[ রা জ নী তি ]

২০১২ সালের ভাল-মন্দের বিচার

সময় ও মহাকালের বহমান প্রবাহে কখনো কোন ছেদ ঘটে না। প্রতি মুহূর্তেই সময় বয়ে চলে সমান তালে। মানুষের মনে সেই বোধটা সবসময় উপলব্ধিতে আসে না। তবে কোনো কোনো সময় বেশ স্পষ্টভাবে সে সম্পর্কে বোধোদয় হয়। তেমনি একটি সময়কাল হলো ঠিক তখন, যখন আমরা পুরনো ক্যালেন্ডারটি বদলে দেয়ালে নতুন ক্যালান্ডার ঝুলাই। যখন পুরনো বছর সমাপনান্তে ঘটে আরেকটি নতুন বছরের সূচনা। তা সে হোক না বাংলা ক্যালেন্ডার কিংবা ইংরেজি ক্যালেন্ডার, যে কোনোটা। আজ নতুন ইংরেজি বছর ২০১৩-এর যাত্রা শুরু। অনেক চিন্তার সাথে আজ এ জিজ্ঞাসাটি জোরালোভাবে মনে জাগাটা বেশ স্বাভাবিক যে, পার হয়ে আসা ২০১২ সালটি কেমন গেল? সেক্ষেত্রে ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনের ঘটনাবলীর সালতামামির পাশাপাশি সবার মনে আরেকটি হিসাবের বিষয়ও জেগে ওঠা অতি স্বাভাবিক। তা হলো, কেমন গেল দেশ ও দুনিয়ার গত একটি বছরের সময়কাল। গত এক বছরে অনেক বৈচিত্র্যপূর্ণ নানামাত্রিক ঘটনার মধ্যদিয়ে দেশ-দুনিয়া পার হয়েছে। গবেষকরা তার সামগ্রিক খতিয়ানকে ভিত্তি করে চুলচেরা বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করবে। কিন্তু তথ্য যতোই বস্তুনিষ্ঠ হোক না কেন, তা কখনো ষোল আনা বিশুদ্ধ নিরপেক্ষ হয় না। তথ্যের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য নির্দিষ্টকৃত হয় তথ্য প্রদানকারী ও তার ব্যবহারকারীর দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা। সেই দৃষ্টিভঙ্গি আবার প্রভাবিত হয় সমাজে তার শ্রেণীগত অবস্থান দ্বারা। তাছাড়া ছোট-বড় যে কোনো বিষয়ের তথ্য কখনোই চরম সত্য বলে পরিগণিত হতে পারে না। কারণ তথ্য সংগ্রহকারী তার পর্যবেক্ষণের বিষয়টি অবলোকন করতে পারে তার একান্ত নিজস্ব অবস্থান থেকে। সে অবস্থানটি যেহেতু তারই একান্ত নিজস্ব ভুবন, তাই সেটি কখনোই সার্বজনীন হয়ে উঠতে পারে না। অধিকন্তু যেহেতু বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবকিছুর মধ্যে একটি সর্বব্যাপী পারস্পরিক আন্তঃসম্পর্ক বিরাজ করে, তাই সমগ্রকে- পরিপূর্ণভাবে জানতে না পারলে আংশিক সম্পর্কে তথ্যও চূড়ান্ত ও চরম সত্য রূপে নিজেকে দাবি করতে পারে না। সে কারণে বলা যায় যে, সব তথ্যজ্ঞানই সত্য বটে, তবে তা অসম্পূর্ণ ও আপেক্ষিক সত্য। এসব কথা আরো জোরালোভাবে বলা যায় তথ্যের বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে। এতোসব জ্ঞানগর্ভ তত্ত্বকথা সত্ত্বেও এসবের মাঝেই মানুষ তার সরল ও সাধারণ বিবেচনা দিয়েই ফেলে আসা বছরটি সম্পর্কে মনে মনে একটি মূল্যায়ন দাঁড় করায়। সর্বসাধারণের মূল্যায়নের আলোকে রূপ নেয় সাধারণ একটি ধারণা। সে ধারণা বস্তুনিষ্ঠ কি না তা নিয়ে বিতর্ক করা অর্থহীন। কারণ বস্তুনিষ্ঠ হোক বা না হোক, ধারণাটি যে সৃষ্টি হয়েছে সে সত্যটি তো কোনমতেই অসত্য নয়। ধারণা বাস্তবতা বর্জিত হলেও, ধারণা হিসেবে বিরাজ করার প্রশ্নে সেটি ষোল আনা সত্য। ফেলে আসা বছরটা কেমন গেল তা যখন ব্যক্তি গণ্ডি থেকে বিবেচিত হয় তখন তার হিসাব-নিকাশে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়গুলো মুখ্য হয়ে ওঠে, সমষ্টিগত জাতীয় আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট তখন হয়ে ওঠে গৌণ বিষয়। কিন্তু যখন গেল বছরে দেশ বা বিশ্ব কেমন গেছে, প্রশ্নটি হয় এই আলোকে, তখন প্রধান বিবেচ্য হয়ে উঠে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক বিষয়গুলো। সেক্ষেত্রে