২০১৩ সাল এবং বাংলাদেশ

ইংরেজি থারটিন সংখ্যাটি নিয়ে চালু রয়েছে নানা সংস্কার ও কুসংস্কার। কেউ কেউ বলেন, আনলাকি থারটিন। আবার অনেকে বলেন, ঠিক উল্টো; লাকি থারটিন। লাকি-আনলাকি যাই হোক না কেন, নতুন বছরটি আমাদের কেমন যাবে বা যেতে পারে, তা জানার জন্য জ্যোতির্বিদ বা গণনাকারীর প্রয়োজন নেই। ২০১৩ সাল বাংলাদেশের ভাগ্যাকাশে কালো মেঘ আর দুর্যোগের ঘনঘটা নিয়ে এসেছে বলেই বোদ্ধা মহলের কাছে মনে হচ্ছে। ২০১৪ সালের প্রথম দিকে বাংলাদেশে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ জল্পনা-কল্পনা ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। নির্বাচন হবে কি হবে না, হলে কার অধীনে হবে, বর্তমান সরকারের অধীনে নাকি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে, সে আলোচনা-সমালোচনার শেষ নেই। যদিও মাঝে আরো একটি বছর বাকি। একটি বছর বাকি থাকলেও রাজনৈতিক মঞ্চ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ইতোমধ্যেই। ২০১২ সালের শেষে অর্থাত্ বিজয়ের মাসে হঠাত্ সব হিসাব-নিকাশ উলট-পালট করে দিয়ে মিছিল মিটিং হরতাল অবরোধ ভাংচুর, জ্বালাও পোড়াও, হুমকি ধমকি প্রতিবাদ প্রতিরোধ প্রতিশোধ সব একাকার করে নাগরিক জীবনকে এক অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। দিন-দিন এ অবস্থা বাড়বে বই কমার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অর্থাত্ ১৩ সাল বা আনলাকি থার্টিন জুড়েই থাকবে এ উত্তাপ। দু’পক্ষই অনড়। দেশ রসাতলে যায় যাক। কেউ কারে নাহি ছাড়ে। বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচাগ্র মেদিনী, অবস্থাটা এরকমই। ’৯০ এর সফল গণঅভ্যুত্থানের পর তত্কালীন ৩ জোটের ফর্মুলা অনুযায়ী ১৯৯১ সালে দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহম্মদের নেতৃত্বে সে সরকার ছিল পুরোপুরি নির্দলীয় নিরপেক্ষ। দেশে এবং বিদেশে সে নির্বাচন প্রশংসিত ও গ্রহণযোগ্য হয়। ১৯৯৬ সালের কেয়ার টেকার সরকারকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক গগন অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠে। একটি ভোটারবিহীন নির্বাচন করেও তত্কালীন বেগম খালেদা জিয়ার সরকার রেহাই পায়নি জনরোষ থেকে। শেষ পর্যন্ত নতিস্বীকার করতেই হয়েছে। সংবিধানে সংযোজিত হয়েছে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে শেখ হাসিনা প্রথমবারের মত দেশের প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০১ সালে বিচারপতিদের বয়স বাড়ানোকে কেন্দ্র করে আবারও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এক জটিল অবস্থার মধ্যে পড়ে। অনেক নাটকীয়তার পর দেশে আসে ১/১১। মঈন উদ্দীন, ফখরউদ্দীন, ইয়াজউদ্দীনের টানা ২ বছরের ঘূর্ণি শাসনের পর ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। শেখ হাসিনা পুনরায় দেশের প্রধানমন্ত্রী হন। ক্ষমতায় এসেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে মহাজোট সরকার জনগণের মতামতের বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে প্রতিষ্ঠিত এবং গ্রহণযোগ্য কেয়ার টেকার সরকার ব্যবস্থা সংবিধান থেকে ছেঁটে ফেলে দেশকে পুনরায় সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়। ২০১৩ সাল হলো কেয়ার টেকার সরকারের পক্ষ-বিপক্ষ লড়ায়ের চূড়ান্ত পরিণতির বছর। যদিও শেখ হাসিনা কেয়ারটেকার সরকারের জন্য দেশে ১৭৩ দিন হরতাল করেছিল। এখন ক্ষমতা পেয়ে তিনি সব ভুলে গেছেন। কখনো রেফারেন্স দেন আদালতের, কখনো দোষ দেন ১/১১ কে। কেয়ারটেকার সরকারের যদি কোন দুর্বলতা থাকে, সে দুর্বলতাগুলো দূর করলেই তো হতো। মাথায় ব্যথা আছে বলে কি মাথাটা কেটেই ফেলতে হবে? আজীবন ক্ষমতায় থাকার দুঃস্বপ্ন দেখলে ভুল হবে। এদেশে কেউ ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে নাই। কেউ লৌহমানব হয়ে টিকে থাকতে পারে নাই। সে কথা ভুলে গেলে চলবে না। কোন নাটকীয় পরিবর্তন না ঘটলে, কেউ কোন ছাড় না দিলে ২০১৩ সালটা আনলাকি থার্টিন হয়েই থাকবে এদেশের কপালে। জনদুর্ভোগ বেড়েই চলছে। বছর শুরুতেই তেল গ্যাস বিদ্যুতের দাম বাড়ার ঘোষণা আসছে। শুরু হবে তেলেসমাতি। হু হু করে বাড়বে জিনিসপত্রের দাম। ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে, নাভিশ্বাস উঠবে, চারিদিকে হাহাকার উঠবে। এমনিতেই গ্রামগঞ্জের অবস্থা করুন, মধ্যবিত্তের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। যাতায় পিষে মরবো আমরা। ক্ষমতার স্বাদ এতোই মিষ্টি, কেউ ছাড়তে চায় না। ছাড়ার কথা ভাবতেও চায় না। যে যার লংকায় সে হয় রাবণ। কিন্তু রাবণ বধের গল্পও যে আছে তা কেউ মানতে চায় না। কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন করেই দুই নেত্রী দুইবার করে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। ক্ষমতায় থাকলে কেয়ারটেকার সরকারের নিন্দা, আর ক্ষমতার বাইরে থাকলে কেয়ার টেকার সরকারের বন্দনা। কি অবাক এবং অলীক চিন্তা। কেয়ারটেকার সরকারের জন্য যে আন্দোলন, মিছিল মিটিং হরতাল অবরোধ হয়েছে, রক্ত ঝরেছে, মানুষ মরেছে, সে সব কি এখন ফিরিয়ে দিতে পারবেন মাননীয় নেত্রী? একবার কেয়ারটেকার সরকারের জন্য আবার কেয়ারটেকার সরকার প্রতিহত করার জন্য আমাদেরকে রাস্তায় নামাবেন? আমাদেরকে নিয়ে এতো ছিনিমিনি খেলা কেন, আমরা কি মানুষ নই? আমরা কি গিনিপিগ? যদিও চিরস্থায়ী ক্ষমতার লোভ আমাদেরকে আনলাকি থার্টিন-এ নিমজ্জিত করেছে, তবু আমরা আনলাকি থার্টিন চাই না। লাকি থার্টিন চাই। লেখক : প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, আফাজউদ্দিন খান ডিগ্রী কলেজ, মনোহরদী, নরসিংদী