আলোকপাত
ফিরে দেখা ২০১২ :পাওয়া না
পাওয়ার সালতামামি
প্রকাশ : ৩১ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:০৯
বর্তমান সময়ের প্রভাবশালী বিজ্ঞানী স্টিফেন ডব্লিউ হকিং তাঁর ‘এ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম’ গ্রন্থে সময়ের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। এ আলোচনায় স্পষ্ট যে, মানুষ সময়ের কাছে আবদ্ধ; সময়কে স্থির রাখার কলাকৌশল বের করতে পারেনি সে আজও। কাজেই আমাদেরকে চলতে হয় দিন রাত মাস বছরের হিসেব করে। আর সময়কে যে বা যারা যথার্থ ব্যবহার করতে পারে তার বা তাদের সাফল্যের পাল্লা ততো ভারি হয়। ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রিক পর্যায় অবধি এ কথার সত্যতা সহজেই উপলব্ধি করা যায়। কারণ সময় ও স্রোত তো কারো জন্য অপেক্ষা করে না; সে চলে আপন মনে স্ব-ধারায়। সময়ের এ ধারাবাহিকতায় আমরা হারালাম আরেকটি বছর- ২০১২ সাল। কিন্তু গত বছর আমরা তা থেকে কী অর্জন করলাম, কীইবা হারালাম। বিশেষ করে জাতীয় জীবনের ঝুট ঝামেলার হিসাব নিকাশ আমাদেরকে বড় তাড়িত করে- আর সে থেকেই এ লেখার প্রেরণা।
২০১২ সালটি আমাদের জাতীয় জীবনে ঘটনাবহুল একটি বছর। মহাজোট সরকারের চতুর্থ বছর অতিক্রান্ত হলেও বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভার অধিকাংশ মন্ত্রিই যে সাফল্যের মুখ দেখাতে পারেননি তার প্রমাণ মিলেছে নানা ক্ষেত্রে। তবে দুই মন্ত্রির প্রজ্ঞা, সততা ও নিষ্ঠাবানতায় কৃষি ও শিক্ষাক্ষেত্র উন্নতির যে উচ্চ শিখরে আরোহণ করেছে তা অস্বীকার করবার উপায় নেই। অপরদিকে স্বল্পসময়ের দায়িত্বে থাকা যোগাযোগ মন্ত্রী পুরনো বৃত্তের বাইরে এসে ভগ্নদশা রেলের গতি বাড়াতে যারপরনাই চেষ্টা করেছেন দিবানিশি। তাঁর কর্মনিষ্ঠা, কাজের গতি-প্রকৃতিতে সন্তুষ্ট আপামর জনতা। এতো বড় মন্ত্রিসভার ইতিবাচক আলোচনায় হাতেগোনা কয়েকজন মন্ত্রীর নামই বার বার আসে- বাকিদের নামের পাশে যুক্ত হয় প্রশ্নবোধক চিহ্ন। গত বছরের সালতামামি করলে দেখা যায়, দুর্নীতির প্রকাণ্ড পাহাড় মন্ত্রী-এমপিদের কৃতকর্মের ফল। পদ্মা সেতু দুর্নীতি, হলমার্ক কেলেঙ্কারি, সোনালী ব্যাংকের টাকা আত্মসাত্, শেয়ার মার্কেট থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোটপাট ইত্যাদি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় জনগণ হয়েছে বিস্মিত ও হতবাক। সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীদের অযাচিত মন্তব্যে নিরাশ হয়েছেন বাংলাদেশের মানুষ। শেয়ারবাজার নিয়ে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বহীন মন্তব্য, প্রধানমন্ত্রীর ভাষাব্যবহারে অপরিণামদর্শিতার চিত্র ইলেকট্রনিক ও নন-ইলেকট্রনিক উভয় মিডিয়ারই রসদে পরিণত হয়েছে বার বার। দুনীর্তি দমন কমিশনের দুর্নীতির হিসাব নিকাশের সরকারিপনা দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়েছে সবার কাছে। বিশেষ করে দুই আবুলকে দুর্নীতি থেকে অব্যাহতি দেয়ায় মানুষ এ প্রতিষ্ঠানটির প্রতি নাখোশ হয়েছেন সঙ্গত কারণেই। ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের টানা হেঁচড়ার কাহিনী সুদূর আমেরিকা অবধি গড়িয়েছে; কিন্তু সরকার তার অবস্থান বদলাননি। এতে করে আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি একটা বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে বৈকি..? সরকারের তদারকিহীনতার কারণেই তাজরীন গার্মেন্টসের হতভাগ্য শ্রমিকের ভাগ্য পুড়ে ছাই হয়েছে। র্যাব পুলিশের বিতর্কিত ভূমিকায় অসহায় যুবক লিমন আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। সরকারের লালিত ছাত্রলীগ ও যুবলীগের তাণ্ডবের ঝাল সমগ্র বাংলাদেশে প্রসার লাভ করে এ বছর মারাত্মকভাবে। এর ফলশ্রুতিতে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নৈরাজ্য বিরাজ করে- প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। অস্ত্রের মহড়ায় শিক্ষাঙ্গন হয় কলুষিত। বাংলাদেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েট চরম রাজনীতির শিকার হয়ে ধ্বংসের মুখে পতিত হয়। ছাত্রলীগের রাজনীতির যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হয় বিশ্বজিতের মত নিরীহ পথচারি। প্রকাশ্য দিবালোকে কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মী চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে যেভাবে তাকে হত্যা করে তা অন্ধকার যুগের বিভীষিকাময় যুগকেও হার মানায়। এরূপ হাজারো ঘটনা রটনার বছর দুই হাজার বার সাল- সাফল্যের ঝুড়িতে সামান্য হলেও বিফলতার ঝুড়ি পূণর্, তার প্রমাণ মেলে সহজেই।
বর্তমান ২০১৩ সাল। পুরনো দুঃখ বেদনা গ্লানি মুছে ফেলার বছর। রাজনৈতিক দূরত্বের অবসান না হলে এ সালটি যে আরও ভয়াবহ হবে তার ইঙ্গিত ইতোমধ্যেই আমাদের কাছে ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাজেই রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে দেশের অভাবিত ক্রান্তিলগ্নের অবসান হওয়া বাঞ্ছনীয়। তা না হলে সময় তার নিয়মেই বয়ে চলবে; মাঝখান থেকে আমরা হারাবো আরেকটি মূল্যবান বছর।
লেখক :সহকারী অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়