বিদেশি ভাষাও শিখিতে হইবে

এ বত্সর জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করিলে দেখা যায়, পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা সন্তোষজনক। এক্ষেত্রে আগের বত্সরের তুলনায় দৃষ্টিগ্রাহ্য উন্নতিও হইয়াছে। কিন্তু ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে খারাপ করিয়াছে। যেখানে বড় পাঁচটি শিক্ষাবোর্ডে সাধারণ বিজ্ঞানে পাসের হার ৯৮ হইতে ৯৯ শতাংশ ও বাংলায় ৯৫ হইতে ৯৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ, সেখানে ইংরেজিতে পাসের হার ৯০ শতাংশ ছাড়াইয়া যাইতে পারে নাই। গণিতের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। এই সাবজেক্টে পাসের হার ৯০ শতাংশের কাছাকাছি। ইংরেজি ও গণিতে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার ইতিহাস নূতন নহে। কিন্তু সেই অনুযায়ী তেমন কোন পদক্ষেপ নাই। ব্রিটিশরা এই দেশ শাসন করেন প্রায় দুই শত বত্সর। ব্রিটিশদের অন্যান্য ঔপনিবেশিক অঞ্চলে ইংরেজি শিক্ষার অগ্রগতি সাধিত হইলেও আমাদের এখানে হতাশ হইতেই হয়। ইংরেজি বলন ও লিখনে আমরা অনেক পিছাইয়া আছি। বাংলাদেশে বিদেশী ভাষা শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। আজকাল বিশ্বায়নের যুগে একাধিক ভাষা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাও অনস্বীকার্য। এক্ষেত্রে আমরা এখনও ঘুমাইয়া আছি বলিয়াই প্রতীয়মান হয়। বাংলা আমাদের প্রাণের ভাষা, আমরা বলি ‘আ মরি বাংলাভাষা’। ইহার জন্য আমরা আন্দোলন করিয়াছি ও জীবন দিয়াছি। এজন্য সবার আগে মাতৃভাষা আমরা ভালভাবে অবশ্যই রপ্ত করিব। কিন্তু আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে এক বা একাধিক বিদেশি ভাষা শিক্ষার কোন বিকল্প নাই। এই ক্ষেত্রে আমরা কোন পরিকল্পনা নিয়া অগ্রসর হইতে পারিতেছি না। বিদেশি ভাষা শিক্ষাকে আমরা হালকাভাবেই গ্রহণ করিয়া চলিয়াছি। পরীক্ষায় পাসের জন্য ও একরকম শিখার জন্যই আমরা শিখিতেছি। বাস্তব জীবনে ইহার তেমন কোন যোগসূত্র বা প্রয়োগ নাই বলিলেই চলে। বিদেশি ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে বিরাজমান এই জড়তা কাটাইয়া উঠিতে পারিলে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হইবে। প্রধানত দুইটি উদ্দেশ্যকে সম্মুখে রাখিয়া বিদেশি ভাষা শিক্ষার জাগরণ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। প্রথমত বিশ্বসভ্যতা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভান্ডার হইতে সহায়তা লাভ। দ্বিতীয়ত অর্থনৈতিক উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট বিদেশি ভাষার সদ্ব্যবহার। যেহেতু বর্তমানে বিশ্বঅর্থনীতি ক্রমেই এশিয়ামুখি হইতেছে, সর্বত্র মধ্যপ্রাচ্যের পেট্রোডলারের প্রভাব বাড়িতেছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভাল করিতেছে, তাই ইংরেজির পাশাপাশি আরবি, চীনা, হিন্দি, জাপানি, কোরিয়ান ইত্যাদি ভাষা শিক্ষার দিকেও এখন মনোযোগ বাড়াইতে হইবে। ধর্মীয় কারণে আরবি শিক্ষা একান্ত দরকার। তাই স্কুল-কলেজে একাধিক ভাষা আবশ্যিক বা অপশনাল সাবজেক্ট হিসাবে পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভূক্ত করা এবং এজন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিসহ উত্সাহ প্রদান জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। এ ব্যাপারে আমাদের যত তাড়াতাড়ি বোধোদয় হইবে, ততই মঙ্গল। ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয়তা আছে বলিয়াই বেসরকারিভাবে অনেক চাইনিজ ভাষা শিক্ষার ল্যাব বা সেন্টার গড়িয়া উঠিয়াছে এই রাজধানী ঢাকা শহরে। ভবিষ্যতে ইহা আরো সম্প্রসারিত হইবে বলিয়া আশা করা যায়। অনুরূপভাবে স্কুল-কলেজগুলিতে কম্পিউটার শিক্ষার ন্যায় এসব বিদেশি ভাষা শিক্ষার ল্যাব বা ক্লাব গড়িয়া তোলা যাইতে পারে। শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে এসব ভাষা শিক্ষা করিতে পারে অনায়াসেই। কোন বিদেশি ভাষার প্রতি স্থায়ী প্রীতি থাকা ভাল নয়। ব্রিটিশরা এ দেশ শাসন করিয়াছে বলিয়া নয়, যতদিন ইংরেজি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভাষা থাকিবে, ততদিনই কেবল আমরা এই ভাষা শেখার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখিব। এক্ষেত্রে বাস্তবতাকে মানিয়া নেওয়া ছাড়া কোন গত্যন্তর নাই। সতুরাং প্রয়োজনের তাগিদে যে বিদেশি ভাষাই আমরা শিখি না কেন, ব্যবহারিক দিককে প্রাধান্য দিয়া তাহা শিখিতে হইবে ভালভাবেই। সর্বোপরি, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সহিত বিদেশি ভাষা শিক্ষার সুসমন্বয় থাকা অপরিহার্য।