পৃথিবী জয়ের নেশায় জাগুক বাংলাদেশ

প্রতিদিন সূর্য উঠলেও একেকটি সূর্যোদয়ের একেক ধরনের আমেজ থাকে। মানুষ কল্পনা বিলাসী, স্বপ্নপ্রিয়। নাট্যকার ব্রেখট মনে করেন একমাত্র মানুষই সেই প্রাণী, যারা ভাবতে জানে, যাদের ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য একটি মগজও দেয়া হয়েছে। সেই মগজকেই আমরা বলি মেধা। মেধাবী মানুষ প্রতিদিনের সূর্যোদয়কে নতুনরূপে আবিষ্কার করার জন্য নববর্ষের প্রাক্বালে উত্সবে মেতে ওঠে। ছেলেবেলায় আমরা বিশ্বাস করতাম বছরের প্রথম দিনটি যেভাবে কাটবে বা কাটাতে চাইব বাকি দিনগুলোও মোটামুটি সেভাবেই যাবে। ফলে মিথ্যে বলা, কাউকে ঠকানো, এমনকি অতিরিক্ত দুষ্টুমি থেকেও বিরত থাকতাম আমরা। যুগ পাল্টেছে, নৈতিকতাও নেই আগের অবস্থানে। আজকালকার তরুণ-তরুণীরা আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে, তাদের হাতে প্রযুক্তি, চোখে বিশ্বাসের আলো, মনে আন্তর্জাতিকতা। এখন কেউ ডাক পিয়নের পথ চেয়ে সময় নষ্ট করে না। অক্ষর অবিনশ্বর বলে যতই চেঁচাই না কেন, মূল বিষয় হলো সংক্ষিপ্ত সময়ে অব্যর্থ যোগাযোগ। আজকের তারুণ্য সে পথে অনেকদূর আগুয়ান। তাদের চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে মানবসভ্যতা। কম্পিউটারের বাটন চাপলেই গুগল, আর গুগলের জানালায় ভেসে ওঠে জ্ঞানের সারকথা। ফলে নববর্ষের বাঙালিয়ানা যেমন তাকে টানে তেমনি উতলা করে তোলে ইংরেজি নববর্ষের আহবান। এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু সাবধানতার প্রশ্ন থেকে যায়। সাবধানতা এ কারণে পর্দায় দেখা দুনিয়া, পশ্চিমাবিশ্ব বা আধুনিক সমাজ তাকে উতলা করলেও সে তার অন্তর্নিহিত ঝামেলা জানে না। জানে না ভেঙ্গে যাওয়া পরিবার, সিঙ্গেল মাদার বা ঘন ঘন পার্টনার পরিবর্তনের ভোগান্তি। এক সময় প্রকৃতির নিয়মে যৌবনের উন্মাদনা থিতিয়ে আসে। শরীর গৌন হয়ে পড়ে, মুখ্য হয়ে ওঠে মন ও আত্মা। আমাদের দেশ বা এশিয়ার ঐতিহ্যও অতীতে আমার অবস্থান ও প্রভাব সুদূরগামী। ফলে শারীরিক উন্মাদনা বা জান্তব হয়ে ওঠা ছিল না। আজ এ দৃশ্যপট বদলে গেছে। বাঙালিকে দেখে বোঝার উপায় নেই সে কোন নীরিহ বা শান্ত প্রাণী। রাজধানীর প্রকাশ্য রাজপথে প্রাণভয়ে ছুটে চলা বাঙালির আর্তনাদে আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠলেও আমাদের মন গলেনি। ক্যামেরার কাঁচ ঝাপসা হয়ে এলেও হাতের আঙ্গুল কাঁপেনি। বাঁচার জন্য নীরিহ বঙ্গ সন্তানের যত আর্তনাদ তত বেশি ক্রোধ হয়ে চাপাতি চালানোর তরুণদের হূদয় এখন আর নরম কিছু নয়। তারা হিন্দী সিনেমার টেকনিক জানেন, বলিউড-হলিউডের কায়দা চেনে। কম্পিউটার গেমে শত্রু নিধনের নতুন নতুন তরিকায় এখন সিদ্ধহস্ত। এ প্রক্রিয়া যেন যে তাকে পেশাদার খুনীতে পরিণত করেছে সে নিজেও তা টের পায়নি। টের পায়নি রাজনীতির নামে অন্ধ আনুগত্য, কখন তার বিবেক, বুদ্ধি, জ্ঞান ও চেতনা কেড়ে নিয়েছে। সর্বনাশের পথে ছুটে চলা এই তারুণ্যের কাছে ইংরেজি নববর্ষ এখন আর কোন শাশ্বত বা সুন্দর কিছু নয়। তাদের ধারণা, থার্টিফাস্ট নাইট মানে নেশায় চুর হওয়া, গাড়ির গতি বাড়িয়ে হর্ন বাজিয়ে ছুটে চলা। অবাধ আনন্দে নাচ-গানের মাতমে ভেসে যাওয়া। আমাদের সৌভাগ্য এই প্রক্রিয়া এখনো সার্বজনীন বা সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েনি। পর্যাপ্ত অর্থ-বিত্ত ও ক্ষমতা থাকলে তা হলেও অবাক হবার কিছু থাকতো না। এই যে বিপর্যস্ত দিশেহারা যুবসমাজ এদের নিয়ন্ত্রণে আনার বা বাগে রাখার আদর্শিক শক্তি আজ বিলুপ্ত প্রায়। বিলোপ হয়ে যাচ্ছে বাঙালির শুদ্ধ জীবনবোধ। এমন কঠিন সময়ে আমাদের সামনে সময়ের নিয়মে ইংরেজি নববর্ষ এসে দাঁড়িয়েছে। ঠিক যখন পৃথিবীর দেশে দেশে সূর্যোদয়ের রং ভিন্ন ও স্বতন্ত্র। কোথাও সে রমণীর কপালে টিপের মত মায়াবী, মরুর দেশে খুনে রাঙ্গা, আফ্রিকায় ক্ষুধা ও তৃষ্ণাকাতর, সিক্ত লাল চোখের মত। কোথাও স্কুলছাত্রের, কলেজ ছাত্রের বা ছাত্রীর রক্তে ভাসমান, কোথাও আশা জাগানিয়া, সবচে’ কঠিন প্রশ্ন আমরা কোনিদকে যাব। আমাদের ভবিষ্যত্ আশাপ্রদ বলে সার্টিফিকেট দেয়া মুরুব্বীরা আছেন নিজেদের স্বার্থ হাসিলের ধান্ধায়, ইংরেজি নববর্ষের মালিক বা চালক দেশগুলোর চেহারা এখন আগের মত নেই। উন্নয়নের নীল আকাশে দুর্যোগের মেঘ, বেকারত্ব, যৌনতা আর অবাধ জীবনের মোহে, পুঁজির দাসত্বে এরা এখন আগের মত ভালো নেই। ভালো নেই বলেই নিজেদের দুর্বলতা ও ভীরুতা ঢাকতে কোথাও চোরের মত ঝাঁপিয়ে পড়ছে। কোথাও নব্য লুটেরার মত সম্পদ লুটে নিচ্ছে, কোথাও বাঁজপাখির মত ছোঁ মারার জন্য তাকিয়ে আছে। আমাদের দেশের দিকে অতি মনোযোগও তাই ভয়ের। বিশেষত তারুণ্যের জীবন ভোগমুখি করে তাকে স্বদেশ চেতনা বা ভালোবাসা থেকে সরিয়ে নেয়ার ভেতর পার্থিবতা থাকলেও সে আনন্দ উত্তেজনা ক্ষণস্থায়ী। বাংলাদেশের রাজনীতি এই দুর্যোগ বা ষড়যন্ত্র সামলাতে পারবে না। তাই এ দায়িত্ব সমাজের, পরিবারের ও জাতির। ইংরেজি নববর্ষে আমাদের মৌলিক চাওয়া হওয়া উচিত তিনটি। এক. যে কোন আগ্রাসন পরাশক্তির প্রভাবমুক্ত থাকা। দুই. রাজনীতিতে রক্তপাত, হিংসা, পরিবার, গোষ্ঠীতন্ত্রের অবসান। তিন. বিশ্বায়নের ভালো দিকগুলো যেমন গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িতকা, আর্থিক প্রগতির জন্য মুক্ত বাজারের বাস্তবতা গ্রহণ করা। বর্জন করারও কিছু বিষয় আছে। যেমন- নৈশ নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে হল্লা করা বা অবাধ যৌনতা ও হিন্দী ছায়াছবির মত আচরণ করা, বন্ধ করতে হবে খুনোখুনি. মস্তানতন্ত্র, উগ্রবাদ, জঙ্গীবাদ ও ধর্মীয় রাজনীতির নামে প্রতিক্রিয়াশীলতা। কে বড় কে ছোট, পিতা, সৈনিক, মৌলবাদ, যুদ্ধাপরাধী এ জাতীয় সব বিষয়কে সম্মানের সাথে সুরাহা বা দূরে সরিয়ে তরুণ-তরুণীদের হাতে তুলে দিতে হবে বিশ্বজয়ের অগ্নিমশাল। এরাই পারবে। যে প্রজন্ম হিমালয় পরাভূত করে লাল সবুজের পতাকা ওড়াতে জানে, তারাই আমাদের প্রেরণা, আমাদের শক্তি। তাদের বাঁচানোই হোক এই নববর্ষের প্রধান কামনা। (সিডনি থেকে) dasguptajoy@hotmail.com