বিজিএমইএ ভবন

আদালতের রায় মেনে অবৈধ ভবনটি ভেঙে ফেলুন

প্রিয় পাঠক আপনারা জানেন যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২ জানুয়ারি বেগুনবাড়ি-হাতিরঝিল প্রকল্পটির শুভ উদ্বোধন করতে যাচ্ছেন। নগরবসীর দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত এই প্রকল্পটির বাস্তবায়ন করে জনসাধারণের জন্য খুলে দিতে পদক্ষেপ নেয়ায় আমরা সরকারকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু প্রকল্প এলাকায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও মালিক সমিতির (বিজিএমইএ) অবৈধ ১৫ তলা ভবনটি আইন, নৈতিকতা আর পরিবেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এখনও বহাল তবিয়তে দাঁড়িয়ে আছে; এতে আমরা যারপরনাই উদ্বিগ্ন ও ক্ষুব্ধ; আমরা মনে করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের আগেই জনগুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টির ফয়সালা হওয়া বাঞ্ছনীয়। উল্লেখ্য, মহামান্য হাইকোর্ট ২০১১ সালের ০৩ এপ্রিল তার প্রদত্ত রায়ে বিজিএমইএ-এর অবৈধ ভবনটি ভেঙে ফেলার আদেশ দেন। রায়ের আদেশে বলা হয়, বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ জালিয়াতি করে বেগুনবাড়ি-হাতিরঝিল খালের জমি-পানি দখল করে এবং অবৈধভাবে খালের মাটি ভরাট করে ১৫ তলার ওই ভবনটি নির্মাণ করে। মহামান্য আদালত সুস্পষ্টভাবে বলেন, রায়ের কপি পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে ভবনে অবস্থানরত সবাইকে তাদের মালপত্র নিয়ে অন্যত্র সরে যেতে হবে। রায়ে মাননীয় বিচারক দ্ব্যর্থহীনভাবে সিদ্ধান্ত দেন যে, বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ ভবনটির নকশা, পরিকল্পনা ও নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজউক থেকে যথাযথ অনুমতি নেয়নি এবং যে পদ্ধতিতে বিজিএমইএ জমিটির দখল নিয়েছে তা প্রতারণামূলক এবং একই কারণে তা ‘ক্রিমিনাল অফেন্স’। ঢাকার জেলা প্রশাসকের অফিস থেকে আদালতে যে দলিল-রেকর্ড উপস্থাপন করা হয় তাতে বলা হয় ১৯১০ সালে ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ে উল্লিখিত জমিটি অ্যাকোয়ার করে এবং ২০০৬ সাল পর্যন্ত এটি বাংলাদেশ রেলওয়ের মালিকানাতেই ছিল; রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ২০০৬ সালে জমিটি এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো (ইপিবি)’র নিকট হস্তান্তর করে; কিন্তু আশ্চর্যজনক, কোর্ট বলছে, বিজিএমইএ জমি ক্রয়ের যে দলিলপত্র রাজউক-এ দাখিল করেছে সেখানে তারা দাবি করেছে, বিজিএমইএ ২০০১ সালে ইপিবি থেকে জমিটি ক্রয় করেছে। এখান থেকে কোর্ট এই মর্মে সিদ্ধান্তে এসেছে, জমি ক্রয়ের প্রক্রিয়ায় অভিনব জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে এবং একটি প্রতারক চক্র এ প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, জমির মালিকানা জেলা প্রশাসনকে ফিরিয়ে দিতে হবে এবং জেলা প্রশাসন জনগণের ব্যবহারের জন্য জমিটির বন্দোবস্ত নিশ্চিত করবেন। আদালতের রায়ে যা বলা হয়েছে তার সারার্থ হলো: ১. জমিতে বিজিএমইএর মালিকানাস্বত্ব নেই। তাই তাদের ওই জমি থেকে উচ্ছদ করতে হবে। ২. জমিতে ভবন নির্মাণ করে বেগুনবাড়ী খালের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ এবং হাতিরঝিল প্রকল্পের বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। তাই ভবনটি দ্রুত ভেঙ্গে ফেলতে হবে। ৩. বেগুনবাড়ী খালের ওই জমি পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। ৪. মূল নকশা অনুযায়ী হাতিরঝিল প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। ৫. বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ ওই ভবনের কিছু অংশ বিক্রি ও ইজারা দিয়েছে, যারা এটা কিনেছে বা ইজারা নিয়ে পুঁজি বিনিয়োগ করেছে, তাদের আগেই দেখা উচিত ছিল এটা বৈধ স্থাপনা কিনা? তবে তারা আইন অনুযায়ী প্রতিকার চাইতে পারে। ৬. বিজিএমইএ ভবনে যাদের স্থাপনা আছে, তারাও ৯০ দিনের মধ্যে তাদের স্থাপনা সরিয়ে নেবে। ৭. বিজিএমইএ যে ফৌজদারি অপরাধ করেছে, তা তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পুলিশের মহাপরিদর্শক ও ঢাকার জেলা প্রশাসক এবং জলাধার আইন লঙ্ঘন করে কী ধরনের অপরাধ করেছে, সে বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ৮. ভবন ভাঙ্গার সময় আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হবে, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ভাঙ্গার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দিতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক যে, ১৯৯৮ সালে অবৈধ এই ভবনটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ২০০৬ সালে এর উদ্বোধন ঘোষণা করেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া; এ জন্যই বাংলাদেশের দুর্নীতির ইতিহাসে ভবনটি ‘মন্যুমেন্ট অব করাপশন’-এর প্রতীক হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। আমাদের প্রশ্ন আইন অমান্য করে গড়ে ওঠা অবৈধ ভবনটি কি ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা আর জনস্বার্থ বিরোধী উদ্যোগের একটি প্রতীক হিসেবে টিকে থাকবে? সমাজের কিছু মানুষ আইন-আদালতকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে এখানে একদিন দম্ভ দেখিয়েছে! সেই উদাহরণ কি আমরা ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য রেখে যাব? এই প্রকল্পের উদ্দেশ্যে বলা আছে, এই প্রকল্পের খাল দিয়ে ঢাকা শহরের বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যাবে, ফলে জলাবদ্ধতা থেকে নগরবাসী রক্ষা পাবে। একই সাথে খালের পাশ দিয়ে নির্মিত সড়ক শহরের যানজট নিরসনে ভূমিকা রাখবে। এই প্রকল্পটি হবে নগরবাসীর বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্র। কিন্তু নগর পরিকল্পনাবিদরা বারবার যে কথা বলে আসছেন তা হলো, এত অর্থ ব্যয় করে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলেও সব সম্ভাবনা আর স্বপ্নের সামনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে হাতিরঝিলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালাকার এক অবৈধ হাতিটি। আমরা অনেকেই জানি, জলাধার সংরক্ষণ আইন অমান্য করে এই ভবন গড়ে তোলা হয়েছে। এ ছাড়া ভবনটি নির্মাণে নগর উন্নয়ন আইন-১৯৫৩, ভবন নির্মাণ আইন-১৯৫২, উম্মুক্ত স্থান ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০ এর লঙ্ঘন করা হয়েছে। উল্লেখ্য, বিজিএমইএ সুপ্রিম কোর্ট থেকে ২০১১-সালের ০৫ এপ্রিল হাইকোর্টের রায়ের ওপর ছয় সপ্তাহের একটি স্থগিতাদেশ আনে এবং এর জের ধরেই এখনও তারা ভবনটিকে টিকিয়ে রেখেছে এবং প্রতিদিন পরিবেশের ক্ষতি সাধন করে চলেছে। এই অবৈধ ভবনটির জন্য বেগুনবাড়ি-হাতিরঝিল প্রকল্পের নকশায় পরিবর্তন আনতে হয়েছে এবং এর জন্য প্রকল্পের খরচও অযৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি করতে হয়েছে। তাই আমরা যারা পরিবেশ নিয়ে কাজ করি কিংবা চিন্তা-কর্মতত্পরতা পরিচালনা করি তাদের পক্ষ থেকে বেগুনবাড়ি-হাতিরঝিল এলাকায় পরিবেশের জন্য ভয়ংকর ক্ষতিকর এই অমীমাংসিত বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মনোযোগ আকৃষ্ট করা কর্তব্য মনে করছি। ++ লেখকবৃন্দ :হাতিরঝিল থেকে বিজিএমইএ ভবন অপসারণ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত