বন্দরনগরীর পানিতেও আর্সেনিক

আর্সেনিক এখন সকলের নিকটই পরিচিত একটি শব্দ। কিন্তু ইহার ভয়াবহতা, স্বাস্থ্যঝুঁকি কিংবা ব্যবহূত পানি আর্সেনিকমুক্ত করিবার সহজ উপায় সম্পর্কে আমরা যথেষ্ট সজাগ হইয়াছি এমন বলা যাইবে না। সম্প্রতি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনবসতি বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও তীব্র পানি সংকটের সহিত যুক্ত হইয়াছে আর্সেনিক দূষণ। চাহিদা মিটাইতে ব্যবহূত অগভীর নলকূপের একটি বড় অংশের পানিতে সহনীয় মাত্রার তুলনায় বেশি আর্সেনিক পাওয়া গিয়াছে। মহানগরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষকে ওয়াসা পানি সরবরাহ করিতে পারে না। ওয়াসার সূত্র বলিতেছে, মহানগরে দৈনিক পানির চাহিদা ৫০ কোটি লিটার। ওয়াসা গড়ে প্রতিদিন ২০ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করে, যাহার মধ্যে ১০ কোটি লিটার হালদা নদী হইতে সংগ্রহ করিয়া মোহরা পানি শোধনাগারের মাধ্যমে ব্যবহারোপযোগী করা হয়। বাকি ১০ কোটি লিটার ভূগর্ভস্থ গভীর নলকূপের পানি। আর বাদবাকি ৩০ কোটি লিটার বস্তুত অগভীর নলকূপ হইতে নগরবাসীকে সংগ্রহ করিতে হয়। কয়েক বত্সর আগেই নগরীর কয়েকটি অঞ্চলের নলকূপের পানিতে আর্সেনিকের সন্ধান পাওয়া গিয়াছিল; কিন্তু পানি সঙ্কটের কারণে অগভীর নলকূপের ব্যবহার বাড়িয়াছে, একই সাথে বাড়িয়াছে আর্সেনিকের প্রাদুর্ভাব। বড় উদ্যোগ না লইলে বিপর্যয়ের আশঙ্কা রহিয়াছে বলিয়া পর্যবেক্ষকগণ মনে করিতেছেন। আর্সেনিক মূলত এক প্রকার রাসায়নিক উপাদান। পানিতে স্বল্প মাত্রায় আর্সেনিক সব সময়ই থাকে। কিন্তু মাত্রা বাড়িয়া গেলেই তাহা পানকারীর শরীরে রোগের উপসর্গ তৈরি করে এবং পরবর্তীতে সেই সকল রোগ-ব্যাধিকে মারাত্মক পর্যায়ে লইয়া যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি লিটার পানিতে ০.০৫ মিলিগ্রামের বেশি আর্সেনিক থাকিলে তাহা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ১৯৯৩ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি আবিষ্কৃত হয়। ২০০১ সালে বৃটিশ জিওলজিক্যাল সার্ভে বাংলাদেশের ৬১টি জেলার নলকূপের পানি পরীক্ষা করিয়া জানায়, ৪২% নলকূপের পানিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানের চাইতে বেশি মাত্রায় আর্সেনিক রহিয়াছে। বস্তুত দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬১টি জেলায় মাটির নিচে পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক পাওয়া গিয়াছে এবং সাড়ে তিন কোটি হইতে সাত কোটি মানুষ আর্সেনিকজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রহিয়াছেন। ২০১০ সালে ল্যানসেট সাময়িকী প্রকাশিত গবেষণা হইতে জানা যায়, আর্সেনিকযুক্ত পানি পানে মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়া যায়। সমপ্রতি নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. জিনি পেসোলা তাহার দলবল আর্সেনিক আক্রান্ত বাংলাদেশের ১২ হাজার মানুষের উপর গবেষণা চালাইয়া জানাইয়াছেন, আর্সেনিকের কারণে অধূমপায়ীরাও শ্বাসকষ্টে ভুগিতেছেন, যাহা আগে কখনো দেখা যায়নি। আর্সেনিকের কারণে ক্যান্সার সৃষ্টির পাশাপাশি শরীরের অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও নিস্তেজ হইয়া যায়। আক্রান্তদের বেশিরভাগেরই হাতে-পায়ে ফোস্কা এবং আঙুলের মাথায় পচন ধরিতেছে, অনেকেরই বুকে-পিঠে কিংবা জিহ্বা, মাড়িতে ঘায়ের সৃষ্টি হইতেছে, যাহা পরে মারাত্মক ক্যান্সারে রূপ নিতেছে। দেশি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সর্বশেষ জরিপে ৫৬ হাজার ৭ শত ৫৮ জন আর্সেনিক আক্রান্ত রোগী চিহ্নিত করা হইয়াছে। শুধু যে নলকূপের পানি পান করিয়াই মানুষ আর্সেনিকের বিষে আক্রান্ত হইতেছেন তাহা নহে, সেচের পানি বাহিত এই বিষ এখন আমাদের চাষের জমিকেও সংক্রমিত করিতেছে। ফলে আর্সেনিক দূষিত জমিতে উত্পন্ন খাদ্যশস্য ও তরিতরকারি ভক্ষণের মাধ্যমেও আর্সেনিক আক্রান্ত হওয়ার আশংকা দেখা দিয়াছে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলসহ দেশের ৪৩টি জেলার মানুষ বোরো ধানের চাউলের ভাত খাইয়াও মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হইতেছেন। আর এইসব ধানের ভাত শুধু উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষই খাইতেছেন না, খাইতেছেন সমগ্র দেশের মানুষই। ফলে নীরবে-নিভৃতে ঘাতক ব্যাধির প্রসার ঘটিতেছে। আর্সেনিকের প্রভাব ও প্রতিকারের উপায় সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি আর্সেনিকোসিস আক্রান্ত ও ঝুঁকিতে থাকা রোগীদের চিকিত্সার জন্য একটি আর্সেনিক সেন্টার স্থাপন করা জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। আর্সেনিক কেন্দ্র স্থাপন করিলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চিকিত্সক এবং গবেষকগণ আর্সেনিকজনিত স্বাস্থ্যসমস্যা লইয়া গবেষণা ও শিক্ষার সুযোগ পাইবেন। প্রত্যন্ত উত্তরাঞ্চল হইতে জনবহুল বন্দরনগরীতে আর্সেনিকের বিস্তৃতি জনস্বাস্থ্যের জন্য আরও বিপর্যয়কর পরিস্থিতি ঘটিবার আশঙ্কা জাগাইয়া তুলিয়াছে।