তত্ত্বাবধায়ক সরকার এদেশে কেন দরকার
প্রকাশ : ২৭ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:০৯
যে ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এ সময় সবচেয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে তা হচ্ছে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কার অধীনে ও কিভাবে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে নাকি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এবং হরতাল, অবরোধ, অনশনসহ বিভিন্ন প্রকার আন্দোলন ও আন্দোলনের হুমকি সত্ত্বেও কোন সুরাহা হচ্ছে না। একদিকে বিরোধী দলের নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি অন্যদিকে ‘বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচন’ বলে সরকারপন্থিদের অনড় অবস্থানে দেশের ভবিষ্যত্ নিয়ে বিশেষজ্ঞ জনের পাশাপাশি আমাদের মত সাধারণ মানুষও উদ্বিগ্ন- কোন দিকে যাচ্ছে দেশ!
দেশ যে দিকেই যাক, নির্বাচন হবে এ নিয়ে কারো মধ্যে কোন মতভেদ নেই। এ বিষয়ে সরকারি-বিরোধীদের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। বিরোধ শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি ও তার অধীনে নির্বাচন করা না করা নিয়ে। বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ বেশকিছু মন্ত্রী ও এমপি মহোদয় বিগত তত্ত্ব্বাবধায়ক সরকারের দমন-নিপীড়নের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিরোধী দলীয় নেতাকে বোঝাতে চান যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসলে তাদের যে আবার আগের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে না তার কোন নিশ্চয়তা নেই। সেবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার শীর্ষ দলের দুই শীর্ষ নেতাসহ বেশ কয়েকজনকে জেলে দিয়েছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে দেশে আসতে বাধা দেয়া ও বর্তমান প্রধান বিরোধী দলীয় নেতাকে বিদেশে যেতে বাধ্য করার ষড়যন্ত্রের কথা আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই স্মরণ করিয়ে দেন বিরোধী দলীয় নেতাকে, যাতে তিনি তত্ত্বাবধায়কের দাবি থেকে ফিরে আসেন। তারেক-কোকোর বিরুদ্ধে মামলা ও তাদের গ্রেফতার ঐ তত্ত্বাবধায়ক সরকারই করেছিল। এমনকি তত্ত্বাবধায়কের মাইনাস টু ফরমুলার কথাও বিভিন্ন বক্তৃক্তায় বিভিন্ন জন উল্লেখ করেন। তত্ত্বাবধায়ক প্রশ্নে বর্তমান সরকার যদি উপরের বিষয়গুলোকে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেন তাহলে তিনটি বিষয় বিবেচ্য- ১. ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দীন আমলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা, তারেক, কোকোসহ অন্য যারা গ্রেফতার ও তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল তা বৈধ ছিল কি না। ২. যদি বৈধ না হয়ে থাকে তাহলে বর্তমান সরকার কেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ৩. যদি বৈধ হয়ে থাকে তাহলে সরকার তত্ত্বাবধায়ক কেন আনতে নারাজ।
যাদের আমলে তিন তিনবার সংসদ নির্বাচন করা হল সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার এখন কিভাবে অবৈধ হয় বুঝে আসে না। যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার অবৈধই হয় তবে তাদের তত্ত্বাবধানে বিগত তিন তিনটা নির্বাচন বৈধ হল কি করে? আর এ নির্বাচনে যারা জয়লাভ করে সংবিধান সংশোধনসহ যত রাষ্ট্রীয় কাজ করেছে সেগুলোইবা বৈধ হয় কি করে? সে আলোকে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনী বৈধ কি না বিবেচনার দাবি রাখে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখা না রাখা নিয়ে বিবেচনা-পুনর্বিবেচনার আগে এদেশে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি আসার শানে নজুল জানতে হবে। যে কারণে আন্দোলন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আনা হল সেই অনাস্থা, অবিশ্বাস আমাদের মাঝ থেকে কি গেছে? আমরা বলি আমেরিকা, ব্রিটেনসহ অনেক বড় বড় দেশের ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীনে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের কথা। কিন্তু সে সব দেশের সরকারি ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যকার সম্পর্ক আর আমাদের নেতাদের মধ্যকার সম্পর্ক রাত আর দিন পার্থক্য। আমেরিকার কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের স্কুলে সন্ত্রাসীদের হামলার প্রতিবাদ-প্রতিরোধে তারা এক কাতারে হলেও বাংলাদেশের বৌদ্ধ মন্দিরে হামলার পর দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দল পরস্পরকে দোষারোপ করে একাত্মতার পরিচয় দেয়নি। এমন মানসিকতা নিয়ে ঐ সব দেশের নির্বাচনের সাথে নিজেদের নির্বাচনের তুলনা কোনক্রমেই হয় না। তারা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করে জয়- পরাজয় যাই হোক পরাজিত ব্যক্তি জয়ী ব্যক্তিকে অভিনন্দন জানাতে মোটেই কার্পণ্য করেন না। আর আমাদের দেশে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হলেও সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। যেখানে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়েও সূক্ষ্ম ও স্থূল কারচুপির অভিযোগ ওঠে সেখানে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ স্থূল থেকে স্থূলকায়, বিশাল থেকে বিশালতর হতে হতে বুম করে বিস্ফোরিত হয়ে দেশে যে গোলযোগের সৃষ্টি হবে না তার কি গ্যারান্টি আছে? দুর্নীতি, অনাদর্শ, অনাস্থা, হিংসা থেকে যে ক্ষমতার লোভ আমাদের মাঝে বিরাজমান, তাতে দলীয় সরকারের পরিবর্তে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
লেখক :একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা
E-mail: mtabiur_ku@yahoo.com