রাজধানীতে গাড়ি পার্কিং মিটার স্থাপনে বাধা কোথায়

বিশ্বের অন্যান্য বড়ো শহরের মতো যানজট আমাদের রাজধানীবাসীরও নিত্যসঙ্গী। অতিমাত্রায় জনবহুল এই মহানগরে এমনিতেই গাড়ির তুলনায় রাস্তার পরিমাণ কম। ফুটপাতের অবস্থা আরও করুণ। নামমাত্র যেইটুকু ফুটপাত আছে তাহার বৃহদংশও চলিয়া গিয়াছে বৈধ-অবৈধ দখলকারীদের আয়ত্তে। ফলে রাজধানীর সড়কগুলিতে প্রায়শ গাড়ি ও পথচারীদের বিপজ্জনক জট লাগিয়া থাকে। পরিস্থিতিকে আরও সংকটাপন্ন করিয়া তুলিয়াছে সড়কে যথেচ্ছ গাড়ি পার্কিং। ব্যস্ততম মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার অবস্থা কতোটা ভয়াবহ তাহা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। তবে রাজধানীর গুলশান-বনানী-উত্তরা ও ধানমণ্ডিসহ কোনো এলাকার চিত্রই খুব একটা ভিন্ন নহে। রাজধানীর দুঃসহ যানজটের অন্যতম কারণ যে এই লাগামহীন পার্কিং তাহা লইয়া দ্বিমত নাই। গত দুই দশকে ইহা লইয়া বিস্তর আলাপ-আলোচনা হইয়াছে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন (ডিসিসি) ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)এর পক্ষ হইতে বহুতল কার পার্কিং নির্মাণসহ নানা উদ্যোগও নেওয়া হইয়াছে বিভিন্ন সময়ে। কোথাও কোথাও দাগ কাটিয়া পার্কিং-এর স্থানও নির্দিষ্ট করিয়া দেওয়া হইয়াছে। নেওয়া হইয়াছে অর্থ আদায়সহ তদারকির ব্যবস্থাও। কিন্তু কোনো কাজ হয় নাই। কর্মব্যস্ত দিনের বেশিরভাগ সময়ই রাজধানীর রাস্তাগুলির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করিয়া সগর্বে দাঁড়াইয়া থাকে অসংখ্য গাড়ি। ইহা একটি গুরুতর সমস্যা সন্দেহ নাই। তবে পার্কিং মিটার স্থাপনের মাধ্যমে সফলভাবে এই সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি ইহাকে যে ডিসিসির আয়বৃদ্ধির অন্যতম সম্ভাবনাময় একটি খাতে পরিণত করা সম্ভব— তাহার উদাহরণও অনেক। অর্ধশতকেরও বেশি সময় আগে হইতে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ মহানগরগুলিতে এই ব্যবস্থা চলিয়া আসিতেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহামা শহরে পৃথিবীর প্রথম পার্কিং মিটার স্থাপিত হইয়াছিল ১৯৩৫ সালের ১৬ জুলাই। একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সড়কের নির্দিষ্ট একটি স্থানে গাড়ি পার্কিং-এর বিনিময়ে অর্থ আদায়ে পার্কিং মিটার ব্যবহূত হয়। সিটি কর্পোরেশন বা পৌর কর্তৃপক্ষ তাহাদের রাস্তায় গাড়ি পার্কিং-সম্পর্কিত সমন্বিত নীতিমালার আলোকে এই অর্থ আদায় করিয়া থাকে। শুরুতে মিটারগুলি কয়েনচালিত হইলেও ক্রমে ক্রেডিট কার্ড, স্মার্টকার্ড, এমনকী মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য মিটারও চালু হইয়াছে কোথাও কোথাও। আশির দশকেই ডিজিটাল পদ্ধতির মিটারের ব্যবহার শুরু হয়। ইতিমধ্যে এই ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হইয়াছে। অনেক সহজতর করা হইয়াছে মিটারের ব্যবহার পদ্ধতি। বর্তমানে ব্যবহারকারী-বান্ধব আরও উন্নততর প্রযুক্তি উদ্ভাবনের চিন্তাভাবনা চলিতেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ম্যানুয়ালি পরিচালিত সর্বশেষ যান্ত্রিক পার্কিং মেশিনটিও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করিয়া নেওয়া হইয়াছে ২০০৬ সালে। এইসব মিটার দেখভাল করিবার জন্য ষাটের দশকে নিউইয়র্ক শহরে প্রথমবারের মতো নারীকর্মী নিয়োগ দেওয়া হইয়াছিল। অচিরেই পুরুষকর্মী নিয়োগ শুরু হয়। ফলে আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি সৃষ্টি হয় কর্মসংস্থানের সুযোগও। বলা বাহুল্য, উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলির উল্লেখযোগ্য বহু শহরেই দীর্ঘদিন যাবত্ সফলভাবে এই ব্যবস্থা চালু আছে। আমাদের নীতিনির্ধারকরা কারণে-অকারণে প্রায়শ বিদেশ সফর করেন। সঙ্গত কারণেই এই ব্যাপারে তাহাদের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারও যথেষ্ট সমৃদ্ধই বলা চলে। কিন্তু নিজ দেশে তাহারা কেন অদ্যাবধি এই পদ্ধতিটি প্রচলনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন নাই— তাহা আমাদের বোধগম্য নহে। আমরা মনে করি, অবিলম্বে রাজধানী ঢাকায় অনুরূপ পার্কিং মিটার পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন। ইহাতে একদিকে যেমন যত্রতত্র ঘন্টার পর ঘন্টা গাড়ি পার্কিং করিয়া রাখিবার প্রবণতা হ্রাস পাইবে, অন্যদিকে তেমনি সিটি কর্পোরেশনের আয়েরও বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হইবে। অর্থাভাবে আমাদের সিটি কর্পোরেশনসমূহ সড়ক ও ফুটপাত রক্ষণাবেক্ষণসহ জনগুরুত্বপূর্ণ বহু কাজ যে সময়মতো সম্পাদন করিতে পারে না— তাহা সর্বজনবিদিত। পার্কিং খাত হইতে প্রাপ্ত অর্থ নিশ্চিতভাবে তাহাদের সাংবাত্সরিক এই অর্থাভাব অনেকটা লাঘব করিবে। পাশাপাশি, সৃষ্টি হইবে নূতন কর্মসংস্থানের সুযোগও। রাজধানীর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বড়ো শহরেও অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইতে পারে। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জরুরিভিত্তিতে এই ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করিবেন।