তরুণদের কাছে প্রত্যাশা
প্রকাশ : ২৯ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:১৯
‘বাংলাদেশ ইয়ুথ পার্লামেন্ট’ নামে গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত হইয়া গেল এক ব্যতিক্রমী যুবসমাবেশ। এই সমাবেশে আয়োজক সংগঠনের তরুণ সদস্যরা ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের তরুণ নেতারা অংশগ্রহণ করেন। সমাবেশে বক্তারা বলেন, শুধু রাজনীতিবিদদের সমালোচনা করিলে চলিবে না , দায়িত্ব নিয়া তরুণদের সামনে আগাইয়া আসিতে হইবে। তাহারাই পারে দেশ ও সমাজের সত্যিকারের পরিবর্তন আনিতে। রাজনীতিতেও তাহাদের আসিতে হইবে। ঝুঁকি ও সাহস লইয়া তাহাদের রাজনীতির মাঠে থাকিতে হইবে। অতি উত্তম কথা। তরুণদের কাছে এই প্রত্যাশা এবং তাহাদের প্রতি এই আহ্বান নিশ্চয় অনর্থক নহে। দেশে ও বিদেশে তরুণরাই তো অচলায়তন ভাঙ্গিয়াছে, তাহারাই বিনির্মাণ করিয়াছে নূতন সমাজ। তারুণ্যের শক্তি অপরিমেয় ও অপ্রতিরোধ্য। আমাদের ইতিহাসে যাহা কিছু মহান ও সুন্দর, সেইসব অর্জন করিবার সংগ্রাম-সাধনায় যুবসমাজই পালন করিয়াছে অগ্রণী ভূমিকা। মহান ভাষা আন্দোলন হইতে শুরু করিয়া স্বাধিকার হইতে স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে তরুণসমাজ পালন করিয়াছে নিরাপোষ ভূমিকা। ষাটের দশকের সেই উজ্জ্বল তারুণ্য যে ইতিহাস রচনা করিয়াছে, তাহা আরও বহুকাল পর্যন্ত যুবসমাজের সামনে অনুপ্রেরণার উত্স হইয়া থাকিবে। অতীতে যদি তরুণরা পারিয়া থাকে, তবে আজ পারিবে না কেন ! পারিবে নিশ্চয়ই। তারপরও কিন্তু আছে আশা ও নিরাশার দোলাচল।
আজিকার যুবকদের প্রতি যখন সাহস করিয়া সম্মুখে আসিয়া সক্রিয় ভূমিকা লইবার আহ্বান জানানো হয়, তখন মনে প্রশ্ন জাগে, এক্ষণে সমাজ ও রাজনীতির মাঠে-ময়দানে , শিক্ষাঙ্গনে তাহারা কি অনুপস্থিত? তাহারা তো সবখানেই আছেন এবং প্রবলভাবেই আছেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এক শ্রেণির তরুণের কার্যকলাপ দেখিয়া হতাশ না হইয়া পারা যায় না। দেশ-জাতি যুবসমাজের কাছে যাহা আশা করে, তাহার সাথে এইসব তরুণের কর্মকাণ্ডের মিল খুঁজিয়া পাওয়া যায় সামান্যই। তারপরেও যুবকদের নিয়া আমরা হতাশ নহি। কতক ক্ষেত্রে আমাদের সন্তানেরা বিপথগামী যদি হইয়াও থাকেন, তাহার জন্য তাহারা নিজেরা দায়ী নহেন। যাহারা পথ দেখাইবেন তাহারা ঠিক পথে আছেন কি না, ছেলে-মেয়েদের সামনে কতটুকু কি রাখিয়া যাইতেছেন, সেই প্রশ্নটিও কিন্তু থাকিয়া যায়। এই বাস্তবতায় যোগ্য নাগরিক হিসাবে গড়িয়া উঠিবার পথে যে অন্তরায়গুলি রহিয়াছে সেইগুলি আগে দূর করা দরকার। মনে রাখা বাঞ্ছনীয় যে, তরুণরা বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপের বাসিন্দা নহে। দেশ-জাতিকে নেতৃত্ব দিবার যোগ্য মানুষ হিসাবে তাহাদের বাড়িয়া উঠিবার সুযোগ করিয়া দিতে হইবে সমাজের সর্বত্র যুক্তি ও নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। পরিবারে ,শিক্ষাঙ্গনে, কর্মজগতের সবখানে যদি নিয়ম-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা না যায় তাহা হইলে আমাদের ছেলে-মেয়েরা কোথা হইতে সঠিক জীবনের পাঠ গ্রহণ করিবে। তরুণরা শুধু রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই ভূমিকা রাখিবেন, সেই কথাই বা আমরা বলি কেন। দেশের জন্য যেমন প্রয়োজন দেশপ্রেমিক ও যোগ্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব, তেমনই দরকার দক্ষ ও কর্তব্যপরায়ণ জনপ্রশাসক। আমাদের মেধাবী শিক্ষক চাই, ইঞ্জিনিয়ার চাই, চিকিত্সক চাই, ব্যাংকার চাই, শিল্পী-সাহিত্যিক, অর্থনীতিবিদ, কৃষিবিদ, বিভিন্ন সেক্টরে সাধারণ কর্মী— সবই প্রয়োজন। আর সর্বক্ষেত্রেই দরকার দক্ষ, যোগ্য এবং কর্ম ও নীতিনিষ্ঠ মানুষের সমাবেশ। সেই কাঙ্ক্ষিত সুন্দর দিন তখনই আমরা আশা করিতে পারি, যখন আমরা সর্ব জায়গায় অনুকূল পরিবেশ তৈরি করিতে পারিব। তরুণরা নিজেরাই নিজেদের সমস্যা সমাধান করিয়া ফেলিবেন, এমনটি আশা করা যায় না। তরুণসমাজ যদি নিজ নিজ প্রতিভার পরিপূর্ণ বিকাশের পথ খুঁজিয়া পান এবং তাহারা যদি যথোপযুক্ত হইয়া উঠেন, তাহা হইলে সমাজের প্রত্যাশিত পরিবর্তন না আসিয়া পারে না। আমরা অপেক্ষায় আছি সেই শুভদিনের।