প্রতিফলন বলা চলে না। এই যুক্তির অনুসরণে সরকারবিরোধীরা গণভোটের ফল বিবেচনায় না ধরিবার দাবি উত্থাপন করিয়াছেন। ব্রাদারহুড সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের, যাহারা মূলত স্বৈরাচারী হোসনী মোবারক সরকারের পতনে প্রধান ভূমিকা রাখিয়াছিলেন। বক্তব্যমতে গণভোটে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের অংশগ্রহণহীনতা এই কথাই প্রমাণ করে যে, মিসরীয়রা রাষ্ট্রকর্মে ধর্ম ব্যবহারের পক্ষে নহে। বস্তুত, ব্রাদারহুডবিরোধীরা ব্রাদারহুডকে সংখ্যালঘু হিসাবেই গণ্য করিতেছে।
এমতাবস্থাতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসিবে নির্বাচনে জয়লাভ করা সত্ত্বেও ব্রাদারহুডকে সংখ্যালঘু হিসাবে বিবেচনা করিতে হইবে কেন? ইহার উত্তরও বিরোধীপক্ষের কাছে মজুত আছে। মিসরের গণতন্ত্রপন্থিদের কেহ কেহ বলিতেছেন যে, গণতন্ত্রপন্থিদের মধ্যকার পারস্পরিক বিভেদের কারণেই তাহাদের মোট শক্তির পরিমাণ খণ্ড-বিখণ্ডভাবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে উত্থাপিত হইতেছে। পক্ষান্তরে রাষ্ট্রকর্মে ধর্ম ব্যবহারপন্থিরা সংখ্যার দিক হইতে অনেকটাই সংখ্যালঘু হইলেও, নিজেদের মধ্যে মতানৈক্যের তেমন কোন সমস্যা না থাকিবার কারণে সর্বদাই সর্বশক্তি লইয়া রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত হইতে সক্ষম হইতেছে।
সন্দেহ নাই যে, মিসরের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিদিনই বলিতে গেলে অবনতি ঘটিতেছে। স্বৈরাচারী শাসনের পতনের মধ্য দিয়া মিসরে গণতন্ত্রের সুবাতাস বহিবার সম্ভাবনা দেখা দিয়াছিল। কিন্তু গণতন্ত্রপন্থি ও ব্রাদারহুডের মধ্যকার বিরোধকে কেন্দ্র করিয়া সেই সুবাতাস বিষবাষ্প পূর্ণ হইয়া উঠিতেছে। ইহজাগতিক, ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক ব্যবস্থার পক্ষের গণতন্ত্রপন্থিদের সহিত রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে ধর্ম ব্যবহারকারীদের মধ্যেকার বিরোধের পরিণামে মিসরের রাজনীতির আরও একবার নূতন করিয়া পুরোনো মুখের আবির্ভাব ঘটিবে কি? এই পুরোনো মুখ হইতেছে সামরিক বাহিনী। এই আশঙ্কা হেলায় উড়াইয়া দিবার মত নহে। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তিগুলির মধ্যকার বিভেদ ও অন্তর্দলীয় কোন্দল সামরিক বাহিনীর রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের উর্বর ক্ষেত্র প্রস্তুত করিয়া দেয়। সমস্যার এইখানেই শেষ নহে। মোবারকের পতনের সময় সাধারণ মিসরীয়রা একটুখানি উন্নত জীবনের যে স্বপ্ন দেখিয়াছিল তাহা আদৌ পূরণ হইবে কি? বিদ্যমান বাস্তবতাতে তাহার এতটুকু ইঙ্গিত অবশ্য মিলিতেছে না।