সমৃদ্ধ পৃথিবীর জন্য জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ জরুরি
প্রকাশ : ৩১ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৪১
সারাদেশে আজ অরাজকতা বিরাজ করছে। বৈষম্য, নিরাপত্তাহীনতা, কর্মসংস্থানের অভাব, দারিদ্র্য, অবাধ বনধ্বংস, আবহাওয়া দূষণে মারাত্মক আকার ধারণ করছে মানবতা ও সহমর্মিতাও আজ বিপন্ন। হুমকির মুখে পারস্পরিক সহমর্মিতা। ভ্রষ্টাচার, লুণ্ঠন, অপহরণ, হত্যা, ধর্ষণ, পাশবিক অত্যাচার ও হিংসার বাতাবরণ আজ বহু মাথাবিশিষ্ট বিকটাকার দৈত্য (Hydraheaded monster) হিসেবে অবতীর্ণ। দেশের প্রতিটি শান্তিপ্রিয় নাগরিক আজ অসহায় ও বিপন্ন। এসব অনভিপ্রেত সমস্যার উত্স কোথায়? সমাজসেবী সংস্থা তার প্রকৃত উত্স সন্ধানে না গিয়ে রোগের লক্ষণ দেখে চিকিত্সায় ব্যস্ত, যাকে সিমটোমেটিক ট্রিটমেন্ট বলা যায়। কিন্তু এরূপ চিকিত্সায় রোগকে চিরতরে বিদায় দেওয়া যায় না। তাই সব রোগের শেকড়ের বা উেসর সন্ধান প্রয়োজন। এই ব্যাধির মূল উত্স লাগামগীন জনসংখ্যা বৃদ্ধি, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্বায়নের প্রভাব ও বিজ্ঞানের অগ্রগতিপ্রসূত ভোগের লালসা। এই মণিকাঞ্চনের সহাবস্থানে বাংলাদেশের মতো অনুন্নত দেশের আজ এই বিষাদময় চিত্র। অনেকেই হয়তো বাংলাদেশকে অনুন্নত দেশ বলতে কুণ্ঠাবোধ করেন। সরকারি ভাষায় এবং যারা মাখনের পরতে জীবনকে উপভোগ করছেন, তাদের কাছে বাংলাদেশ ‘উন্নতিশীল দেশ’ অভিধায় অভিহিত। যে দেশে শতকরা ৮০ শতাংশ মানুষের কাছে অন্নচিন্তা প্রকট আর কেবলমাত্র ২০ শতাংশ মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে জীবনযাপন করছেন, সে দেশকে উন্নত বা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে অখ্যায়িত করতে সমাজ সচেতন মানুষের দ্বিধা আছে। প্রথমেই লাগামহীন জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও তার জন্য উদ্ভূত পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। উপমহাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে অর্থাত্ বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় অবিভক্ত ভারতের জনসংখ্যা ছিল ৩৩ কোটি। বর্তমানে অর্থাত্ স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পর সাবেক ভারত ত্রিখন্ডিত। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ নামে তিনটি স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র। ২০১১-র জনগণনা অনুসারে কেবলমাত্র ভারতের জনসংখ্যা প্রায় ১২১ কোটি। বাংলাদেশের ১৫ কোটি আর পাকিস্তানে ১৭ কোটি। এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের অনুন্নত দেশগুলোর জনসংখ্যা ক্রমবর্ধমান। এশিয়ার চীন ও ভারতের জনসংখ্যা বিশ্বের মধ্যে যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানে। আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ ভারত চীনকে ছাড়িয়ে যাবে। কারণ, বর্তমানে চীনের চেয়ে ভারতে জন্মহার বেশি ও অনিয়ন্ত্রিত। লাগামহীন জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও পরিবেশবিদরা খুবই চিন্তিত।
আজ থেকে ৪১ বছর আগে বাংলাদেশ স্বাধীনতা প্রাপ্তির জন্মলগ্নে জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে বড় রকমের সমস্যা হিসেবে গণ্য করা হতো না, যদিও পাশ্চাত্যের বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ মালথাস জনসংখ্যার হার নিয়ে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, কিন্তু এসবকে চিন্তাবিদ বা সমাজবিজ্ঞানীরা খুব একটা গুরুত্ব দেননি। সরকারি তরফেও তা বস্তুত গুরুত্বহীন ছিল। ৪১ বছর আগে দেশের প্রতিটি গ্রামে প্রতি পরিবারের ১ বিঘা থেকে ৫ বিঘার মধ্যে বসতবাড়ি ছিল, সঙ্গে পুকুর ও সব্জি ক্ষেতের জায়গা। কৃষিযোগ্য ভূমিও প্রতি পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত ছিল। মাঠে গরু-মহিষ ইত্যাদি গৃহপালিত পশুর জন্য গোচারণভূমি ছিল।
জন্মনিয়ন্ত্রণ বা জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধে গণতান্ত্রিক সরকারের পক্ষে কড়া পদক্ষেপ বা কড়া আইন প্রণয়ন সম্ভব নয়। বিশ্বের সবচেয়ে অধিক জনসংখ্যাবহুল দেশ চীন যেভাবে কড়া হাতে জন্মনিয়ন্ত্রণে নীতিনির্দেশিকা বলবত্ করেছে, তাতে কোনও দম্পত্তি এক সন্তানের অধিক সন্তান জন্ম দিতে পারবেন না। এই কঠোর নীতি চালু করায় চীনের জনসংখ্যা বর্তমানে স্থিতাবস্থায় রয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে তাদের বর্তমান জনসংখ্যাও হ্রাস পাবে। বিপরীতে, বাংলাদেশে অস্বাভাবিক হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে তা আগেই উল্লেখ করেছি। চীনে যেভাবে জনসংখ্যা হ্রাসে কড়া দাওয়াই প্রয়োগ করা হয়েছে, আমাদের মতো গণতান্ত্রিক দেশের সরকারের পক্ষে তা সম্ভব নয়। এ দেশের সরকারের পক্ষে যা সম্ভব তা হলো, দেশে শিক্ষিতের হার বাড়ানোয় সচেষ্ট হওয়া এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত সমস্যাবলী সুন্দরভাবে মোকাবিলা করা। এ বিষয়ে সমাজসচেতন নাগরিক, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও বোদ্ধাদের সদর্থক ভূমিকাও থাকতে হবে। দেশে শিক্ষিতের হার যত বাড়বে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার তত হ্রাস পাবে।
যে কোনওভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে স্থিতাবস্থায় আনতে হবে, তারপর হ্রাস করার লক্ষ্যে সদর্থক পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায়, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, সমাজে ভ্রষ্টাচার, দুর্নীতি, অপরাধ ও নিরাপত্তাহীনতা আরও প্রকট হবে, যা সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। যার আভাস আমরা এখনই টের পাচ্ছি। ক্ষয়িষ্ণু প্রাকৃতিক ভারসাম্য আরও ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করবে। সুতরাং এ বিষয়ে সকল নাগরিককে সচেতন হয়ে নবপ্রজন্মকে সুস্থ ও সুন্দরভাবে বাঁচতে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের সকলেরই।
লেখক :সাংবাদিক