বাস্তবতার বিবেচনা হয়ে উঠে আরো বেশি শ্রেণী আপেক্ষিক। সময়কালটি কেমন গেল, ভালো না মন্দ এ প্রশ্নের জবাব নির্ভর করে যার কাছ থেকে জবাব খুঁজছি সমাজে তার শ্রেণী অবস্থান কি তার ওপর। একটি শ্রেণীবিভক্ত সমাজে এরূপ হওয়াটাই স্বাভাবিক ও আবশ্যম্ভাবী। যে সমাজে পরস্পর বিপরীতমুখী স্বার্থ সম্বলিত শ্রেণী বিদ্যমান এবং একটি শ্রেণীর ‘ভালো’ থাকাটা অন্যকে কতোটা ‘মন্দে’ রাখতে পারা গেল তার ওপর নির্ভরশীল, সেক্ষেত্রে ‘কারো পৌষ মাস, তো কারো সর্বনাশ’-এর পরিস্থিতি অনিবার্য। শ্রেণী নির্বিশেষে সকলের ‘সর্বনাশ’ অথবা সকলের ‘পৌষ মাস’ হওয়াটা অবাস্তব ও অসম্ভব। একথাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, পার হয়ে আসা সময়টা ভাল না মন্দ কেটেছে সে বিষয়ে মূল্যায়নটি একেবারেই আপেক্ষিক। তা এ কারণে যে, ভাল-মন্দের বিচার করতে হলে তা একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে করতে হয়। যেমন কিনা দু’বছর আগের তুলনায় গত বছরটা ভাল না মন্দ কেটেছে? সে হিসেবটি করা গেলেও প্রশ্ন থেকে যায় ভাল-মন্দ মিলিয়ে সেক্ষেত্রে একটি বছর পার হয়েছে সেখানে বছরটি সামগ্রিকভাবে ভাল বা মন্দ হিসেবে বিমূর্তরূপে আখ্যায়িত হওয়ার সুযোগ থাকতে পারে কি? তাছাড়া আরেক দিক থেকে ভাল-মন্দের বিচার করা যেতে পারে। তা হলো আরো কতোটা ভাল বা মন্দ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল সেই তুলনায় বছরটি কেমন কাটলো সেই আপেক্ষিকতার আলোকে। এসব কথা বিবেচনায় রেখেই ২০১২ সাল সম্পর্কে বলা যায় যে, দেশের অল্পসংখ্যক ১ শতাংশ ভাগ্যবান মানুষের জন্য বছরটি অত্যধিক ভাল গেছে। তারা দু’হাত ভরে টাকা বানিয়েছে পাহাড় সমান। রাজনীতি, মিডিয়া জগত্, প্রশাসন ইত্যাদি সব ক্ষেত্রে তাদের কর্তৃত্ব অনেক বেড়েছে। ২/৪ জন বাদে তাদের মধ্যে প্রায় সবাই তাদের আর্থিক দুষ্কর্ম আড়াল করে রাখতে পেরেছে। তাদের মতো ১% শতাংশের জন্য একই দেশে যে আলাদা ভুবন তারা সৃষ্টি করে রাখতে পেরেছে, তার আরো শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনোদন, খাদ্য, বাসস্থান, পরিবহন, আরাম-আয়েশ, সন্তানাদির ভবিষ্যত্ নির্মাণ ইত্যাদি সবকিছুতে প্রবল ‘উন্নতি’ ঘটেছে। আরো অনেক ব্যবসায়ী নতুন করে রাজনীতিতে ঢুকছে আর একশ্রেণীর রাজনীতিবিদদের মধ্যে অনেকেই নতুন করে ব্যবসায় ঢুকেছে। সামরিক-বেসামরিক আমলাদের মধ্যে বড় অংশ অবসর নেয়ার পর কিম্বা অনেকেই গোপনে কর্মরত থাকা অবস্থায় ব্যবসা ও রাজনীতিতে জেঁকে বসেছে। এ ধরনের আরো অনেক চোখ-ধাঁধানো কল্পনাতীত ‘উন্নতির’ বর্ণনা দেয়া যায়। মোদ্দা কথা, দেশের ১ শতাংশের জন্য ২০১২ সাল ছিল ‘পৌষ মাস’। কিন্তু দেশের অবশিষ্ট ৯৯ শতাংশ মানুষের জন্য ২০১২ ছিল ‘সর্বনাশে’র বছর। তাদের বেতনভাতা-মজুরি তথা আয়-উপার্জন বেড়েছে যত্সামান্য অথচ বেঁচে থাকার জন্য যা তাদের বাজার থেকে কিনে এনে চলতে হয় সেসবের দাম বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। বছরের বেশিরভাগ সময় মূল্যস্ফীতির হার দুই অংকের উপরে থেকেছে। তেল-ডিজেল-মবিল ও বিদ্যুতের দাম, রেল ভাড়া ইত্যাদি সরকার নিজেই দফায় দফায় বাড়িয়েছে। শতাধিক গার্মেন্টস শ্রমিক আগুনে পুড়ে মরেছে, বস্তি পুড়ে ছাই হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনায় হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে, খুন হয়েছে শত শত মানুষ, ধর্ষিতা হয়েছে মেয়েরা, অত্যাচারে অতিষ্ঠ করে আত্মহননে বাধ্য করা হয়েছে অসংখ্য বধূ-বালিকাকে, ছিনতাই-কিডন্যাপ-ডাকাতি চলেছে অবাধে, ফেনসিডিল-ইয়াবা-হেরোইনের ব্যবসার বিস্তার হয়ে যুবসমাজকে ধ্বংসের অন্ধকার পথে নিমজ্জিত করা হয়েছে, সন্ত্রাসী-ক্যাডার বাহিনীর আস্ফাালন বেড়েছে ইত্যাদি। ২০১২ সালের হালচাল কেমন ছিল তার বিবরণ ও খতিয়ান আর কতো দিব। এসব দুঃসহ পরিস্থিতির কোন নিরসন না হয়ে সেগুলো বছরব্যাপী শুধু বেড়েছেই। বাঁচবো কিভাবে এই ভাবনা মানুষকে সারা বছর ধরে অসহায়ত্বে বিভোর করে রেখেছে। ২০১২ সালে একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা অর্থনীতির লুটপাটের চেহারাকে বিস্ময়কর স্বচ্ছতার সাথে প্রকাশ করে দিয়েছে। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির পর যে ধস নেমেছিল, তা থেকে দেশের পুঁজিবাজার আর উঠে দাঁড়াতে পারেনি। এর সাথে যুক্ত হয়েছে হলমার্ক কেলেঙ্কারি, ডেসটিনি কেলেঙ্কারি, সোনালী ব্যাংক কেলেঙ্কারি ইত্যাদি। দেদারসে চলছে টেন্ডার ছিনতাই, টেন্ডার ম্যানুপুলেশন, চাঁদাবাজি, তদবিরবাজি, দলবাজি, নিয়োগ বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, আরো কতো কি! পরপর তিনটি মৌসুম ধরে কৃষক ফসলের দাম পায়নি অথচ সাধারণ ক্রেতাকে বেশি দামে তা কিনতে হয়েছে। প্রায় অর্ধেক টাকা চলে গেছে অনুত্পাদক মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। দেশের তেল-গ্যাস-কয়লা সম্পদ কুক্ষিগত করার জন্য ২০১২ সালে দেশীয় দালালদের সহায়তায় সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর তোড়জোড় আবার বেড়েছে। তারল্য সংকটসহ সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো অর্থনীতি অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা জিইয়ে রেখেছে। ২০১২ সালে দেশের শাসন ধারায় নিয়ন্ত্রণহীনতা ও সমন্বয়হীনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার কি বলতে চায়, কি করতে চায়— তা বুঝতে পারাটা আরো কষ্টসাধ্য হয়েছে। মন্ত্রীদের মুখে লাগামহীন ও কখনো কখনো ভিন্ন ধরনের অথবা একেক জনের মুখে একেক ধরনের কথাবার্তা উচ্চারিত হয়েছে। সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ড নিয়ে তালগোল পাকিয়ে সব মানুষকে ক্ষুব্ধ করা হয়েছে। বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ড ছিল সর্বশেষ চাঞ্চল্যকর ঘটনা, যার মাধ্যমে ছাত্রলীগ-যুবলীগ-আওয়ামী লীগ ‘ক্যাডারদের’ সন্ত্রাস ও অপরাধী কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণহীন ভীতিকর কার্যকলাপের নমুনা প্রদর্শিত হয়েছে। পদ্মা সেতুর অর্থায়ন নিয়ে সরকার নাজেহাল ও বেদিশা অবস্থায় পড়েছে। একদিকে দেশের মধ্য থেকে দুর্নীতির আয়োজনের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি, অন্যদিকে বিশ্ব ব্যাংক ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মুখে মুখে শক্ত ড্যাম-কেয়ারভাবে কথাবার্তা বলার পাশাপাশি তার চাপের কাছে আত্মসমর্পণ করে একটি নাস্তানাবুদ অবস্থার সৃষ্টি করা হয়েছে। ২০১২ সালে সাম্র্রাজ্যবাদ, বিশেষত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আরো গভীরভাবে বাংলাদেশে তার হস্তক্ষেপ বাড়িয়েছে। মেরিন বাহিনী, স্পেশাল ফোর্স, সপ্তম নৌবহর ইত্যাদির নিয়মিত আনাগোনার মধ্যদিয়ে এদেশে স্থায়ী মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ছকে আরো শক্তভাবে নিমগ্ন করা হয়েছে। মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধের আইনগত নিষ্পত্তি হলেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে এবছর আবার নতুন করে বড় রকম সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। ২০১২ সালে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। বছরের মাঝামাঝি সময়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে এবং শেষ দিকে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ব্যাপক সহিংসতা চলেছে। সরকার তা রোধ করতে পারেনি। সাম্প্রদায়িক শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া অগ্রসর হয়েছে ঠিকই কিন্তু জামায়াত-শিবির চক্র তার বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছে। সরকার তা ঠেকাতে পারেনি। আইনী ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার বাইরে জামায়াত-শিবিরের সহিংস তত্পরতা প্রতিহত করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পথে বাধা দূর করার জন্য যে পাল্টা রাজনৈতিক অভিযান চালানো অপরিহার্য, তা পরিচালনায় সরকার ও মহাজোট অনেকটাই উদাসীন থেকেছে। দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে যে অচলাবস্থা চলছে তার ফলে রাজনীতিতে অনিশ্চয়তাই কেবল বাড়েনি, দেশ রাজনৈতিক সংঘাতের ভয়াবহ পরিণতির দিকে আরো একধাপ এগিয়ে গেছে। বিএনপি সংসদ বর্জন করে চলেছে। জামায়াতের সাথে জোট বহাল রেখে তাকে সে আশ্রয় দিয়ে চলেছে। ৪ দলের জোটকে সে এখন ১৮ দলের জোটে সম্প্রসারণ করেছে। ক্ষমতার খেলায় সে ভারতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলের আভাস দিয়েছে। ভারত সফরকালে খালেদা জিয়া সে দেশকে কতগুলো বিষয়ে প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে রাজনৈতিক মেরুকরণের চেষ্টা সামান্য এগিয়েছে। গণফোরাম ও বিকল্পধারা- এই দল দু’টির মধ্যে এক ধরনের ঐক্য গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি সিপিবি ও বাসদ ১৫ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে এবং দুই জোটের বাইরে বাম- গণতান্ত্রিক বিকল্প রাজনৈতিক বলয় গড়ার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা শুরু করেছে। বাম মোর্চাকে সাথে নিয়ে তারা ১৮ ডিসেম্বর তিনটি ইস্যুতে দেশব্যাপী সফল হরতাল পালন করে মানুষের মধ্যে ইতিবাচক আগ্রহের জন্ম দিতে সক্ষম হয়েছে। বামপন্থিরা ফুলবাড়িতে এশিয়া এনার্জি কোম্পানির উন্মুক্ত কয়লা খনি নির্মাণের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অব্যাহত রেখেছে। জনগণের প্রতিরোধের মুখে সরকারের ১৪৪ ধারা অকার্যকর করে তারা সেখানে সভামঞ্চ পুনরুদ্ধার করে বিশাল সমাবেশ করার মধ্যদিয়ে আন্দোলনের নতুন অধ্যায় সূচিত করেছে। আশুলিয়ার তাজরিন ফ্যাশনের অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ শ্রমিক হত্যার পর কয়েকদিন ধরে উত্তপ্ত আন্দোলন পরিচালিত হয়েছে। এই সংগ্রামে একমাত্র বামপন্থিরাই সরব ও সক্রিয় রয়েছে। বছরব্যাপী ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীর বিবরণ দিতে গেলে পাতার পর পাতা শেষ করা যাবে। কিন্তু বছরটি কেমন গেল, সেই প্রশ্নে এ ধরনের খতিয়ান লিপিবদ্ধ করাটি বড় বিষয় নয়। এ বিষয়ে আসল প্রশ্ন হলো, বছরটি কেমন গেল? এই প্রশ্নের জবাবে ভালো-মন্দ দু’রকম জবাবই যুক্তিসঙ্গত তবে তার পরেও আরেকটি কথাও সত্য তা হলো, ১ শতাংশ মানুষের জন্য ২০১২ সাল খুবই ‘ভাল’ বছর হিসেবে কাটলেও অবশিষ্ট ৯৯ শতাংশ মানুষের কাছে তা ছিল একটি ‘মন্দ’ বছর। কারো ‘পৌষ মাস’ হলেও ২০১২ ছিল অধিকাংশ মানুষের জন্য আরেকটি ‘সর্বনাশা’ বছর। লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি